ভারতের ওড়িশায় ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়ে দুর্বল হয়েছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’। ভারি বর্ষণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায়ও। বাংলাদেশে এর আঘাত হানার আর আশঙ্কা নেই। তবে ইয়াস ও পূর্ণিমার প্রভাবে অতি জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় ৯টি জেলার ২৭টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপকূলীয় বেশির ভাগ জেলায়ই গতকাল বুধবার ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। জোয়ারের তোড়ে ভেঙে গেছে অনেক বাঁধ। তলিয়ে গেছে শত শত গ্রাম। পানি উঠেছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বাজার, দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ভেসে গেছে কৃষিজমি, পুকুর ও মাছের ঘের। সংকট দেখা দিয়েছে মিঠা পানির। এর মধ্যে বরিশালের বাকেরগঞ্জ, বরগুনার বেতাগী, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, ঝালকাঠির রাজাপুর, ভোলার লালমোহন ও চট্টগ্রামের রাউজানে সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে; যাদের কেউ জোয়ারের পানিতে ডুবে, কেউ বা গাছচাপায় মারা গেছে। বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জোয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাত কাটায় উপকূলের মানুষ।

ইয়াসের অবস্থান সম্পর্কে আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক গতকাল রাতে বলেন, ‘বুধবার (গতকাল) বিকেল নাগাদ ঘূর্ণিঝড়টি অতি প্রবল থেকে প্রবল হয়েছে। এরপর বৃষ্টি ঝরাতে ঝরাতে তা নিম্নচাপে পরিণত হবে। এরপর আস্তে আস্তে তা শেষ হয়ে যাবে। বৃহস্পতিবারও (আজ) আমাদের দেশে ইয়াসের প্রভাবে বৃষ্টিপাত হবে। তবে শুক্রবার থেকে আবহাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবমুক্ত হবে আশা করা যায়।’

অন্যদিকে ভারতের আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রভাগ বা চোখ বালাশোরের কাছ দিয়ে পুরোপুরি স্থলভাগে উঠে আসে এবং ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তখন এর কেন্দ্রে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৩০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১৫৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছিল। স্থলভাগে আছড়ে পড়ার পর ক্রমে দুর্বল হতে শুরু করে ইয়াস। শক্তি ক্ষয় করতে করতে রাতেই (গতকাল) ঘূর্ণিঝড়টি ফের অতি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হবে, অর্থাৎ ইয়াসের মৃত্যু হবে।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, ঘূর্ণিঝড়ের পুরোপুরি প্রভাব দেশে না থাকলেও অতি জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার ২৭টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, শরণখোলা, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, মঠবাড়িয়া, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, পটুয়াখালী সদর, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ, কলাপাড়া, চরফ্যাশন, মনপুরা, তজুমদ্দিন, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, ভোলা সদর, হাতিয়া, রামগতি ও কমলনগর।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী ও অর্থ বরাদ্দ দেওয়া আছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা দিতে ১৬ হাজার ৫০০ শুকনা ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জোয়ারের সময় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ আশ্রয় নিলেও ভাটার সময় নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. মোহসীন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রস্তুত করা হয়েছে। আরেকটি সভা করে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন করা হবে। মাঠের কাজ শেষ হলে অল্প সময়ের মধ্যে আমরা সেটা করব।’

জোয়ারের চাপে বাগেরহাটের মোংলায় একটি বেড়িবাঁধের তিনটি স্থানে ভেঙে গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে জেলার নদীর তীরবর্তী শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ এবং মোংলা উপজেলার পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাছের ঘের ও পুকুর ডুবে মাছ ভেসে গেছে। অনেক এলাকায় পুকুর ডুবে মিষ্টি পানির উৎস হারিয়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা জোয়ারের পানিতে ডুবে গেছে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে পাঁচ ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপত্সীমার এক ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার মোরেলগঞ্জ ঘাটের গ্যাংওয়ে ডুবে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বাগেরহাট-শরণখোলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তবে মোংলা বন্দরে গতকাল দুপুর থেকে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, জোয়ারের পানিতে সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশ ডুবে গেছে। বিভিন্ন বৃক্ষরাজি পানিতে ডুবে রয়েছে। জোয়ারের পানিতে বনের মধ্যে বেশ কয়েকটি মিষ্টি পানির পুকুর ডুবে গেছে। বেশ কিছু বন্য প্রাণী পুকুর পারে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে বন্য প্রাণীর কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজারের টেকনাফে শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জোয়ারের পানিতে ধসে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের একমাত্র জেটিটিও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোয়ারের পানি উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর ইয়ার্ডে। চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালেও জোয়ারের পানি উঠেছে।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ইয়াসের প্রভাবে বলেশ্বর নদ তীরবর্তী চার ইউনিয়ন রক্ষা বেড়িবাঁধ উপচে অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বলেশ্বর নদের মাঝেরচরের সাড়ে চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ জোয়ারের তোড়ে সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। মাঝের চর, ক্ষেতাচিড়া জেলেপল্লী, বড় মাছুয়া, খেজুরবাড়িয়া, ভোলমারা, তুষখালী, ছোট মাছুয়া, জানখালী, বেতমোর, উলুবাড়িয়াসহ অন্তত অর্ধশত গ্রামে বাঁধ উপচে লোকালয় জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

সাতক্ষীরা সদর, শ্যামনগর, আশাশুনি, দেবহাটা ও কালীগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ ছাপিয়ে পানির তোড়ে ভেসে গেছে নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ হাজারো মাছের ঘের। গতকাল দুপুরে নদ-নদীতে স্বাভাবিক জেয়ারের পানির চেয়ে পাঁচ-ছয় ফুট উচ্চতার বেশি জোয়ার সৃষ্টি হলে পানির চাপে এসব বাঁধ ভেঙে ও ছাপিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে অন্তত ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

আশাশুনির প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন জানান, তাঁর ইউনিয়নের চারটি পয়েন্টে কপোতাক্ষের উপচে পড়া পানিতে প্রায় সব গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে মাছের ঘের ও পুকুর।

আশাশুনি সদর ইউনিয়নে খোলপেটুয়া নদীর ৬৫০ মিটার বেড়িবাঁধ না থাকায় বলাবাড়িয়া গ্রামের বড়ঘের ও দয়ারঘাট গ্রামের একাধিক স্থান ছাপিয়ে-ভেঙে মাছের ঘের ডুবে গেছে। এ ছাড়া মানিকখালী ছাপিয়ে পুবের বিল ও মরিচ্চাপ নদের জোয়ারের পানি ছাপিয়ে আশাশুনি বাজার প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সময় বরগুনার বেতাগীতে সরিষামুড়ি ইউনিয়নে মায়ের কোল থেকে পড়ে ইমামুল হোসেন (৩) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার পাঁচটি স্থানের বেড়িবাঁধ ভেঙে ২৩টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে জোয়ারের পানিতে পড়ে জিনিয়া আক্তার (৪) নামে আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জোয়ারের পানিতে খেলতে গিয়ে ঝালকাঠির রাজাপুরে মো. সিয়াম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভোলায় লালমোহনে গাছ চাপা পড়ে আবু তাহের (৪৮) নামের একজন নিহত হয়েছেন। বরিশালের বাকেরগঞ্জে জোয়ারের পানিতে ডুবে নিয়ামতি ইউনিয়নের সুমাইয়া (৩) ও গারুড়িয়া ইউনিয়নের আজোয়া (৩) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের রাউজানে বাড়ির পাশে কর্ণফুলী নদীতে পড়ে মারা যায় বাগোয়ান ইউনিয়নের পাপননাথ (৪) নামের আরেক শিশু।

আবহাওয়া অফিস জানায়, ইয়াসের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতাসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলাগুলো এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে পূর্ণিমার প্রভাবে এসব জেলায় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে তিন থেকে ছয় ফুট অধিক উচ্চতার জোয়ারে প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English