Monday, July 4, 2022
spot_img
Homeলাইফস্টাইলডেঙ্গি জ্বরের লক্ষণ, কী করবেন?

ডেঙ্গি জ্বরের লক্ষণ, কী করবেন?

বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গির দাপট দেখা যায়। এডিস এজিপটাই ও এডিস এলবোপিক্টাস প্রজাতির স্ত্রী-মশা এ রোগের প্রধান বাহক হিসাবে কাজ করে। এই রোগে সবচেয়ে বড় ঝুকি হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যরাও দ্রুত আক্রান্ত হয়।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ইমপালস হাসপাতালের নাক, কান ও গলারোগ বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন অধ্যাপক ডা. জাহির আল-আমিন। 

রোগের লক্ষণ : লক্ষণ ও রোগতত্ত্বের ভিত্তিতে ডেঙ্গিজ্বরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-

* সাধারণ ডেঙ্গিজ্বর

* রক্তপাতসহ ডেঙ্গিজ্বর।

সাধারণ ডেঙ্গিজ্বর :

* হঠাৎ তীব্র জ্বর, যা সাধারণত দুই থেকে সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

* জ্বরের সময় পুরো গায়ে কিংবা গায়ের অংশবিশেষে লাল লাল ফুসকুড়ি তৈরি হয়।

* তীব্র মাথাব্যথা।

* চোখের পেছনে ব্যথা।

* মাংসপেশি, অস্থিসন্ধি কিংবা কোমরে ব্যথা।

* বিরল ক্ষেত্রে জ্বরের পর্যায়ে রোগীর দেহের নানা জায়গায় রক্তক্ষরণ।

রক্তপাতসহ ডেঙ্গিজ্বর :

* এ ক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণ ডেঙ্গিজ্বরের মতোই। তবে জ্বর শেষে পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রোগীর দেহের চামড়ার নিচ, নাক, চোখ, মুখ, যোনিপথ, বমি, প্রস্রাব-পায়খানা বা কাশির সঙ্গে স্বল্প থেকে তীব্র রক্তক্ষরণ হতে পারে।

* রোগীর রক্তনালি থেকে প্লাজমা লিকেজের কারণে বুকে ও পেটে পানি জমতে পারে।

* অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগী শকে চলে যেতে পারে।

সাধারণত জ্বর শেষ হওয়ার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আক্রান্ত রোগীদের এসব লক্ষণ দেখা দেয় বলে ওই সময়কালকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ওই রোগে আক্রান্ত রোগীর ক্রাইসিস পিরিয়ড তথা সংকটকাল বলা হয়।

রোগ নির্ণয় : মানবদেহে ডেঙ্গিজ্বরের উপস্থিতির জটিলতা ও নিরূপণকল্পে প্রচলিত ল্যাবরেটিরি পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে সাধারণত চার ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-

ক) জ্বরের কারণ তথা ভাইরাসের উপস্থিতি নিরূপণকল্পে পরীক্ষা :

* মানবরক্তে ভাইরসের দেহস্থ NS অ্যান্টিজেন নামক দেহানুর উপস্থিতি।

* ওই ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানব রক্তে উৎপন্ন অ্যান্টিবডির উপস্থিতি।

* আক্রান্ত মানব কোষকলা কিংবা রক্তে ওই জীবাণু কিংবা এর দেহাংশ তথা অ্যন্টিজেনের উপস্থিতি।

* কিংবা PCR পরীক্ষার মাধ্যমে ওই জীবাণুর নিউক্লিক এসিডের বিন্যাস নির্ণয়। এক বা একাধিক পরীক্ষার মাধ্যমে মানবদেহে এ রোগের জীবাণুর উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

খ) রোগ নির্ণয়ে সহায়ক পরীক্ষা :

* কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট

* রক্তের হেমাটোক্রিট

* সিরাম এসজিপিটি ও এসজিওটি পরীক্ষার মাধ্যমে অনুচক্রিকা ও শ্বেতকণিকার পরিমাণ কমে যাওয়া ও হেমাটোক্রিটের মাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া দেখে মানবদেহে এই রোগের উপস্থিতিও এর গতিবিধি তথ্য জটিলতা বৃদ্ধি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

গ) এ ছাড়া এ রোগে সৃষ্ট মানবদেহে নানা জটিলতা নিরূপণকল্পে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক নিম্নলিখিত এক বা একাধিক পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে :

* রেনাল ফাংশন টেস্ট

* লিভার ফাংশন টেস্ট

* সিরাম ইলেকট্রোলাইট

* চেস্ট এক্স-রে

* ইসিজি

* আর্টারিয়ার ব্লাডগ্যাস অ্যানালাইসিস

* পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি

* ব্লাড গ্লুকোজ

* সিরাম ক্যালসিয়াম

* সিরাম ডি-ডাইমার

* সিরাম এফডিপি

এসব কিছুই এক বা একাধিক পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

ঘ) মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, টনসিলাইটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ল্যাপ্টোস্পাইরোসিস, মেনিনজাইটিস, চিকুনগুনিয়া জ্বর, টাইফাস বা সান্নিপাতিক জ্বর প্রভৃতি রোগ একই উপসর্গ নিয়ে মানবদেহে দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনে একই রূপে ভিন্ন ব্যাধির সম্ভাবনা দূরীকণকল্পে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক নানা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

* চিকিৎসা : এ রোগের চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক। কারণ এ রোগের ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাড়িতে রেখে এ রোগের নিম্নলিখিত চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে।

* এ রোগের চিকিৎসায় পান করতে হবে পানিসহ প্রচুর তরল খাবার। তরল খাবার হিসাবে খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, স্যুপ প্রভৃতি দেওয়া যেতে পারে। অন্ততপক্ষে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লিটার তরল খাবার খেতে হতে পারে। এ রোগের চিকিৎসায় তরল খাবার হিসাবে কোল্ড ড্রিংকস পরিহার করাই উত্তম।

* নিশ্চিত করতে হবে উপযুক্ত শারীরিক বিশ্রাম।

* জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।

* প্রয়োজন জ্বরের সময় দ্রুত দেহের মাপমাত্রা স্বাভাবিক আনার লক্ষ্যে রোগীর মাথায় ঠান্ডা জলপট্টি কিংবা সারা দেহ ঠান্ডা পানি দিয়ে মুছে দেওয়া যেতে পারে।

* বমির জন্য বমিনাশক ওষুধ দেয়া যেতে পারে।

* প্রয়োজনে রোগের জটিল পর্যায়ে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির করতে হবে। এ অবস্থায় প্রধানত রোগীকে শিরাপথে প্রয়োজনীয় স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

* অতিরিক্ত রক্তক্ষণের সময় প্রয়োজনে রোগীর শরীরে রক্ত দেওয়া যেতে পারে। তীব্র রক্তক্ষরণের সময় রোগীর রক্তে অনুচক্রিকার মাত্রা যখন প্রতি কিউবিক মিলি.-এ ১০ হাজারের কম কিংবা রক্তপাত হলে অনুচক্রিকার মাত্রা কমে প্রতি কিউবিক মিলিলিটারে ৫০ হাজার বা তার কম হলেও রোগীর শিরা পথে অনুচক্রিকা তথা প্ল্যাটিলেট ট্রান্সফিউশনের প্রয়োজন হতে পারে।

* রোগের জটিল পর্যায়ে রোগীর এক বা একাধিক অঙ্গ যখন অকার্যকর হয়ে পড়ে তখন এসব রোগীকে আইসিসিইউতে রেখে নিবিড় চিকিৎসা দেওয়া হয়।

কখন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় :

* বাড়িতে যথাযথ চিকিৎসা সত্ত্বেও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে

ষরোগী মুখে খাদ্য ও পানীয় খেতে না পারলে

* তীব্র পেট ব্যথা, তীব্র বমি

* হাত-পা ক্রমাগতভাবে ঠান্ডা ও নিস্তেজ হয়ে আসলে

* তীব্র অবসাদ কিংবা রোগীর আচরণের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে

* রোগীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে রক্তক্ষরণ হলে

* ঋতুবতী মহিলার মাসিকের সময় অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হলে

* ৬ ঘণ্টা ধরে আক্রান্ত রোগীর প্রস্রাব না হলে

* রোগীর হাত-পা নীল হয়ে আসলে

রোগের জটিলতা : সাধারণ কিংবা রক্তপাতসহ ডেঙ্গিজ্বর বিরল ক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক কিংবা দীর্ঘমেয়াদে আক্রান্ত ব্যক্তির এক বা একাধিক অঙ্গ নানা জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘এক্সপান্ডেড ডেঙ্গি সিনড্রোম’ নামে পরিচিত। কাদের ডেঙ্গিজ্বরের জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি-

* নবজাতক

* প্রৌঢ় ব্যক্তি

* স্থূল স্বাস্থ্যের অধিকারী

* গর্ভবতী নারী

* ঋতুবর্তী নারী

* পেপটিক আলসারে আক্রান্ত ব্যক্তি

* থ্যালাসেমিয়াসহ অন্যান্য রক্তরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি

* হৃদযন্ত্রের জন্মগত ত্রুটিতে আক্রান্ত ব্যক্তি

* ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগী, দীর্ঘমেয়াদে যকৃত ও কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি

* এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি

* দীর্ঘমেয়াদে স্টেরয়েড ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারকরী।

এ রোগের নানা জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।

মনে রাখুন

* আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।

* প্রচুর পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করুন।

* পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।

* মশারির ভেতর থাকুন, যাতে আপনার থেকে মশার মাধ্যমে অন্যজন আক্রান্ত না হন।

* ফুলের টবসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করুন। অন্তত সাপ্তাহে একবার সেটা করতে হবে।

* ডেঙ্গিজ্বরের মূল চিকিৎসা প্রচুর তরল বা পানি গ্রহণ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া।

* দিনের বেলায় ঘুমাতে হলে মশারি বা মশা নিরোধক ব্যবহার করুন।

* এমন পোশাক পরবেন না, যাতে আপনার হাত-পা আলগা থাকে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments