Thursday, June 30, 2022
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামতিনশ টাকায় ডাল-ভাত বিক্রির পর্যটন টেকসই হবে তো?

তিনশ টাকায় ডাল-ভাত বিক্রির পর্যটন টেকসই হবে তো?

আলুভর্তা-ডাল দিয়ে এক প্লেট ভাত বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। যার কাছে যা রাখতে পেরেছে, রাখা হয়েছে সেটাই। শুধু খাবারের ক্ষেত্রে নয়, হোটেল ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৩ থেকে ৫ গুণ পর্যন্ত রাখা হয়েছে। রিকশা আর ইজিবাইকের ভাড়াও রাখা হয়েছে কয়েকগুণ। ঘটনাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারের।

এর প্রভাব হয়েছে নানামুখী। তিন দিন ছুটি কক্সবাজারে কাটানোর পরিকল্পনা নিয়ে যাওয়া মানুষদের তিন দিনের বাজেট এক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক পর্যটককে ফিরে আসতে হয়েছে পরিকল্পিত সময়ের আগেই। হোটেল ভাড়া আকাশচুম্বী হওয়ার কারণে এবং মানুষের ভিড়ের কারণে ভাড়া না পেয়ে শত শত মানুষ কক্সবাজারের রাস্তায় হেঁটে রাত পার করেছেন এই তীব্র শীতের রাতে।

করোনার কারণে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা নানারকম বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল দীর্ঘ সময়। তাই এবার যখন ১৬ থেকে ১৮ ডিসেম্বর বিজয় দিবস আর সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা তিন দিন ছুটি পাওয়া গেল, তখন কক্সবাজার আক্ষরিক অর্থেই পরিণত হলো জনসমুদ্রে। পত্রিকা থেকে জানলাম পাঁচ লাখের বেশি মানুষ গিয়েছিলেন কক্সবাজারে, যদিও দেশের এই পর্যটন কেন্দ্রটি স্থান সংকুলান করতে পারে সর্বোচ্চ দেড় লাখ মানুষের। ছুটিতে দেশের সব পর্যটন কেন্দ্রেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। তবে বলা বাহুল্য, কোনোটিরই তুলনা চলে না কক্সবাজারের সঙ্গে। কিন্তু এই ভিড়কে কেন্দ্র করে সেখানে পর্যটকদের ওপর যে কাণ্ড ঘটল, সেটার প্রভাব কোথায় যেতে পারে সেটা কি ভাবছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা?

গত কয়েক বছরে এই দেশের কিছু ফ্যাশন হাউজের ‘গলাকাটা’ দাম নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মানুষের ভীষণ ক্ষোভ-উষ্মা দেখেছিলাম। অনেকেই তখন হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছিলেন পরিবার নিয়ে কলকাতা গিয়ে সেখানে থেকে, বেড়িয়ে, কেনাকাটা করলেও আমাদের এখান থেকে কতটা কম দামে কেনাকাটা করা যায়। শুধু মিডিয়ার রিপোর্ট থেকেই নয়, আমি ব্যক্তিগতভাবেও জানি, দেশের মধ্যবিত্ত অনেক পরিবার কলকাতায় গিয়ে ঈদের শপিং করেন। ধনীরা তো আগে থেকেই যান আরও অনেক জায়গায়।

পর্যটন নিয়ে এখন দেখা যাচ্ছে একই পরিস্থিতি। ক্ষুব্ধ মানুষ তাদের হয়রানির কথা জানাচ্ছেন। আবার অনেকে খরচের হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন এই খরচে বা তার চাইতে সামান্য কিছু বেশি দিয়ে দেশের কাছাকাছি অনেক জায়গায় বেড়াতে যাওয়া যায়। আমি নিশ্চিত আশপাশের দেশের অনেকে ট্যুর অপারেটর মানুষের এই ক্ষুব্ধতার সুযোগ নেবেন, বাংলাদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য নানা আকর্ষণীয় প্যাকেজের অফার দেবেন অচিরেই। এবং এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা।

এই পরিস্থিতিতে মানুষকে হয়রানি থেকে রক্ষা করতে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াকে তীব্র সমালোচনা করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। এই দেশে একটা ভোক্তা অধিকার আইন আছে, যার মাধ্যমে প্রশাসন নিশ্চয়ই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারত। অথচ তারা দুই-একটি লোক দেখানো পদক্ষেপ নেওয়ার চাইতে বেশি কিছু করেননি। এই দেশে প্রশাসন সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, এই উদাহরণ খুব কম। তাই আমি প্রশাসনের দিক থেকে কোনো সঠিক পদক্ষেপের আশাও করিনি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই খাতের ব্যবসায়ীরা এমন একটি ভয়ঙ্কর হয়রানিমূলক কাজ কেন করলেন? এই আচরণকে সোনার ডিমপাড়া হাঁসের পেট কেটে সব ডিম একসঙ্গে বের করার চেষ্টার মতো ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে না?

একটা দীর্ঘমেয়াদি ভালো ব্যবসা তৈরি করতে এই দেশের ব্যবসায়ীদের আগ্রহের ঘাটতি শুধু এই ক্ষেত্রে দেখা যায় না। সম্ভব হলেই ভোক্তাদের ‘গলা কেটে’ অতি দ্রুত টাকা বানিয়ে ফেলার দিকেই মনোযোগ থাকে প্রায় সবার। যেখানেই চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যের কোনো সমস্যা হয়েছে, সেখানেই ব্যবসায়ীরা মানুষের কাছ থেকে বহুগুণ বেশি টাকা নিয়ে নিয়েছে।

আমি জানি, পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরা হয়তো তাদের সাম্প্রতিক ক্ষতির দোহাই দেবেন। বলবেন করোনার সময়ে তাদের খাতটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সরকারের ঋণ প্রণোদনা তারা পাননি খুব একটা। কাগজে-কলমে একটা বরাদ্দ দেখানো হলেও সেটার অতিক্ষুদ্র অংশই পেয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। মাঝারি ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো এবং এই খাতে বেকার হয়ে পড়া কর্মীরা কিছুই পায়নি, যদিও তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো সবই সত্যি কথা। তাই তাদের যুক্তি হতেই পারে তারা তাদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠে দাঁড়ানোর মতো মূলধন জোগাড় করার চেষ্টা করেছেন মানুষের কাছ থেকে এই অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করার মাধ্যমে। কিন্তু করোনার ক্ষতির দোহাই এই ব্যবসায়ীরা দিতে পারেন না, কারণ এ ধরনের সংকট করোনার আগেও বারবার হয়েছে।

বেশকিছু আকর্ষণীয় জায়গা থাকলেও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি আমাদের কাছাকাছি দেশগুলোর তুলনায়। এই খাতে নানারকম সংকটের কথা আমরা আলোচনা করি। কিন্তু বিদেশিদের কথা সরিয়ে রাখলেও দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের মাধ্যমেও এই খাত অপার সম্ভাবনার সেক্টর হয়ে উঠতে পারে।

এই দেশের মানুষের দারিদ্র্যমুক্তি ঘটছে না কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়, কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত থেকে ওপরের দিকে বেশকিছু মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে এই মানুষগুলো যদি দেশের ভেতরে পর্যটন করেন, তাহলেও এই খাতে খুব বড় সম্ভাবনা আছে। একটা খাত বিকশিত হওয়া মানেই সেখানে অর্থের লেনদেন বাড়া এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। সুতরাং সরকারের উচিত হবে, খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যাতে এই খাতটি দেশের মানুষের কাছেও আস্থা হারিয়ে না ফেলে।

পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে করোনার আগেও অতি উচ্চমূল্যের অভিযোগ ছিল। বিশেষ বিশেষ সময় অনেক বেশি মানুষের প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। তাই চাহিদা ও জোগানের সূত্র অনুযায়ী, সেবাদানকারীদের পক্ষে মূল্য অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। সুতরাং যদি কোনো বিশেষ সময়ে চাপ কমিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে এই সংকট কমিয়ে আনা সম্ভব।

আমরা খেয়াল করব শুক্র ও শনির সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে বৃহস্পতি অথবা রবিবারের ছুটি যোগ হলে অনেক মানুষ পর্যটনে যায়। কিন্তু এ রকম ঘটনা পুরো বছরে হাতেগোনা দু-একবার ঘটে। বহু সরকারি ছুটি সপ্তাহের মাঝামাঝি পড়ে কিংবা অনেকগুলো পড়ে শুক্র-শনিবারের মধ্যেই। এ ক্ষেত্রে একটা প্রস্তাব দিতে চাই আমি।

যেসব সরকারি ছুটি শুক্র-শনিবার পড়ে, সেগুলোর কারণে একদিন ছুটি বৃহস্পতিবার-রবিবার যোগ করে দেওয়া হোক। এটা শুধু সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়া সরকারি ছুটির ক্ষেত্রে হোক, সপ্তাহের অন্যদিনে ছুটি হলে সেটা সেদিনই থাকবে। এভাবে প্রতিবছর অন্তত ২-৩টি টানা তিন দিনের ছুটি পাওয়া যাবে। মানুষ একটা দম নেওয়ার সুযোগ পাবে।

সেই ছুটিতে যার যেখানে প্রয়োজন সে সেখানে যাক। এই দেশের অসংখ্য মানুষ তার চাকরির প্রয়োজনেই পরিবার থেকে দূরে থাকে। এই ছুটি অনেককে তার পরিবারের কাছে যাওয়ার এবং তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় বেশি কাটানোর সুযোগ করে দেবে। আর সবচেয়ে বড় লাভ হবে-এটা পর্যটনের সুযোগ বাড়িয়ে দেবে অনেক।

এতে শুধু সার্বিকভাবে মানুষের পর্যটনে যাওয়ার সুযোগ বাড়বে তা নয়, একটা বিশেষ সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনের স্থানে মানুষের ভিড় কমিয়ে দেবে। নির্দিষ্ট একটা ছুটিতে সবার ঘুরতে যাওয়ার হুড়োহুড়ি কমবে নিশ্চিতভাবেই। অতি সম্প্রতি কক্সবাজারে যেটা ঘটল, সেটা এভাবে আর থাকবে না বলে আমি বিশ্বাস করি।

এক সময় মানুষের ধারণা ছিল মানুষকে যত বেশি সময় ধরে যত বেশি কাজ করানো যায় ততই ভালো। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় ‘মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ বিদ্যাটি দেখতে পেরেছে মানুষ যন্ত্র নয়, তাই তাকে চাপ দিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করালে তার উৎপাদনশীলতা বরং কমে যায়। বরং দম নেওয়ার সুযোগ দিলে, মানুষকে তুলনামূলকভাবে কম খাটালে, মানুষকে তার পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে দিলে, মানুষের বিনোদন নিশ্চিত করতে পারলে মানুষ অনেক বেশি উৎপাদনশীল থাকে। সে কারণেই আমরা দেখব, সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর অনেক দেশ সাপ্তাহিক ছুটি যেমন বাড়াচ্ছে, তেমনি কমিয়ে আনছে কর্মঘণ্টাও।

কক্সবাজারের সাম্প্রতিক অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের চরম হয়রানির শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কলামটি লিখলাম। এই দেশের সরকারের এবং পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট সব স্টেইকহোল্ডারের আলোচনার ভিত্তিতে দ্রুত ন্যায্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং সেটার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই খাতটিকে টেকসইভাবে গড়ে তুলতে হবে। এবং এই ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেইকহোল্ডারের স্বার্থের কথা। হ্যাঁ, পর্যটনে যাওয়া জনগণই এই খাতের মূল স্টেইকহোল্ডার।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments