Tuesday, July 16, 2024
spot_img

জাতিকের তাঁরা

সম্প্রতি ফোর্বসের এশিয়ার ‘৩০ অনূর্ধ ৩০’-এর তালিকায় বাংলাদেশ থেকে স্থান করে নিয়েছেন ‘জাতিক’-এর দুই সহপ্রতিষ্ঠাতা মুমতাহিনা আনিকা ও সুলতান মনি। ফিন্যান্স অ্যান্ড ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ক্যাটাগরিতে ফোর্বসের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তাঁরা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাদিয়া আফরিন হীরা

প্রায় দুই বছর আগে নিজের ভিশনবোর্ডে লিখে রেখেছিলেন একদিন ফোর্বস ম্যাগাজিনে নাম আসবে। দুই বছর পেরোনোর আগেই তা বাস্তবে রূপ নেয় মুমতাহিনা আনিকার জীবনে।

আনিকার জন্ম খুলনায়। তবে শৈশবের অনেকখানি সময় ছোট খালার সঙ্গে কাটানোর সুবাদে বেশ কিছু জেলায়ও থাকা হয়েছে। আট বছর বয়সে পরিবারসহ ঢাকায় হলেন স্থায়ী। পড়াশোনা শুরু করলেন স্কলার স্কুলে।
এখান থেকেই ও লেভেল এবং এ লেভেল সম্পন্ন করেন। আর স্কুলে থাকা অবস্থাতেই উদ্যোক্তা বনে যান আনিকা। বাবার বন্ধু চীন থেকে কিছু গয়না নিয়ে আসেন। নিজের জমানো তিন হাজার টাকা দিয়ে সেই গয়না কিনে ফেলেন।
আর ওসব বিক্রি করে এক সপ্তাহে ৯ হাজার টাকা আয়ও করে ফেলেন। এটিই তাঁকে আরো বড় স্বপ্ন দেখতে আশাবাদী করে তোলে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন ইউল্যাবে। পড়াশোনা করেন ফিন্যান্স বিষয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন আনিকা আরেকটি ভেঞ্চার শুরু করেন।
নাম ‘শেয়ারআউট’। সেখানে বিভিন্ন দাতব্য কাজের জন্য ক্যাম্পেইন ও ফান্ড ওঠানোর কাজ করতেন। এমনই একটি দাতব্য কাজের জন্য ফেসবুকে গ্রুপ খোলেন আনিকা। তাঁরই এক পরিচিত বন্ধু সেই গ্রুপে যোগ করে সুলতান মনিকে। তখন সুলতান থাকতেন কানাডায়। সেখানে থেকেই আনিকার কাজে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানান। এভাবেই সুলতান ও আনিকার পরিচয় হয়। আনিকা ২০২১ সালে স্নাতক শেষ করে পরে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে ডাটা সায়েন্সে ডিপ্লোমা করেন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে আসেন সুলতান। ওই সময় আনিকার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আনিকাও হয়ে গেলেন রাজি। তখন তাঁরা দেখলেন তাঁদের টিমওয়ার্ক খুবই দুর্দান্ত। এরপরই শুরু করেন একসঙ্গে পথচলা। 

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুলতান মনি। সুলতান মনির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন আবুধাবির ম্যারিল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। পরে পাড়ি জমান কানাডায়। সেখানেই উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিষয়ে ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আনিকার সঙ্গে সুলতানের গল্পটাও অনেকটাই মিলে যায়। ছোট থেকেই দুজনের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার হাতেখড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থাতেই ব্যবসার জন্য কিছু টাকা দেন তাঁর বাবা। ব্যবসা করতে গেলে বুঝতে পারলেন, ব্যবসায়ের জন্য প্রযুক্তিজ্ঞান কতটা জরুরি। আর এ জন্যই  বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ছেড়ে পুনরায় ভর্তি হয়ে যান একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগে। এতেই করেন স্নাতক। সুলতান বলেন, “মূলত বাবার অনুপ্রেরণাতেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখি। তিনি কখনো চাননি চাকরি করি। এমনকি চাকরির কথা বললেও রাগ করতেন। ছোট থেকেই চাইতেন আমি যেন উদ্যোক্তা হই।” সুলতান ও আনিকার স্বপ্নের ফসলই ‘জাতিক’। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিনটেক তথা ফিন্যানশিয়াল টেকনোলজি (আর্থিক প্রযুক্তি) স্টার্টআপটি গত বছরের আগস্টে ১৬ লাখ ডলারের তহবিলও সংগ্রহ করেছে।

জাতিকের হয়ে ওঠার গল্প

জাতিক এমন একটি স্টার্টআপ, যা অন্যান্য ই-কমার্সকে ওয়েবসাইট তৈরি করে দেয়। এটি শুধু সফটওয়্যারই নয়, হার্ডওয়্যারের সেবাও দিচ্ছে। ‘জাতিক’-এর নামটা কিভাবে এলো, সেই প্রশ্নে সুলতান একগাল হেসে বললেন, “জাতিক আসলে বাবা এবং মায়ের নামের অংশ। আমার মায়ের নাম খুদেজা ও বাবার নাম আতিক। তাঁদের দুজনের নামের অনুপ্রেরণাতেই আমাদের স্টার্টআপের নাম রাখা ‘জাতিক’।” জাতিক তৈরির পেছনের গল্পও জানতে চাইলে সুলতান বললেন, “জাতিক আমাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও মার্কেট গবেষণার ফল। যখন দেখলাম বাংলাদেশে বেশির ভাগ ব্যবসার কার্যক্রম সামলানোতে টেকনোলজির ছোঁয়া এখনো কম, তখন এ সমস্যাটিই সমাধান করতে চাইলাম।” এর মধ্যে আনিকা যোগ করলেন, “প্রথম পর্যায়ে শুধু অর্ডার ও ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট দিয়ে শুরু করি। নাম ছিল ‘পেপকেট’। পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের আগ্রহ দেখে আমাদের ফিচার বাড়াই। আমাদের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে গ্রাহক কী চাচ্ছে, সেই অনুযায়ী জাতিককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। পাঁচ মাসেরও কম সময়ে আমাদের ব্যবহারকারী সংখ্যা ৩৫ হাজারের বেশি হয়ে যায়। সুলতান ও আমার দুজনেরই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে তথ্য সংগ্রহ করা, মার্কেট বোঝা আমাদের জন্য আরো সহজ হয়ে উঠেছিল।”

জাতিক কী কী সেবা দিয়ে থাকে, তা জানতে চাইলে আনিকা বলেন, “জাতিক আসলে একটি ইকোসিস্টেম। আমাদের অ্যাপ ‘জাতিকইজি’তে যে কেউ তাঁদের ব্যবসার জন্য ওয়েবসাইট বানাতে পারবেন। তা-ও মাত্র ১০ সেকেন্ডেই। যতটা সহজভাবে সম্ভব জাতিককে তৈরি করার চেষ্টা করেছি। ওয়েবসাইট ছাড়াও আমাদের আরো কিছু ফিচার আছে। এগুলোর মধ্যে আছে ইভেন্টরি, কাস্টমার ম্যানেজমেন্ট, শপ-ইন ও ট্র্যাকিং, কাস্টম ডোমেইন সেটআপসহ আরো বেশ কিছু ফিচার। জাতিকে এসব সেবা নেওয়া ছাড়াও আপনি পণ্যও বিক্রি করতে পারবেন।”

৩০ আন্ডার ৩০

বিশ্বের জনপ্রিয় সাময়িকী ফোর্বস। প্রতিবছর ‘৩০ জন’ সম্ভাবনাময় তরুণের নাম প্রকাশ করে থাকে। ফোর্বসই এই সম্ভাবনাময়  স্টার্টআপটি দেখে লিংকডিনে আনিকাকে বার্তা পাঠায়। ফোর্বস ‘জাতিক’ ও প্রতিষ্ঠাতাদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে নেয় এবং তাঁদের দুজনকে মনোনীত করে। এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জনের অনুভূতি কেমন—জানতে চাইলে সুলতান ও আনিকা দুজনেই বললেন, “এমন একটি সম্মাননা পেয়ে অবশ্যই ভালো লেগেছে। এমনটি হবে আগে ভাবিনি। ব্যাপারটি খুবই অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটেছিল। এই সম্মাননা আমাদের কাজ করার আগ্রহকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।”

ভবিষ্যৎ

বাংলাটা এখনো ঠিকঠাক  আয়ত্ত করতে না পারলেও জাতিক দ্বারা দেশে সেবা দিতে বাংলাদেশেই থাকছেন সুলতান। আলোচনার শেষ পর্যায়ে তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে সুলতান বলেন, “জাতিকের মাধ্যমে সামনে ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য টেকনোলজির ব্যবহার আরো সহজ করাই আমাদের ইচ্ছা। আর যদি কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে থাকেন যে আপনি কি স্টার্টআপ শুরু করবেন কি না, আমি বলব এখনই সঠিক সময়।” সুলতানের সঙ্গে যোগ করে আনিকা বলেন,  “জাতিককে ইউনিকর্ন কম্পানি বানাতে চাই। সবাইকে একটা কথাই বলতে চাই, কখনোই হার না মানতে। সাময়িক বাধা এলেও যদি প্রতিদিন চেষ্টা চালিয়ে যান, আপনি অবশ্যই সফল হবেন।”

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments