থাইরয়েড গ্রন্থি একটি অতি প্রয়োজনীয় অন্তঃক্ষরা (এন্ডোক্রাইন) গ্লান্ড, যা গলার সামনের অংশে অবস্থিত। এটি মানব শরীরের প্রধান বিপাকীয় হরমোন তৈরিকারী গ্লান্ড। থাইরয়েড হরমোনের অন্যতম কাজ হচ্ছে শরীরের বিপাকীয় হার বা বেসাল মেটাবলিক রেট বাড়ানো।

থাইরয়েড হরমোনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে স্নায়ুর পরিপক্বতা। এজন্য গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতায় গর্ভের বাচ্চা বুদ্ধিদীপ্ত হয় না। যেসব উদ্দীপনায় বিপাক ক্রিয়া বেড়ে যায় যেমন-যৌবনপ্রাপ্তি, গর্ভাবস্থা, শরীরবৃত্তীয় কোনো চাপ-ইত্যাদি কারণে থাইরয়েড গ্লান্ডের আকারগত বা কার্যকারিতায় পরিবর্তন হতে পারে।

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে মূলত দুধরনের সমস্যা দেখা যায়-গঠনগত ও কার্যগত। এটা বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশ পেতে পারে। গঠনগত সমস্যায় থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায় যেটাকে গয়টার বা গলগণ্ড বলা হয়; এছাড়া থাইরয়েড গ্লান্ডে গোটা বা নডিউল এবং ক্যান্সার হতে পারে।

কার্যগত সমস্যা দুই রকমের হয়ে থাকে, যা হলো থাইরয়েড গ্লান্ডের অতিরিক্ত কার্যকারিতা বা হাইপারথায়রয়েডিজম এবং কার্যকারিতা হ্রাস বা হাইপোথায়রয়েডিজম। এছাড়া থাইরয়েড গ্লান্ডের প্রদাহ বা থাইরয়ডাইটিস হতে পারে। হাইপারথাইরয়ডিজম রোগে থাইরয়েড গ্লান্ড বেশি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে পড়ে। থাইরয়েড গ্লান্ডের অতিরিক্ত কার্যকারিতার ফলে প্রচণ্ড গরম লাগা, হাত পা ঘামা, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, খাওয়ার রুচি স্বাভাবিক বা বেড়ে যাওয়ার পরও ওজন কমে যাওয়া, ঘন ঘন পায়খানা হওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

হার্ট ও ফুসফুসীয় সমস্যা : বুক ধড়ফড়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, হার্ট ফেইলিওর, এনজাইনা বা বুক ব্যথা। স্নায়ু ও মাংসপেশির সমস্যা : অবসন্নতা বা নার্ভাসনেস, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, উত্তেজনা, আবেগ প্রবণতা, সাইকোসিস বা মানসিক বিষাদগ্রস্ততা; হাত পা কাঁপা, মাংসপেশি ও চক্ষুপেশির দুর্বলতা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এছাড়া হাড়ের ক্ষয় বা ওস্টিওপোরোসিস, মাসিকের সমস্যা, বন্ধ্যত্ব পর্যন্ত হতে পারে।

থাইরয়েড গ্লান্ডের কার্যকারিতা হ্রাস বা হাইপোথায়রয়েডিজম : আয়োডিনের অভাবে হাইপোথায়রয়েডিজম হতে পারে। এছাড়া অটোইমিউন হাইপোথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড গ্লান্ডের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি সক্রিয় হলে গ্লান্ড নষ্ট হয়ে যায় এবং থাইরয়েড গ্লান্ড কাজ করে না। চিকিৎসাজনিত কারণেও এ রোগ হতে পারে। অপারেশনের কারণে থাইরয়েড গ্লান্ড বাদ দিতে হলে বা অন্য কারণেও থাইরয়েড নষ্ট হয়ে গেলে এ সমস্যা হতে পারে।

হাইপোথায়রয়ডিজমের লক্ষণ : অবসাদগ্রস্ত হওয়া, ত্বক খসখসে হয়ে যায়, ক্ষুধা মন্দা, চুল পড়া। ওজন বেড়ে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, শীত শীত ভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, রক্তচাপ বাড়া, মাসিকের সমস্যা ইত্যাদি। বন্ধ্যত্ব সমস্যা হতে পারে। গর্ভধারণকালে গর্ভপাত হতে পারে। কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়ডিজমে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ হয় না।

থাইরয়েড ক্যান্সার : থাইরয়েড গ্রন্থির কোনো অংশের কোষসংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেলে তাকে থায়রয়েড ক্যান্সার বলে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থি বা এর অংশবিশেষ ফুলে ওঠা মানেই ক্যান্সার নয়। থাইরয়েড ক্যান্সারে যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে : গলার সম্মুখভাগে ফুলে ওঠা। ফোলা অংশটি বেশ শক্ত হয়। একটি বা একাধিক টিউমার হতে পারে। উভয় পাশে টিউমার হতে পারে, আশপাশের লিঙ্ক নোডগুলো ফুলে উঠতে পারে। ওজন কমে যায়।

খাওয়ার রুচি কমে যেতে পারে। গলার স্বর মোটা বা ফ্যাসফেসে হতে পারে। তবে থাইরয়েড নোডিউল বা ক্যান্সার ছাড়াও গলার সামনে ফুলে উঠতে পারে। শ্বাসনালির ওপর চাপ সৃষ্টির ফলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। ক্যান্সার শনাক্ত হলে বা ক্যান্সার আছে এমন সন্দেহ হলে অতিদ্রুত নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ বা থাইরয়েড অপারেশনে পারদর্শী কোনো সার্জনের কাছে যেতে হবে।

ডা. শাহজাদা সেলিম : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English