Thursday, July 18, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করতে হবে

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করতে হবে

তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্বায়ণের যুগে ডিজিটাল নিরাপত্তা একটি অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমের নিরাপত্তা ও অপরাধমূলক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করতে দেশে দেশে এ সম্পর্কিত নতুন আইন গৃহীত হচ্ছে। এমন একটি বাস্তবসম্মত বিষয়কে গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এমন নিবর্তনমূলক পন্থা মুক্ত বিশ্বে বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশের সরকার গ্রহণ করেছে বলে আমাদের জানা নেই। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া প্রণয়ণের শুরুতেই এর কিছু বিতর্কিত ধারার অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহার নিয়ে দেশের সাংবাদিক সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, সম্পাদক পরিষদ ও নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছে। সে সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিতর্কিত ধারাসমুহের সংশোধন এবং অপপ্রয়োগ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। দেশের সাংবাদিক সমাজের ধারাবাহিক ও অব্যাহত আন্দোলন সত্ত্বেও এই আইনে বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকসহ বহু গণমাধ্যম কর্মীকে গ্রেফতার-হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে যখন দেশে- বিদেশে আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তখন এই ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গত মঙ্গলবার বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা সকল প্রকার মানবাধিকারের চালিকা শক্তি’ শিরোনামে আয়োজিত আলোচনা সভায় সম্পাদক পরিষদ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের নানা উদাহরণ ও তথ্য-উপাত্তের পর্যালোচনা করে আবারো এই আইন সংশোধনের দাবি তুলে ধরেন। সভায় উত্থাপিত সম্পাদক পরিষদের ৫ দফা দাবি হচ্ছে, স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে যে সব আইন প্রক্রিয়াধীন আছে, সে সব এখনই স্থগিত করতে হবে। আইনগুলোর খসড়া নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার আগে সাংবাদিক, গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ অংশীজনদের সাথে আলোচনা করতে হবে। বিদ্যমান আইনের মধ্যে গণমাধ্যম ও মুক্ত সাংবাদিকতার প্রতিবন্ধক যে সব ধারা আছে সেগুলো বাতিল করে আইনের সংশোধন করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল অথবা এমনভাবে সংশোধন করতে হবে যে এটা কেবল সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।তার আগ পর্যন্ত আইনটির প্রয়োগ স্থগিত রাখতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং মুক্ত সাংবাদিকতার প্রতিবন্ধক ও ভয়ের পরিবেশ দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সম্পাদক পরিষদের আলোচনা সভায় অতিথি হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কীত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনুও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করে গণমাধ্যমবান্ধব করার দাবি জানিয়েছেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গৃহিত হওয়ার পর থেকে গত চার বছরে এই আইনে সহ¯্রাধিক মামলার বেশীরভাগ গ্রেফতার ও হয়রানি-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাংবাদিকরা। বিরোধী মতের প্রায় সব পেশার মানুষসহ শিশুরাও এই আইনে মামলার সম্মুখীন হয়েছে বলে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়। এসব মামলার অধিকাংশই মিথ্যা মামলা হওয়ায় প্রথম শুনানিতেই আদালতে খারিজ হয়ে গেলেও ভুক্তভোগীরা ক্ষতিপুরণ পায়নি, মামলার কোনো বাদীকেও জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হয়নি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ সাংবিধানিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষত ২০১৮ সালের আইনের ২৫ ও ৩১ নম্বর ধারাগুলো অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকারের প্রতি হাইকোর্টের একটি রুল জারি হয়েছিল। দেশের গণতন্ত্র আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থনীতি আজ বড় ধরণের সংকটে নিপতিত। রাঘব-বোয়াল দুর্নীতিবাজরা নানাভাবে দেশ থেকে অর্থ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করে দেশকে অর্থনৈতিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে। এসব দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। বিদ্যমান অবস্থায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এর অপব্যবহার রোধ করা অসম্ভব। দেশের সাংবাদিক সমাজ, সম্পাদক পরিষদ, মানবাধিকার সংস্থা এবং পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগীরাও এই আইনের তীব্র সমালোচনা, এর অপপ্রয়োগ রোধ ও বাতিল দাবি করেছে। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, মানবাধিকার বিষয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের উদ্বেগ এবং সাংবিধানিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ ধারাগুলো বাতিলের কোনো বিকল্প নেই।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments