Friday, May 24, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামজেমস ওয়েব টেলিস্কোপের ছবি : মহাসত্যের সন্ধানে মহাবিশ্বে বিজ্ঞানের অভিযান

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের ছবি : মহাসত্যের সন্ধানে মহাবিশ্বে বিজ্ঞানের অভিযান

মোবায়েদুর রহমান

জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) এবং জ্যোতির্পদার্থ বিদ্যা (Astrophysics) এই দুটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বিদগ্ধজনদের মধ্যেও তেমন কোনো ইন্টারেস্ট দেখা যায় না। আমি নিজে অর্থনীতির ছাত্র। তাই এই দুটি বিষয়ে আমার কোনো জ্ঞান নাই। কিন্তু এটুকু বুঝি যে, এই বিষয়গুলি বিশাল, ব্যাপক এবং গভীর। শুধু বিশাল ও ব্যাপকই বা বলি কেন, এই বিষয়গুলির গভীরে নিহিত রয়েছে সৃষ্টি ও স্রষ্টার রহস্য। বিষয়টি এত জটিল এবং গভীর যে, সেই রহস্য উদ্ঘাটন করা শুধু দুঃসাধ্যই নয়, বলতে গেলে প্রায় অসম্ভব। ছোটকালে আমরা যখন স্কুলে পড়েছি তখন শুধুমাত্র পৃথিবীর কথাই শুনতাম। আরো যে কয়েকটি গ্রহ আছে সেটি আমরা ক্লাস নাইন বা টেনের ভূগোলে পড়ি। চন্দ্রকে তো আমরা জন্ম থেকেই দেখে আসছি। এটি সুন্দরের প্রতীক। অবশ্য তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার লাইন অনুযায়ী, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ তারপরে আমরা জানলাম আরো কয়েকটি গ্রহের কথা। এগুলো হলো, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, মঙ্গল, জুপিটার, ইউরেনাস, নেপচুন এবং প্লুটো। আমাদের সময় আমরা শুধু গ্রহগুলোর কথাই পড়েছি। পরবর্তীতে জানলাম যে, প্রতিটি গ্রহে একাধিক চন্দ্র রয়েছে। এখানে একটি কথা বলা দরকার যে, আমাদের কাছে সৌন্দর্যের প্রতীক চাঁদ আসলে পৃথিবীর একটি উপগ্রহ। চাঁদের যে মনোরম আলো আমাদের অন্তরকে কাব্যময় করে তোলে সেটি কিন্তু চাঁদের নিজস্ব আলো নয়। আসলে চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নাই। সূর্যের আলোতে পৃথিবী যেমন আলোকিত হয়, চাঁদও তেমনি আলোকিত হয়। জুপিটারের রয়েছে ৭৯টি চন্দ্র বা উপগ্রহ। শনির ৮২টি, ইউরেনাসের ২৭টি, নেপচুনের ১৪টি এবং প্লুটোর ৫টি। যারা সৃষ্টি এবং স্রষ্টা নিয়ে কথা বলে এবং শুধু কথাই নয়, তীর্যক কথা বলে, তাদের উদ্দেশ্যে আমার প্রথম প্রশ্ন, কতদিন আগে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে? সে সম্পর্কে সঠিক হিসাব দেওয়া মুশকিল। তবে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বলেন যে, পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে ৪৫০ কোটি বছর আগে। প্রিয় পাঠক, মানুষ ঠিক কবে পৃথিবীতে এসেছে সে সম্পর্কেও সঠিক কোনো হিসাব নাই। এগুলো নিয়ে নানান মহলের নানান হিসাব রয়েছে। সেই হিসাবে বলা যায় যে, অন্তত ২০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে মানুষ এসেছে। যাই হোক, আমরা যদি ২০ লক্ষ বছরকেই হিসাবের মধ্যে নেই তাহলে এত বিশাল সময়ের ব্যবধানে মানুষ শুধুমাত্র চন্দ্রে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাও সেখানে থাকতে পারেনি। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণেই হোক, বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, সেখানে মানুষ স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়িয়েছে। ২০ লক্ষ বছরে শুধুমাত্র চাঁদে লম্ফমান অবস্থায় অবতরণ সম্ভব হয়েছে। বাকি যেগুলো গ্রহ নক্ষত্র রয়েছে সেগুলোতে কবে যাওয়া সম্ভব হবে? আমি বলি, আদতেই যাওয়া সম্ভব হবে কিনা সেটি নিয়ে বিপুল শঙ্কা রয়েছে।

যাই হোক, একটি ভালো দিক হলো এই যে, মহাকাশ বা মহাবিশ্বকে জানার মানুষের যে আগ্রহ সেটি কিন্তু সীমাহীন। তাই আমরা দেখি, এই অজানাকে জানার অভিযানে আবিষ্কৃত হয়েছে হাবল টেলিস্কোপ (Hubble Telescope) এবং সবশেষে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ (James Web Telescope)। এই বিষয়গুলো কিছুটা জটিল। তারপরেও আমি ধাপে ধাপে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে আসবো। তার আগে এই মহাবিশ্ব সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা নেওয়া যাক। আমরা যখন স্কুল-কলেজে পড়তাম তারপর বিশ্ব কয়েক দশক এগিয়ে গেছে। এরমধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমে আমরা কতগুলি মৌলিক তথ্য জেনেছি।

॥দুই॥
এসব মৌলিক তথ্যের মধ্যে যেসব না জনলেই নয় সেগুলির মধ্যে নিম্ন লিখিত তথ্যসমূহ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, সূর্য একটি প্রকান্ড নক্ষত্র। এখানে রয়েছে কয়েক হাজার নক্ষত্র। বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয়েছে, নক্ষত্রগুচ্ছ (Cluster of stars)। এই নক্ষত্রগুচ্ছকে বলা হয় গ্যালাক্সি। আমরা সূর্যকেন্দ্রিক যে গ্যালাক্সির অধীনে রয়েছি তার নাম ছায়াপথ (গরষশু ধিু)। মহাবিশ্বে এরকম অসংখ্য গ্যালাক্সি রয়েছে। এপর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যালাক্সির সংখ্যা দেড় হাজার কোটি থেকে দুই হাজার কোটি। যতই দিন যাচ্ছে ততই এই সংখ্যা বাড়ছে।

আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার বা ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ৯ কোটি ২৯ লাখ মাইল। সূর্য থেকে আলো পৃথিবীতে পৌঁছতে লাগে ৮ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড বা ৯ মিনিট। কথাটাকে সহজবোধ্য করে বলতে গেলে কথাটি এই দাঁড়ায় যে যখন সূর্য ওঠে ঠিক সেই মুহূর্তেই পৃথিবী থেকে আমরা সূর্যকে দেখতে পাই না। দেখতে পাই প্রায় ৯ মিনিট পর। অর্থাৎ সূর্যের আলো যখন আমাদের চোখে লাগে তখনই আমরা সূর্যকে দেখতে পাই। তাই সূর্য যখন উদিত হয় তার ৯ মিনিট পর আমরা সেই সূর্যকে দেখতে পাই। এই পয়েন্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশ বিজ্ঞানের পরবর্তী আলোচনায় এই পয়েন্টটি বার বার আসবে

পৃথিবী থেকে চন্দ্রের দূরত্ব ২ লক্ষ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল। আমার যতদূর মনে পড়ে, এসব আমরা পাঠ্য পুস্তকে পড়েছি। এরপরেই মহাকাশ বিজ্ঞানে সাধিত হয় এক যুগান্তকারী অগ্রগতি। সেটি হলো, হাবল এর টেলিস্কোপ আবিষ্কার। এই টেলিস্কোপটি আবিষ্কৃত হয় ১৯২৪ সালে। ক্যালিফোর্নিয়ার উইলসন পর্বতে এই টেলিস্কোপটি স্থাপিত হয়েছিল। বলতে ভুলে গেছি যে, টেলিস্কোপের বাংলা হলো দূরবিক্ষণ যন্ত্র। অর্থাৎ অনুবিক্ষণ যন্ত্রের উল্টোটা। এই হাবল টেলিস্কোপটি মহাকাশের চন্দ্র তারকা গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে, আজ কোনো তারকাকে আকাশের যে স্থানে দেখা যায় সেটি কিছুদিন পর সেই স্থানে আর থাকে না। পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ ইত্যাদি অভিমুখে এসব তারকা সরে যায়। এখান থেকেই বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন সেই মহা যুগান্তকারী আবিষ্কার, যার নাম দেওয়া হয়েছে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্ব (Theory of expanding Universe)। এই থিওরির সংক্ষিপ্ত সার হলো এই যে, প্রতি নিয়ত মহাবিশ্ব বিভিন্ন দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
চরম সত্য হলো এই যে, মহাবিশ্বের এই লীলাখেলার সামান্যই মানুষ পুরোপুরি জানতে পেরেছে। একটু আগেই বলেছি, মানব জাতির বাস্তব জ্ঞান চন্দ্র অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মহাবিশ্বের বিশাল লীলাখেলা নিয়ে তারা এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই জানতে পারেনি। জাতীয় কবি নজরুল লিখেছেন সেই অমর গান, ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।’ আরেকজন কবি বলেছেন, ‘মহাসমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আমরা যখন সমুদ্র দেখি তখন তার পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণের বিশালত্ব ও বিরাটত্ব সম্পর্কে কিছুই জানতে পারি না। তেমনি জ্ঞানের মহাসমুদ্রের তীরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। কত কিছু জানার আছে, তার আমরা কিছুই জানি না।’ এই যখন মানুষের জ্ঞান এবং সেই জ্ঞান এত ক্ষুদ্র, তখন সৃষ্টি এবং স্রষ্টা নিয়ে তীর্যক কথা বলা বিশাল মূর্খতার পরিচায়ক। আসলে মানুষ ততটুকুই জানতে পারবে, যতটুকু তাকে জানতে দেওয়া হয়েছে।

॥তিন॥
আসলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাবে, মানুষ ততই মহাশূন্যের নিকট থেকে নিকটতর হতে থাকবে। আপনারা এই জুলাই মাসে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সর্বশেষ আবিষ্কার সম্পর্কে গণমাধ্যমে জানতে পেরেছেন। আমি টেনিক্যাল বিষয়গুলোতে না যেয়ে খুব সাধারণভাবে কথা বলবো, যাতে ইনকিলাবের প্রতিটি পাঠক সেটি বুঝতে পারেন। তারপরেও সামান্য টেকনিক্যাল পয়েন্ট এসে যাবে যেটা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। আমরা আগেই বলেছি যে, আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। তাহলে এক দিনে আলোর গতি হবে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার গুনন ৬০ গুনন ৬০ গুনন ২৪। এক বছরে আলো ছুটে যাবে আগের অঙ্ক গুনন ৩০ গুনন ১২। এভাবে যে ফলাফল পাওয়া যাবে সেটিকে বলা হয়, এক আলোকবর্ষ (One light year)। আসলে এক আলোকবর্ষ যে কত বিশাল অঙ্ক সেটি আমাদের মাথায় এত সহজে ঢুকবে না।
জেমস টেলিস্কোপ ১৯২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে তার অভিযান শুরু করে। এরমধ্যে মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্রাংশের অনেকগুলি ছবি পাঠিয়েছে। সপ্তাহখানিক আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এর কয়েকটি ছবি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন। পরবর্তীতে মার্কিন মহাশূন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা এসব ছবির একটি এ্যালবাম প্রকাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে কয়টি ছবির উদ্বোধন করেছেন সেই ছবিগুলি মহাবিশ্বের যে অংশের ছবি সেটি ৪৬০ কোটি আলোকবর্ষ পূর্বের ছবি। ১ আলোকবর্ষ সম্পর্কে একটু আগেই আপনাদেরকে ধারণা দিয়েছি। সেখানে ৪৬০ কোটি আলোকবর্ষ কত বিশাল হতে পারে সেটি আমাদের কল্পনাতেও আসে না। এখানে আবার উল্লেখ করতে চাই যে, পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে ৪৫০ কোটি বছর আগে। জেমস টেলিস্কোপের ক্যামেরায় যে ছবিটি এসেছে সেটি মহাবিশ্বের ঐ অংশ থেকে আলো এসে টেলিস্কোপের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, যে আলো আসতে ৪৬০ কোটি আলোকবর্ষ লেগেছে। ঐ স্থানের বর্তমান ছবি পেতে গেলে মানব জাাতিকে আরো ৪৬০ কোটি আলোকবর্ষ অপেক্ষা করতে হবে।

লেখাটি আর বেশি বড় করতে চাচ্ছি না। নাসার যে বিজ্ঞানীদের টিম এই অসাধ্য সাধন করেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশে জন্ম নেয়া একজন মহিলা বিজ্ঞানী। তিনি বলেছেন যে, মহাবিশ্বের যে অংশটির ছবি আমরা রিলিজ করেছি সেটি এই বিশ্বে একটি ধূলিকণার সমান।

প্রিয় পাঠক, একটি চাঞ্চল্যকর সংবাদ দিয়ে আজকের লেখাটি শেষ করছি। বছরখানিক আগে একটি ইংরেজি দৈনিকে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল। খবরটি হলো, বর্তমান মহাবিশ্বের আগেও আরেকটি মহাবিশ্ব ছিল। ঐ মহাবিশ্ব ধ্বংস হওয়ার পর বর্তমান মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। আমি ইন্টারনেট ভিজিট করলাম। সেখানে বলা হয়েছে যে, এমনও হতে পারে যে বিগব্যাং বা মহাবিষ্ফোরণের মাধ্যমে প্রথম মহাবিশ্বটি ধ্বংস হয় এবং দ্বিতীয় মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়। ধারণা করা হয় যে, বিগব্যাং বা মহাবিষ্ফোরণ ঘটেছিল ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে।

মানুষের কি সাধ্য আছে, ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বের ইতিহাস এবং ইতিহাসের গর্ভে নিহিত সত্য অথবা মহাসত্য উদ্ঘাটন করে? সাধ্য নাই। মানুষ তো প্রস্তর যুগের আগে কী ছিল সেটি উদ্ঘাটন করতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। আর ১৩৮০ কোটি বছর আগে যাওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদেরকে নির্ভর করতে হবে সেই মহাগ্রন্থের ওপর যেখানে এমন সব কাহিনী রয়েছে যা মানব লিখিত ইতিহাসে নাই। একটু আগেই বলেছি, মানুষ ঠিক ততখানিই জানবে, যতটুকু তাকে জানতে দেওয়া হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments