Sunday, August 14, 2022
spot_img
Homeলাইফস্টাইলদেশেই এখন ভ্রূণের জিনগত ত্রুটি নির্ণয় সম্ভব

দেশেই এখন ভ্রূণের জিনগত ত্রুটি নির্ণয় সম্ভব

প্রত্যেক মা-বাবাই চান তাঁদের সন্তান সুস্থ, সুন্দরভাবে জন্ম লাভ করুক। কিন্তু সব সময় তা হয় না। প্রতি ১০০ শিশু জন্ম লাভ করলে দেখা যায় তিনজনের জন্মগত ত্রুটি রয়েছে। এই ত্রুটি সাধারণত দুই রকমের।

শারীরিক ত্রুটি বা বিকলাঙ্গ এবং ক্রমোজোমাল বা জেনেটিক ত্রুটি।  

আমাদের শরীর গঠনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশকে কোষ বা সেল বলা হয়। প্রতিটি মানবকোষের মধ্যে ২৩ জোড়া ক্রমোজোম নামের অঙ্গাণু থাকে, যার অর্ধেক আসে মায়ের কাছ থেকে আর অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে। কোটি কোটি ডিএনএর সমন্বয়ে একেকটি ক্রমোজোম তৈরি হয়। এই ডিএনএকে বলা হয় আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক। অর্থাৎ আমাদের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য; যেমন—আচার-আচরণ, বুদ্ধিমত্তা, চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং—সব কিছুই এই ডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে মানবশরীরে এই ডিএনএ বা ক্রমোজোমের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি দেখা দেয়, যাদের আমরা সাধারণভাবে জন্মগত ত্রুটি বা ‘জেনেটিক ত্রুটি’ বলে থাকি। ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু সে রকম একটি জেনেটিক ত্রুটিযুক্ত মানবশিশু, যার শরীরের প্রতিটি কোষে ২১ নম্বর ক্রমোজোমটির সঙ্গে আংশিক বা পূর্ণভাবে আরেকটি ক্রমোজোম (Trisomy 21) সন্নিবেশিত থাকে। আর এই অতিরিক্ত ক্রমোজোমটির কারণে ডাউন শিশুর বিশেষ কিছু শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি লক্ষ করা যায়। কিছু বিরল ক্ষেত্রে ১৩ নম্বর (Trisomy 13) এবং ১৮ নম্বর (Trisomy 18) ক্রমোজোমের ক্ষেত্রেও এ রকম ত্রুটি লক্ষ করা যায়। এদের যথাক্রমে ‘প্যাটাও সিনড্রোম’ এবং ‘এডওয়ার্ড সিনড্রোম’ বলা হয়, যাদের প্রায় সবাই জন্মের আগেই গর্ভাবস্থায় মারা যায়। গর্ভাবস্থায় তিন মাসের মধ্যে ক্রমোজোমাল ত্রুটি নির্ণয়ের যে পরীক্ষা করা হয় তাকে সাধারণত ‘ডাউন সিনড্রোম স্ক্রিনিং’ বা ঝুঁকি নির্ণয় পরীক্ষা বলা হয়। চেহারায় একই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকে বলে খুব সহজেই ডাউন শিশুদের চেনা যায়। ডাউন শিশুরা সাধারণত আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধী শিশু হিসেবে বেঁচে থাকে।

কী কারণে ডাউন শিশুর জন্ম হয়

ঠিক কী কারণে মায়ের গর্ভে ডাউন শিশুর জন্ম হয়, তা সম্পূর্ণ জানা যায়নি। মায়ের গর্ভে যখন একটি মানবশিশু তৈরি হয়, তখন সে বাবার কাছ থেকে অর্ধেক ও মায়ের কাছ থেকে অর্ধেক ক্রমোজোম পেয়ে থাকে। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটলে তখন একটি ডাউন শিশুর জন্ম হয়। তবে এ কথা প্রমাণিত যে কোনো নারী যত বেশি বয়সে মা হবেন, তাঁর সন্তান ডাউন শিশু হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি। যেমন—২৫ বছর বয়সের প্রতি এক হাজার ২০০ গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজনের, ৩০ বছর বয়সের প্রতি ৯০০ মায়ের মধ্যে একজনের ডাউন শিশু হতে পারে। কিন্তু ৩৫ বছর বয়সের পর ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে থাকে। ৩৫ বছর বয়সের প্রতি ৩৫০ গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজন এবং ৪০ বছর বয়সের প্রতি ১০০ জন মায়ের একজনের ডাউন শিশু হতে পারে। বেশি বয়সের মায়ের গর্ভে ডাউন শিশু হওয়ার আশঙ্কা বাড়লেও যেহেতু তরুণী বয়সেই বেশির ভাগ নারী মা হয়ে থাকেন। তাই অল্প বয়সের মায়েদের মধ্যেই ডাউন শিশু সচরাচর দেখা যায়। তার মানে যেকোনো বয়সের মায়ের ডাউন শিশু হতে পারে। অন্যদিকে কোনো মায়ের আগে একটি ডাউন শিশু থাকলে পরেও ডাউন শিশু হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। পরিবেশদূষণ, গর্ভবতী মায়ের ভেজাল খাদ্য ও প্রসাধনী গ্রহণ, তেজস্ক্রিয়তা ইত্যাদি কারণেও ডাউন শিশুর জন্ম হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অনেক সময় মা-বাবা ত্রুটিযুক্ত ক্রমোজোমের বাহক হলে তাঁদের সন্তানও ডাউন শিশু হতে পারে।

কিভাবে ডাউন শিশু শনাক্ত করা যায়

একজন চিকিৎসক যেকোনো বয়সের শিশুকে দেখেই ডাউন শিশু কি না, তা সন্দেহ করতে পারেন। কারণ তাদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য থাকে। মা-বাবারা যখন দেখেন তাঁদের সন্তানের চেহারা একটু ভিন্ন ধরনের, শিশুর গায়ে শক্তি কম, নির্ধারিত বয়সে বসতে, দাঁড়াতে বা হাঁটতে শিখছে না, শারীরিক বৃদ্ধি কম, কম বুদ্ধিসম্পন্ন, তখন তাঁরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক শিশুর রক্তের ক্রমোজোম সংখ্যা বা ‘ক্যারিওটাইপিং’ পরীক্ষার মাধ্যমে ডাউন শিশু কি না, তা নিশ্চিত করেন।

মায়ের গর্ভেই ডাউন শিশু শনাক্ত পরীক্ষা

আমাদের দেশে গর্ভবতী মা এবং তাঁর সেবাদানকারী চিকিৎসক সাধারণত বাচ্চার শারীরিক ত্রুটির বিষয়টি গুরুত্ব দেন। এ জন্য প্রায়ই আলট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু উন্নত বিশ্বে প্রত্যেক গর্ভবতী মাকে ডাউন সিনড্রোম ও অন্যান্য সম্ভাব্য জন্মগত ত্রুটি এবং তা নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া চিকিৎসকের জন্য বাধ্যতামূলক। গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের ক্রমোজোমাল ত্রুটির ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য বেশ কয়েক রকম পরীক্ষা আছে। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত পরীক্ষাটি বর্তমানে দেশে প্রথমবারের মতো চালু করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগ, রেডিওলজি ইমেজিং বিভাগ এবং ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগের সমন্বয়ে এই পরীক্ষা চালু হয়েছে।

এত দিন দেশের বাইরে থেকে এই পরীক্ষা করিয়ে আনা হতো। দেশের বাইরে থেকে এই পরীক্ষা করিয়ে আনতে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাগত। এখানে এখন মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় করা যাবে। মূলত দামি সফটওয়্যার ও দক্ষ সনোলজিস্ট এই পরীক্ষা চালু করার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গর্ভবতী মায়েরা প্রথম তিন মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি বহির্বিভাগে যোগাযোগ করে এই সেবা নিতে পারেন।

কিভাবে এই পরীক্ষা করা হয়?

গর্ভাবস্থায় ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যেই মায়ের রক্তে প্যাপ-এ, এইচসিজি নামক হরমোনের মাত্রা দেখা হয়। আলট্রাসনোগ্রাফি করে শিশুর ঘাড়ের পেছনের তরলের মাত্রা (Nuchal Translucency), নাকের হাড়ের (Nasal Bone) উপস্থিতি, ‘ডাকটাস ভেনোসাস (Ductus Venosus)’ নামক প্রাথমিক রক্তনালির রক্তপ্রবাহ দেখা হয়। মায়ের অন্যান্য তথ্য; যেমন—বয়স, ডায়াবেটিস আছে কি না, আগে ক্রমোজোমাল ত্রুটিযুক্ত সন্তান প্রসবের ইতিহাস ইত্যাদি প্রয়োজন হয়।

এসব তথ্য-উপাত্ত বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে মায়ের গর্ভে ডাউন সিনড্রোম বা ক্রমোজোমাল ত্রুটিযুক্ত ভ্রূণ থাকার আশঙ্কা আছে কি না তার ঝুঁকি নির্ণয় করা হয়। মনে রাখতে হবে, এটি একটি ঝুঁকি নির্ণয় পরীক্ষা, নিশ্চিত পরীক্ষা নয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত মায়েদের ডাউন সিনড্রোমের নিশ্চিত পরীক্ষা করার উপদেশ দেওয়া হয়।

ডাউন ভ্রূণের নিশ্চিত পরীক্ষা

গর্ভের ভ্রূণটি সিনড্রোমে আক্রান্ত কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত করতে হলে ভ্রূণের ডিএনএ পরীক্ষা করা দরকার। এ জন্য গর্ভাবস্থার ভ্রূণের প্রাথমিক গর্ভফুল থেকে কোষকলা (Chorionic Villus Sampling) অথবা গর্ভে ভ্রূণের চারপাশের তরল পদার্থ সংগ্রহ (Amniocentesis) করে ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। সেখানে ভ্রূণের সরাসরি ক্রমোজোম সংখ্যা নির্ণয়ের মাধ্যমে গর্ভের ভ্রূণটি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত করা হয়। এ সময় ভ্রূণের আকার হয় প্রায় দুই থেকে চার ইঞ্চির মতো। কাজেই রিপোর্ট অনুযায়ী মা-বাবা গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাওয়া না যাওয়ার ব্যাপারে মানসিক প্রস্তুতি বা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

যেহেতু ঝুঁকি নির্ণয় পরীক্ষাগুলো শতভাগ নিশ্চিৎ নয় আর যেকোনো মায়েরই ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু হতে পারে, তাই একজন গর্ভবতী মহিলা তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ডাউন সিনড্রোম নির্ণয়ের ঝুঁকি নির্ণয় পরীক্ষা বা নিশ্চিত পরীক্ষা যেকোনোটি বেছে নিতে পারেন।

চাই সচেতনতা

সুযোগ ও সচেতনতার অভাবে আমাদের দেশে এখনো বেশির ভাগ গর্ভবতী মা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে পারেন না। অন্যদিকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলেও ডাউন শিশু সম্পর্কে বা অন্য কোনো জন্মগত ত্রুটি সম্পর্কে মাকে ধারণা দেওয়ার ব্যাপারটি উপেক্ষিত। তা ছাড়া দেশে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগও ছিল না। ফলে অনেক প্রতীক্ষার পর কোনো মা-বাবার সংসারে যখন একটি ডাউন শিশুর জন্ম হয়, তখন ওই সংসারে আনন্দের বদলে চরম দুশ্চিন্তা ভর করে। কাজেই সচেতন হওয়া ছাড়া প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই। উন্নত বিশ্বে প্রত্যেক গর্ভবতী মাকে ডাউন শিশু ও অন্যান্য সম্ভাব্য জন্মগত ত্রুটি এবং তা নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া চিকিৎসকের জন্য বাধ্যতামূলক। যেহেতু মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাউন শিশু হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে, তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানে বেশি বয়সে মা হওয়াকে নিরুৎসাহ করা হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments