Thursday, October 6, 2022
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামজ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়

কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সরকার ৫ আগস্ট মধ্যরাত থেকে দেশে জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বৃদ্ধি করেছে। দাম বেড়েছে প্রতি লিটার ডিজেলে ৩৪, কেরোসিনে ৩৪, অকটেনে ৪৬, পেট্রোলে ৪৪ টাকা। দাম বাড়ার পর একজন ক্রেতাকে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৪ টাকায়, কেরোসিন ১১৪ টাকায়, অকটেন ১৩৫ টাকায় ও পেট্রোল ১৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

বর্ধিত দাম ওইদিনই দাম কার্যকর হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বৈশ্বিক বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার কারণে বাংলাদেশ প্রেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি), ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) পরিশোধিত এবং আমদানি করা ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এর আগে গত বছরের ৪ নভেম্বর থেকে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৬৫ থেকে ৮০ টাকা করেছিলো সরকার। তবে সে সময় অকটেন ও পেট্রোলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিলো। তেলের দাম পুনরায় বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের উপরে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে। আকস্মিকভাবে দেশে বহুল ব্যবহৃত জ্বালানি তেল ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলে ও দরিদ্র মানুষের জ্বালানি হিসেবে পরিচিত কেরোসিনের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে ভোগ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আরো একদফা বৃদ্ধি পাবে। ফলে জনদুর্ভোগ বেড়ে যাবে। আমাদের জানা যে, দেশের অধিকাংশ গণপরিবহন বিশেষ করে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও নৌযান ডিজেল চালিত। সুতরাং ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পুনরায় সকল প্রকার গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।

দেশের প্রান্তিক জনপদের গরিব মানুষ ও চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষেরাই বলতে গেলে কেরোসিন তেল ব্যবহার করে থাকে। কেরোসিনের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি খেটে খাওয়া গরিব মানুষের জীবনমানের ব্যয় বৃদ্ধি করবে। তাদের চলমান অভাব ও দুঃখ কষ্টকে বাড়িয়ে দেবে। কেরোসিন ধনিক শ্রেণির মানুষেরা মোটেই ব্যবহার করে না বা তাদের ব্যবহার করার প্রয়োজনও পড়ে না। তাই কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি মোটেই বোধগম্য নয়। কেরোসিনের দাম বৃদ্ধি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। যে কোনো সংকটকালে কৃষিখাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মহামারি করোনাকালে কৃষিখাত অনেকটা ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল বলেই হয়তো আমাদের অর্থনীতি এখনও অনেকটা সচল। কৃষিজপণ্য উৎপাদনে বিপুল পরিমাণের ডিজেল ব্যবহার হয়ে থাকে। তাই ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি কৃষিজপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সেচের জন্য ব্যবহৃত অধিকাংশ যন্ত্র ডিজেল চালিত। কয়েক মাস পরেই বোরো মৌসুম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বোরো চাষের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে চালের দাম বেড়ে যাবার পরিস্থিতি তৈরি হবে। এমনিতেই বর্তমানে চাল-ডালসহ নিত্যব্যবহৃত প্রতিটি দ্রব্যের দাম নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ।

আমরা জানি, করোনাকালে বহু মানুষ চাকরি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অনেকেই পেশা বদল করেছে। কেউ আবার চাকরি হারিয়ে পেশা বদলিয়ে কৃষিকে তাদের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এখন ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বিকাশমান কৃষিখাতকে বড় ধরনের একটি সংকটের মধ্যে ফেলে দেবে। আমাদের দেশের উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের ওপরে অনেকটা নির্ভরশীল। গ্যাসের অপ্রতুলতা বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের উপর নির্ভরশীলতাকে অনেকাংশেই বৃদ্ধি করেছে। সুতরাং জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। করোনা দেশ থেকে এখনও বিদায় নেয়নি। কবে দেশ করোনামুক্ত হবে, তা কেউ জানে না। ডেঙ্গু নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে। কর্মহারা মানুষগুলো বিকল্প কর্মের সন্ধানে দিশেহারা। করোনার ফলে দেশে উল্লেখ করার মতো কোনো বিনিয়োগ হয়নি। বহু প্রবাসী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। তাদের সবাইকে পুনরায় কর্মস্থলে ফেরানো সম্ভব হয়নি। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন সঙ্কটের সময় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। এমনিতে গত দু’ বছরে মানুষের আয় না বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি দ্রব্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে নিম্ন আয়ের মানুষদের জীবনযাপনের ব্যয় মিটাতে হিমশিম খেতে হবে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের কৃষি অর্থনীতি ও রফতানিমুখী শিল্প কারখানার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকার বা সংশ্লিষ্টরা এই নেতিবাচক দিক বিবেচনা করে দেখেছেন কিনা, তা আমার জানা নেই। তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিত করেই জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের দেশের অর্থনীতি এখনো অনেকটা কৃষিনির্ভর। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি কোনো সুখকর বিষয় নয়, হতে পারে না। এদিকে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধির ফলে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যয়ও অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। মোটা দাগে বলতে গেলে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে।

এই মুহূর্তে দেশে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ (৭.৫৬ শতাংশ)। রফতানি আয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে স্বস্তিদায়ক সংবাদ থাকলেও রপ্তানি পণ্যের ক্রয়াদেশ কমে গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কার্যকরে বিলম্ব করতে বলেছে। দেশে বাণিজ্য ঘাটতি ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কর জিডিপি রেশিও দীর্ঘদিন ধরে ১০ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আমদানি ব্যয় মিটাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা তুল্য। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের অভাব, আর্থিক সেক্টরের অনিয়ম-দুর্নীতি, টাকা পাচার, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিকে অনেকটা সমালোচনার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বহিঃবিশ্বে দেশের ইমেজকে ক্ষুণ্ন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, ইতোমধ্যেই নতুন করে দশটি প্রাইভেট ব্যাংককে তাদের সার্বিক অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনায় দুর্বল ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শেয়ারবাজারের টালমাটাল অবস্থায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পুনরায় পুঁজি হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে।

রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য নতুন নতুন বাজার তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। করোনাকালে অধিক সংখ্যক মানুষ চাকুরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের সবাইকে নতুন করে বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা খুবই জরুরি। তবে এক্ষেত্রে দালাল বা সিন্ডিকেট চক্র যেন মানুষের পকেট কাটতে না পারে সে বিষয়ে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে।

যে কথা বলছিলাম, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিটি দ্রব্যমূল্যের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। পণ্যপরিবহন ও গণপরিবহন ব্যবহার করতে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হবে। যে হারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে সে হারে মানুষের আয় কিন্তু বৃদ্ধি পায়নি। মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ আয়ের সাথে বাজার দরের সমন্বয় করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানায় বিশেষ করে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে যখন ডিজেল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না, লোডশেডিংয়ের কারণে যেখানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তখন নতুন করে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সার্বিক বিচারে দেশের অর্থনীতির উপরে আরেকটি বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করবে। দেশে কর জিডিপির হার বৃদ্ধি করা না গেলে উন্নয়নসহ সরকারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। কৃষি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি করে জনদুর্ভোগ কমাতে হবে। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতা ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।


লেখক: প্রফেসর, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments