Monday, July 4, 2022
spot_img
Homeজাতীয়ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর বাবার নামে এখনো বিল আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাড়িতে

ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর বাবার নামে এখনো বিল আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাড়িতে

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় বন্ধুর সঙ্গে জায়গা বিনিময় করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় চলে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার কাজীপাড়ার বাসিন্দা মাখন লাল সাহা। সেই মাখন লাল সাহার ছেলে ডা. মানিক লাল সাহা এখন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। ত্রিপুরা তো বটেই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও এখন ডা. মানিক সাহাকে নিয়ে আলোচনা। মানিক সাহা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর জানা গেল, তাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৈতৃক ভিটা এখনো রয়ে গেছে।

এমনকি মানিক সাহার বাবা মাখন লাল সাহার নামে এখনো ওই বাড়ির বিদ্যুৎ বিল আসে।

বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন মাখন লাল সাহার বাড়ির বাসিন্দা মো. শরিফুল ইসলাম মালদার। বললেন, ‘আমার বাবা নূর মিয়া মালদারের বাড়ি ছিল আগরতলার ধলেশ্বরে। দেশভাগের সময় বাংলাদেশে আসার সুবাদে বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় মাখন লাল সাহার। আলাপচারিতার মধ্যেই তারা বাড়ি বিনিময় করেন। আমার খুব ভালো লাগছে যে ভারতে আমাদের যে বাড়ি আর আমরা যে বাড়িতে থাকি সেই বাড়ির একজন ত্রিপুরার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ‘ 

এক প্রশ্নের জবাবে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার বাবার কথা অনুযায়ী এখনো বিদ্যুতের মিটারের নামটি বদল করেনি। যখন মাখন কাকার নামে বিদ্যুতের বিল আসে তখনই কাকা ও আব্বার কথা খুব মনে পড়ে। আমি আমার সন্তানদেরকেও বলেছি যেন এ নামটা পরিবর্তন না করে। ’

এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ ‘নিজ এলাকার’ একজন পাশের দেশের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় বেজায় খুশি। বিষয়টি নিজেদের গর্ব উল্লেখ করে এতে দুই দেশের মধ্যে আরো বেশি সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে বলে এলাকার মানুষ আশা প্রকাশ করেন।

ত্রিপুরা রাজ্য বিজেপির সভাপতি ডা. মানিক লাল সাহা রবিবার সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর আগের মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দে পদত্যাগের পর তিনি শপথ নেন। বিপ্লব কুমার দের পৈতৃক বাড়িও ছিল বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার কচুয়ায়।  

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পৌর এলাকার প্রধান সড়ক টিএ রোড হয়ে কাজীপাড়া ঢুকতেই মাখন লাল সাহার সেই বাড়ি। মাখন লাল সাহা যে দালানঘরটিতে থাকতেন, সেটি বেশ পুরনো অবস্থায় আগের অবয়বেই রয়ে গেছে। মাখন লাল সাহা ও তার ভাইয়েরা যে জায়গাটি বিনিময় করে গেছেন, সেখানে একাধিক বাড়ির পাশাপাশি দোকানপাট রয়েছে। বাড়ির যে উঠান ও বাগান ছিল, সেখানটায়ও ঘর উঠে গেছে। বাড়িটি ২৪ শতাংশের বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

টিংকু সাহা নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি মাখন লাল সাহার সেই বাড়িটি চিনিয়ে দিলেন। বলেন, ‘মাখন সাহাকে আমি জেঠা হিসেবে ডাকতাম। ওনার ছেলে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে, খুব ভালো লাগছে। এটা আমাদের কাছে অনেক গর্বের। ’   

ফালু শীল নামে কাজীপাড়ার আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বাড়ির পাশের একজন মানুষ পাশের রাষ্ট্রের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার খবরটি নিশ্চয়ই আনন্দের। খরবটি জানার পর থেকে আমার খুব ভালো লাগছে। ’ মাখন লালের পরিবারের সদস্যরা এখানে প্রায়ই আসতেন বলে তিনি জানান।

প্রবীণ ব্যক্তি মুদিমাল ব্যবসায়ী রমন সাহা বলেন, ‘মাখন লাল সাহার বাড়িতে দুর্গাপূজা হতো। তিনি কাজীপাড়ার বাড়ি ছেড়ে আগরতলায় যাওয়ার পরও পুজার সময় আসতেন। পরবর্তী সময়ে তার ছেলেরাও আসতেন। এই বাড়িতে তাদের কেউ না থাকলেও মাঝে মাঝে নিকটাত্মীয়েরা এ বাড়িটি দেখতে এখনো আসেন। বাড়িতে থাকা লোকজনের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। ’
 
বাড়িটির বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম মালদার জানান, ‘মানিক সাহার পিতার বাড়িতে আমার জন্ম। সেই দিক থেকে আমাদের সম্পর্ক আত্মার। সে কারণে ভারত থেকে পাকিস্তান ও পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার পর আজও আমাদের বাড়ির বিদ্যুৎ বিল মাখন লাল সাহার নামে রয়েছে। বন্ধুর স্মৃতি হিসেবে বিদ্যুৎ বিলের নাম পরিবর্তন না করার জন্য আমার বাবা বলে গেছেন। তাদের কিছু জিনিসপত্রও আমাদের ঘরে ছিল। তবে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এসব লুট হয়ে যায়। ’

স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শরিফুল আরো বলেন, ‘আমার বাবা নূর মিয়া মালদার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে পড়তেন। থাকতেন কাজীপাড়া কিবরিয়া মহলে। তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়াও ত্রিপুরার অংশ। কাজীপাড়ায় থাকার সময় মাখন লাল সাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব। দেশভাগের সময় পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে থাকে। তখন দুই বন্ধু একে অপরের বাড়ি বিনিময়ের প্রস্তাব করেন। কম সময়ের মধ্যেই তা কার্যকর হয়। সেই থেকে তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজীপাড়ার বাসিন্দা। আর আমাদের আগরতলার বাড়ির বাসিন্দা মাখন লাল সাহা।

শরিফুল আরো বলেন, ‘আমার ভাই, মানিক সাহা ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় আমরা বেশ খুশি। কয়েক মাস আগেও মাখন কাকার স্বজনরা আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। আমাদের খোঁজ নিয়েছেন। বাবার সময় থেকেই আমাদের মধ্যে আত্মীয়ের সম্পর্ক। যা এখনো আছে। ’ বাড়ির বিদ্যুৎ বিলে মাখন লাল সাহার নাম দেখিয়ে শরিফুল কান্নায় ভেঙে পড়েন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments