Thursday, July 18, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামদুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ণের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ভেঙে দিতে হবে

দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ণের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ভেঙে দিতে হবে

রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি আমি পাইছি চোরের খনি’। তিনি যথার্থভাবেই জাতির মূল সমস্যাটিকে চিহ্নিত করেছিলেন। একটি সদ্য স্বাধীন জাতির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সমস্যা দূর করতে তাঁর ভূমিকা ও কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক ও মতভেদ থাকতেই পারে। তবে তিনি প্রকাশ্যেই নিজের দলের নেতাকর্মীদের চৌর্যবৃত্তি সম্পর্কে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ৭ কোটি মানুষকে দুর্ভীক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে বিশ্বসম্প্রদায় যথাযথভাবে সাড়া দিলেও দুর্ভীক্ষ ঠেকানো যায়নি। ৭ কোটি মানুষের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে জাহাজ বোঝাই হয়ে লাখ লাখ টন খাদ্য সহায়তাসহ নানাবিধ সামগ্রী এসেছিল। সেসবের বড় অংশ সীমান্ত পথেই চোরাই হয়ে গিয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ৭ কোটি মানুষের জন্য সাড়ে ৭ কোটি কম্বল এসেছে, আমার কম্বলটি কই? ‘চোর ও চাটারদল’ সব শেষ করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের এ অবস্থা দেখে তৎকালীন মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ডিপ্লোম্যাট, হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে, ‘বটমলেস বাস্কেট’ বা তলাবিহীন ঝুঁড়ি। তলায় বড় ফুটো রেখে ঝুঁড়িতে যতকিছুই রাখা হোক না কেন, ঝুঁড়ি কখনোই পূর্ণ হবে না। স্বাধীনতার ৫০ বছর তথা সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে এসেও বাংলাদেশ কি তার সামাজিক-রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে? ক্ষমতাসীনরা যতই বগল বাজান না কেন, দেশের মানুষের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তি, সাম্য ও নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। বরং সামাজিক অবক্ষয়, অস্থিরতা, অপরাধ প্রবণতা এবং শোষণ ও বৈষম্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে। যে দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় শত মিলিয়ন, যে দেশের ভূমির প্রায় পুরোটাই উর্বর এবং আবাদযোগ্য, যে দেশের ভেতরে জালের মত বিছিয়ে আছে সুপেয় পানির অসংখ্য নদনদী, যে দেশের কোলঘেঁসে একদিকে রূপালী সমুদ্র তার অপার সম্পদরাশি মেলে ধরেছে, বিশ্বের দীর্ঘতম ও নয়নাভিরাম সমুদ্রসৈকত এবং সবুজ পাহাড়ের হাতছানি বৈশ্বিক পর্যটনের অমিত সম্ভাবনা ধারণ করে আছে, যে দেশের এককোটিরও বেশি শ্রমিক বিশ্বের দেশে দেশে উন্নয়নের সহায়ক হয়ে দেশের জন্য শত শত কোটি ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোপানে পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করে চলেছে, যে দেশের শ্রমিকরা বিশ্বের সবচেয়ে কম পারিশ্রমিকে সবচেয়ে উন্নত মানের পোশাক তৈরী করে পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোর চাহিদা মিটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে, স্বাধীনতার ৫ দশক পেরিয়ে এসে সে দেশ এখনো মধ্য আয়ের দেশে পরিনত হতে না পারার পেছনে কাজ করছে, চোর, চাটারদল ও লুটেরা-দুর্বৃত্তরা। এদেরকে হটাতে না পারলে দেশ কখনোই স্বাধীনতার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের দিকে পৌঁছাতে পারবে না।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সৈনিকরা সাম্য, সম্প্রীতি, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির শপথ গ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে যে চারটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল, সময়ের বিবর্তনে তার দু’টি ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কখনো প্রশ্নবিদ্ধ বা অপসৃত হয়নি। সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে জনগণের কাছে গ্রাহ্য রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হচ্ছে, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরমকরুণাময় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা এবং জাতীয়তাবাদ। গণতান্ত্রিক সংবিধান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পৃষ্ঠপোষণ এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল আইন পরিষদ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কায়েম করা ছাড়া গণতন্ত্র ও মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তির প্রত্যাশা কখনো পুরণ হওয়ার নয়। স্বাধীনতার আগেও আমাদের ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ভূখণ্ড ছিল এখনো আছে। সেই মানচিত্র সেই ভূগোল-বৈচিত্র নিয়েই আমরা বিশ্বের দরবারে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছি। কিন্তু রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ণ, সাধারণ মানুষের উপর ক্ষমতাধরের শোষণ, রাজনৈতিক কারণে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিকাশ এবং সেই থেকে উদ্ভুত সামাজিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরূপ বার্তা নতুন মাত্রায় দেশকে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিতে শুরু করেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে তোলা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বহুদলীয় গণতন্ত্রে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের দায়িত্ব পালন করে থাকে, সেসব প্রতিষ্ঠান যদি ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাধরদের স্বার্থে তাদের ইচ্ছামত পরিচালিত হয়, সেখানে গণতন্ত্র, সুশাসন ও ন্যাবিচারের প্রত্যাশা কখনোই পুরণ হতে পারে না। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র আজ এই সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। গণতন্ত্রহীনতা, দুর্বৃত্তায়ণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ছাড়া এ থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ নেই।

বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন এবং এর মাঝখানে প্রায় প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচনের কোথাও জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। এর আগের প্রতিটি নির্বাচন নিয়েই এ ধরণের অভিযোগ তোলা যায়। দেশের ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনগত নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত হওয়া ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী প্রার্থীকে হারিয়ে বিরোধিদল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয় নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য, সক্ষমতা বা নিরপেক্ষতা প্রমান করে না। এর পেছনে স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশ কাজ করে থাকে। এবারের স্থানীয় নির্বাচনে রাজপথের বিরোধিদল বিএনপি দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ না করায় আওয়ামীলীগের মধ্যে আভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা বেশি হওয়ায় তৃতীয় পক্ষের অনেক প্রার্থী বিজয়ী হতে দেখা গেছে। এরপরও দলের মন্ত্রী-এমপিদের পছন্দনীয় ব্যক্তি এবং যেসব স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা মেয়র বা ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অথবা দুর্বল প্রার্থীর বিপক্ষে সহজে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন। বিগত স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি অধ্যুষিত অনেক এলাকায় বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থীদের চাপে ফেলে বা হুমকির মুখে নির্বাচনের বাইরে রেখে সরকারী দলের প্রার্থীদের বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় অথবা দুর্বল প্রার্থীদের সাথে কার্যত পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হওয়ার নজির অনেকটাই স্পষ্ট। বিগত কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রধান বিরোধিদলসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশ্রগহণ করে এবং না করে ভোটের যে ফলাফল দেখা গেছে, তাতে স্পষ্টই নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার চিত্রই বেরিয়ে আসে। এ ধরণের নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই গত একযুগ ধরে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র সূচকে ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত তালিকা থেকে হাইব্রিড রিজিমের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। গণতন্ত্রের দাবিকে সামনে রেখে একটি গণযুদ্ধে লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এসে এ এক বড় বিপর্যয় ও ব্যর্থতা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে এসেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মত সার্বজনীন প্রশ্নে বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। এতকিছুর পরও আগামি নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

বর্তমান ব্যবস্থায় শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন বাস্তবায়ন অসম্ভব। তবে কমিশনের সদস্যরা যদি দক্ষ, ন্যায়পরায়ন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও দেশ-জাতির প্রতি সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কমিটমেন্ট সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাহলে নির্বাচন ব্যবস্থায় তার ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটাতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশান। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে দিল্লীর নির্বাচন সদনে দায়িত্ব পালনকারী এই ডাকসাইটে আমলা ভারতের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। তিনি ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের জন্য আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছিলেন। প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকেও কিভাবে নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেই নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষমতা ও অনড় দায়িত্বশীলতার ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। টি এন সেশান প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দায়িত্ব গ্রহণের প্রথমদিনেই তার অফিস কক্ষ থেকে হিন্দু দেব- দেবিদের ছবি ও মূর্তি অপসারণের আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছিলেন, নির্বাচন কমিশন ভারত সরকারের অংশ বা অধীন প্রতিষ্ঠান নয়। নির্বাচন কমিশন যে সরকারের সমান্তরাল একটি সাংবিধানিক সত্তা তা তিনি নিজের কাজের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালের আগস্টে টি এন শেসান ১৭ পৃষ্ঠার এক নির্দেশ জারি করেন, যেখানে বলা হয়, যতদিন না নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে সরকার মান্যতা দিচ্ছে, ততদিন দেশে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। রাজিবগান্ধী নিহত হওয়ার পর সরকারের সাথে আলোচনা না করেই চলমান লোকসভা নির্বাচন তিনি স্থগিত করে দিয়েছিলেন। নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন, সরকারি দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের প্রথম সারির আমলাদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন টি এন সেশান। তিনি প্রমান করে দিয়েছিলেন, সাংবিধানিক স্পিরিটের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান আইনেই নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে কাজ করতে সক্ষম। টি এন সেশানের আগে ও পরের আর কোনো নির্বাচন কমিশনের সাথে তার দায়িত্বশীলতা ও সাহসিকতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি ভারতসহ উপমহাদেশের নির্বাচন কমিশনারদের জন্য যোগ্য উদাহরণ হয়ে আছেন। তবে শুধুমাত্র সুযোগ্য ন্যায়পরায়ণ আমলা বা বিচারকের পক্ষেই কেবল প্রবল রাজনৈতিক ক্ষমতার চাপ উপেক্ষা করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নোত রাখতে এমন দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব। কোনো বর্ণচোরা দলকানা, অসৎ ও ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তি আইনের শাসন ও নিরপেক্ষভাবে ক্ষমতা প্রয়োগের যোগ্যতা দেখাতে পারে না। ক্ষমতাসীনরা সাধারণত এমন লোকদেরকেই নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বেছে নিতে চায়। যারা অনুগত নখদন্তহীন বাঘের ভূমিকা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ হাসিলে কাজ করতে অভ্যস্থ। বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী নির্বাচন কমিশন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এর মধ্যেও এই কমিশনের একজন জেষ্ঠ্য নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার উদাহরণ রেখে গেছেন। আমলা হিসেবে সিনিয়রিটি অনুসারে, কেএম নুরুল হুদার স্থলে মাহবুব তালুকদারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হলে হয়তো বাংলাদেশেও একটি নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হতে পারতো।

দেশে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তথাকথিত সার্চ কমিটির হাতে ২০ জনের শর্টলিস্ট নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে। চূড়ান্ত বাছাইয়ে নির্বাচন কমিশনে কারা স্থান পায় দুয়েকদিনের মধ্যেই হয়তো তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। ক্ষমতাসীনরা স্বাভাবিকভাবেই টি এন সেশান বা মাহবুব তালুকদারের মত ব্যক্তিত্ববান, আপসহীন ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনে দেখতে চাইবে না। আগেই উল্লেখ করেছি, শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশন বা নির্বাচন ব্যবস্থাই গণতন্ত্র ও সামাজিক-রাজনৈতিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি নয়। নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিত করার সাথে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দলকানা ও ক্ষমতার হালুয়া রুটি ভোগী নির্বাচন কমিশন, ক্ষমতার প্রতি দুর্বল ও নখদন্তহীন দুর্নীতি দমন কমিশন, নিস্ত্রিয় ও অর্থব জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং দুর্বৃত্তায়ণের সহযোগি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সমুন্নোত করা সম্ভব নয়। সর্ষের ভেতরের ভুতগুলোকে আগে তাড়াতে হবে। রক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে ভক্ষকের ভূমিকা আর চলতে দেয়া যায় না। আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন আগে কি করেছে তা নিয়ে নতুন করে কিছু বলা অবান্তর। দুদক এখন কিভাবে চলছে সেটাই দেখার বিষয়। দেশে বেড়ে ওঠা সর্বব্যাপী দুর্নীতি দমন করতে না পারলে অন্যসব অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব। দুদক থেকে সদ্য চাকরিচ্যুত উপ-সহকারি পরিচালক শরীফ উদ্দিনের বহিষ্কারাদেশের ঘটনা থেকেই শর্ষের ভেতরের ভূত এবং দেশের দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নচক্রের চিত্র অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়। আপসহীন সাহসী তরুণ কর্মকর্তা শরিফ উদ্দিন চট্টগ্রাম অঞ্চলে সাড়ে ৩ বছর দায়িত্ব পালন কালে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির তথ্য উদঘাটনসহ চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। কর্ণফুলি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল), প্রবাসি কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি’র পুত্র, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রভাবশালী ওয়ার্ড কাউন্সিলর, এনআইডি’ ন্যাশনাল সার্ভার ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেয়ার ঘটনার সাথে জড়িতদের অনুসন্ধান করে বের করে নির্বাচন কমিশনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, পেট্টোবাংলার ডিরেক্টর (প্ল্যানিং) আইয়ুব খানসহ শতাধিক রাঘব-বোয়াল দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে নিজে বাদি হয়ে মামলা দিয়ে দুদকে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন শরীফ উদ্দিন। এ জন্য দুদক তাকে পুরষ্কৃত করার বদলে বিতর্কিত আইনের অপপ্রয়োগ করে তাকে চাকরিচ্যুত করেছে। হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য উদঘাটনসহ রাঘববোয়ালদের প্রলোভন ও হুমকির কাছে নতি স্বীকার না করে মামলা দিয়ে বিচারের সম্মুখীন করার দৃঢ় প্রত্যয়ী দুদক কর্মকর্তাকে দুর্নীতিবাজদের পক্ষ থেকে চাকরিচ্যুতির হুমকির দুই সপ্তাহের মধ্যেই শরীফ উদ্দিন দুর্নীতির অস্বচ্ছ অভিযোগে কোনো প্রকার নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। বরখাস্ত হওয়ার আগে থেকেই তিনি প্রভাবশালীদের দ্বারা ক্ষতির আশঙ্কা করে নিজ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন। নিজ প্রতিষ্ঠানের সাহসী কর্মকর্তার পাশে দাঁড়ানোর বদলে তাকে চাকরিচ্যুত করার মধ্য দিয়ে দুদক দেশবাসির কাছে যে বার্তা দিয়েছে তা সত্যিই ভয়াবহ অশনিসংকেত। কোটি কোটি মানুষের শ্রমে-ঘামে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে চলা বাংলাদেশ কয়েকশ দুর্নীতিবাজ আমলা, রাজনীতিবিদ, সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তের কাছে দীর্ঘদিন জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না। দেশের গণতন্ত্রকামী ও দুর্নীতি বিরোধী মানুষ এবং উচ্চ আদালতকে দুর্নীতি দমন কমিশনের শরীফ উদ্দিন বা নির্বাচন কমিশনের মাহবুব তালুকদারদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments