টানা দুই সপ্তাহের দরপতনে সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা

শেয়ারবাজারে দরপতন থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই দর হারাচ্ছে অধিকাংশ শেয়ার। এতে সূচকও কমছে। আর দিন দিন লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। প্রতিদিন দরপতনের কারণে সমন্বয়ও হচ্ছে না শেয়ারের মূল্য।

আজিজুর রহমান নামে এক বিনিয়োগকারী বলেন, একটি কোম্পানির শেয়ারে ৪৬ টাকা করে বিনিয়োগ করি। পরবর্তী সময়ে আরও কিনে সমন্বয়ের চেষ্টা করি। ফলে এখন শেয়ারের গড় ক্রয়মূল্য নেমেছে ৪০ টাকা। কিন্তু শেয়ারের দাম কমতে কমতে এখন ২৮ টাকায় নেমেছে। ফলে কোনো ফর্মুলা কাজে আসছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শেয়ারবাজার স্বাভাবিক নিয়মে চলছে না। বাজার অর্থনীতিতে ইতিবাচক কোনো ভূমিকাও রাখতে পারছে না। এই হারানো পুঁজি ফিরে পাওয়ার উপায় কী? কারও জানা নেই এসব প্রশ্নের উত্তর। কোনো শেয়ারে বিনিয়োগের পর সেটি ধরে রাখার বিষয়ে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী বিভ্রান্ত। তা ছাড়া একটু শেয়ারদর বাড়লেই অনেক বিক্রির চাপ আসছে। ফলে বাজার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাচ্ছে না।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় দরপতনের মধ্য দিয়ে আরও একটি সপ্তাহ পার করলেন বিনিয়োগকারীরা। গত সপ্তাহেই বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছেন। আগের সপ্তাহে বিনিয়োগকারীরা হারান সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এর ফলে টানা দুই সপ্তাহের বড় দরপতনে প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, বৃহৎ মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন বাজারকে বেশি নাজুক করে তুলছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন করে বিনিয়োগের মতো অর্থের ঘাটতি থাকায় শেয়ারের চাহিদা কমেছে। এ ছাড়া মার্জিন ঋণের সুদহার আগামী ১ জুলাই থেকে ১২ শতাংশ হওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে অনেক ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক গ্রাহকদের আগের মতো ঋণ দিচ্ছে না। উল্টো মার্জিন ঋণ সমন্বয় বা ফেরতের চাপ দিচ্ছে। এতে বাজারে তারল্যপ্রবাহ কমছে। এ কারণেও শেয়ারের চাহিদা কমায় দরপতন হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।

বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি বৃহৎ মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের বাজারদর কমায় অনেকের বিনিয়োগ আটকে গেছে। নতুন করে বিনিয়োগের সক্ষমতাও নেই এদের অনেকের। এর মধ্যে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি কেমন যাবে, তা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে রয়েছেন অনেকে। এমন প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগ করার ক্ষমতা থাকলেও তারা সাহস দেখাচ্ছেন না। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সার্বিক এ প্রবণতা শেয়ারবাজারকে নিম্নমুখী ধারায় ঠেলে দিচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তিন কার্যদিবস শেয়ারবাজারে দরপতন হয়। এর মধ্যে দুই কার্যদিবসে রীতিমতো ধস নামে শেয়ারবাজারে। এতেই বড় অঙ্কের অর্থ হারালেন বিনিয়োগকারীরা। সেই সঙ্গে মূল্যসূচকেরও বড় পতন হয়েছে। কমেছে লেনদেনের পরিমাণও। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা, যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৮ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমে ১০ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে টানা দুই সপ্তাহের পতনে বাজার মূলধন কমল ১৯ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা।

বাজার মূলধন বাড়া বা কমার অর্থ তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ও ইউনিটের দাম সম্মিলিতভাবে ওই পরিমাণ বেড়েছে বা কমেছে। এদিকে গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১০৭ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমে ১৩৪ দশমিক ১৬ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ দুই সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ২৪১ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট। প্রধান মূল্যসূচকের পাশাপাশি বড় পতন হয়েছে ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচকেরও। গত সপ্তাহজুড়ে সূচকটি কমেছে ৫২ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমে ৮০ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

অন্যদিকে ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিতে পরিচালিত কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই শরিয়াহ সূচক গত সপ্তাহজুড়ে কমেছে ২৯ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৪০ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমে ১৮ দশমিক শূন্য ৯ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সব কয়টি মূল্যসূচকের পতনের পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া যে কয়টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, কমেছে তার চার গুণের বেশি। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে দাম বেড়েছে মাত্র ৫৩টি প্রতিষ্ঠানের। বিপরীতে দাম কমেছে ২২১টির। ৯৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসে ডিএসইতে গড়ে লেনদেন হয়েছে ৬০১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় ৬৫৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেন কমেছে ৫৫ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাজার সব সময় চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। বাজারে অস্বাভাবিক দরপতনের পেছনে কোনো কারণ থাকলে তা বিএসইসিকে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English