করোনাভাইরাসের প্রভাব জুনের মধ্যে ৪১১ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়, বাড়বে ব্যয় ও মেয়াদ ৯ মাসে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়ন হার ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ বরাদ্দের মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় স্বাস্থ্যসেবা

করোনা মহামারির মধ্যেই চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে (জুলাই-ডিসেম্বর) অগ্রগতির হার নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে অর্থ বিভাগ। সেখানে দেখা গেছে, এই সময় ব্যয় করা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। আর পরবর্তী ছয় মাসে ব্যয় করতে হবে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। ওই হিসাবে প্রতি মাসে ব্যয় করতে হবে ৭১ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে করোনা মহামারির প্রকোপ প্রতিদিনই বাড়ছে। তাই এই সময়ে বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করা সরকারকে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। কারণ বিগত ছয় মাসের মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। ওই সময়ে অবশ্য দেশে করোনার প্রভাব নিম্নমুখী ছিল। আর এখন করোনার সঙ্কট দেশে প্রকট আকার ধারণ করেছে। যা উন্নয়ন কর্মকান্ডকে ওলটপালট করে দিয়েছে। আর এই সময়ে প্রতি মাসে ৭১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের অগ্রগতি নিয়ে অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ধীরগতির কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হার কমছে প্রায় ২৫ শতাংশ। বাজেট বাস্তবায়নের হার কমেছে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আর করোনায় ব্যবসাবাণিজ্য মন্দার কারণে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কাক্সিক্ষত হারে আদায় সম্ভব হয়নি রাজস্ব। প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার কারণে বহু প্রকল্পের কাজ বন্ধ বা শ্লথগতিতে ছিল। অনেক বিদেশি প্রকৌশলী এখনো কাজে যোগ দিতে পারেননি। তাই উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকান্ড ধীরগতি হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক ব্যয়ের ওপর। এছাড়া সরকারের বাজেটের বড় অংশই ব্যয় হয় উন্নয়নকাজে। এজন্য প্রতি অর্থবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে ব্যয়ের একটি লক্ষ্য ঠিক করা থাকে। চলতি অর্থবছর এডিপি বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে চ্যালেঞ্জর মুখে পড়েছে চলমান ২ হাজার ৮০টি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন। এর মধ্যে ৪১১টি প্রকল্প জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। করোনার প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে চ্যালেঞ্জের মাত্রা আরো বাড়বে। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) আওতায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১৩ কোটি টাকা।

আইএমইডির মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত চার অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বাস্তবায়ন হয়েছে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে সংশোধিত এডিপির বাস্তবায়ন হার ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪৫ দশমিক ০৮ শতাংশ। এর আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৪৭ দশমিক ২২ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৪৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। মার্চের প্রথম সপ্তাহে অনুমোদন পায় আরএডিপি। কিন্তু এরই মধ্যে করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। দেশজুড়ে চলছে লকডাউন। যদিও উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রাখতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। কিন্তু অন্য প্রকল্পগুলোতে এমন প্রস্তুতি নেই। মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেয়ার কথা জানিয়েছেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক ড. সৌকত আকবর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের মার্চে দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই সব ধরনের উন্নয়নকাজে স্থবিরতা ছিল। বর্তমান লকডাউনের প্রভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মতে, শেষ পর্যন্ত অনেক প্রকল্পেরই ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবীদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে বাধ্য। বিশেষ করে শ্রমঘন এবং বৈদেশিক কর্মী সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। যদিও সরকারের প্রচেষ্টা রয়েছে উন্নয়ন কাজ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, কিংবা কর্মসংস্থান ঠিক রাখতে প্রকল্পগুলো সচল রাখার। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দীর্ঘায়িত হলে বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকে যায়। তবে সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য খাতের করোনা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান রাখাটা জরুরি বলে উল্লেখ করেন ড. জাহিদ হোসেন।

সরকারের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, করোনার প্রভাব অবশ্যই প্রকল্পগুলোতে পড়বে। তবে যেসব প্রকল্প সমীক্ষাসংক্রান্ত বা কারিগরি সহায়তা প্রকল্প সেগুলো হয়তো কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, যেসব প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে কিছু হয়তো শেষ করা যাবে। তবে বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই সমস্যা হতে পারে।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের মূল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) চলমান বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৬১টি। নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য নির্ধারিত ছিল ৩৮২টি প্রকল্প। সংশোধিত এডিপিতে বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩৯টি এবং সমাপ্তির জন্য নির্ধারণ করা হয় ৪৪১টি। চলমান এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ফাস্টট্র্যাকভুক্ত মেগা প্রকল্পও।

অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার মধ্যে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয় ৩৩ হাজার ৩শ’ কোটি টাকা। গত বছর একই সময়ে ব্যয় করা হয় ৪৪ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় এই সময় এডিপি বাস্তবায়ন হার কমেছে ২৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, করোনার কারণে ভালো প্রকল্প ছাড়াও মধ্যম এবং নি¤œমানের সব প্রকল্পে অর্থ ছাড় বন্ধ রাখা হয়। অনেক মেগা প্রকল্পের কাজও বন্ধ ছিল। যে কারণে এডিপির বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, এ বছর ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রথম ছয় মাসে ১ লাখ ২২ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা আদায় হয়। আর সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য মতে, প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত দুই লাখ ২৭ হাজার ৭৬৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার ৮০৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাকি তিন মাসে রাজস্ব আদায় করতে হবে আরো এক লাখ ৫৩ হাজার ১৯১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। যা প্রায় অসম্ভব। অবশ্য অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খুব শিগগিরই অর্থ মন্ত্রণালয় বৈঠক করবে।

সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, করোনার কারণে সরকারের মেগাসহ ছোটবড় অনেক প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকে। যা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলে। যে কারণে সার্বিকভাবে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে ব্যয়ের ওপর। মাহবুব আহমেদ বলেন, অর্থনীতিকে কম গুরুত্ব দেয়া যাবে না। তবে এখন জীবন ও জীবিকাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সারা পৃথিবী অস্বাভাবিক সময় পার করছে।

বরাদ্দের মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের
মহামারির মধ্যেও বরাদ্দের মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতিতেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় দেয়া বরাদ্দ থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য ১১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও তারা মাত্র দুই হাজার ৫১৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। যেটা সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনা মহামারির সময়ে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় স্থান কেন্দ্রীয় ঔষাধাগার (সিএমএসডি)। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামানের একঘুয়েমিতে করোনার শুরুর দিকে মহামারি থেকে দেশকে বাঁচাতে পিপিই, মাস্ক, করোনা টেস্ট কিটসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্য ও আইসিইউ বেড, হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলাসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয় করেছেন তাদের বিল এখনও পাননি। এ খাতে ব্যয় হওয়া কয়েক হাজার কোটি টাকা, যা হিসাবে না আসায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ব্যয় কমেছে। অন্যথায় ব্যয় আরো বাড়তো। তিনি বলেন, অনেক সময় কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সেটা পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়। এসব কারণে প্রকল্প ব্যয় দেখাতে দেরি হতে পারে। স্বাস্থ্যখাতেও এ রকমটা হয়েছে। তিনি বলেন, সিএমএসডিসহ অনেক ঠিকাদারের বিল পরশোধ করা হয়নি। যা ব্যয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। দেশের করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্য খাতের চরম সঙ্কটের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অদক্ষতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এখন সব থেকে ভালো হতো যারা চাকরি হারিয়েছেন তাদের হাতে যদি কিছু টাকা দেয়া যেত। এটি করা গেলে অর্থনীতিতে গতি আসত। এসএমই খাতকে প্রচুর পরিমাণ সহযোগিতা করতে হবে। তাহলে মানুষের হাতে কিছু টাকা যাবে। এছাড়া করোনার কারণে এডিপির বাস্তবায়নও একেবারে কমে গেছে। কিন্তু এটা বাড়াতে হবে। দরকার হলে সময়োপযোগী নতুন প্রজেক্ট নিয়ে এডিপি বাস্তবায়ন হার বাড়াতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English