Sunday, June 23, 2024
spot_img
Homeজাতীয়গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় অবৈধ অস্ত্রধারীরা

গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় অবৈধ অস্ত্রধারীরা

পার্শ্ববর্তী একটি দেশ থেকে অবৈধভাবে অস্ত্র নিয়ে আসতো একটি চক্র। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ভুয়া লাইসেন্স তৈরি করে ওই অস্ত্রগুলো বিক্রি করতো। পরে অবৈধ অস্ত্র ও ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে ওই ব্যক্তিরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নামকরা সিকিউরিটি কোম্পানির হয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতো। এ ছাড়া ওই   চক্রটি অবৈধ অস্ত্র এনে ভুয়া লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে সরবরাহ করে আসছিল। আগামীতে অস্ত্রের আরও বড় চালান এনে চড়া দামে বিভিন্ন জনের কাছে সরবরাহ করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবে রেহাই মিলেনি। অবৈধ অস্ত্র বিক্রি, জাল লাইসেন্স তৈরিসহ আরও কিছু অভিযোগে ওই চক্রের মূলহোতাসহ ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। 

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- মো. পলাশ শেখ (৩৮), মো. মনোয়ার হোসেন (৩২), রশিদুল ইসলাম (৪০), নাজিম মোল্লা (৩৫), মারুফ হোসেন (২৪) ও মো. নাইমুল ইসলাম (২২)। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ওয়ান শুটার গান, ৭টি একনলা বন্দুক, দুটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ৮ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ওয়ান শুটারের গুলি ২ রাউন্ড, একনলা বন্দুকের গুলি ৬৭ রাউন্ড, ০.২২ বোর রাইফেলের গুলি ৪০ রাউন্ড, ১১টি জাল লাইসেন্স ও ১৯টি বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার নামের সিল জব্দ করা হয়। গতকাল দুপুরে কাওরান বাজার র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অবৈধ পথে অস্ত্র চোরাচালান করে ভুয়া লাইসেন্স তৈরির মাধ্যমে আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি করতো একটি চক্র।

প্রতিটি অস্ত্র ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় কিনতো। দেশে আনার সময় অস্ত্রের বিভিন্ন পার্টস খুলে ছোট করে ব্যাগে রাখতো।  কৌশলে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্রের চালান পার করে দেশে এনে প্রতিটি অস্ত্র ২ থেকে ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করতো। তারা মাত্র ৫ দিনের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই অস্ত্রের লাইসেন্স তৈরি করে দিতো। অথচ অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে সরকারিভাবে সময় লাগে প্রায় এক বছর। এসব অবৈধ ও ভুয়া লাইসেন্সের অস্ত্র নিয়ে একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করছে। 

তিনি বলেন, চক্রটির মূলহোতা পলাশ। চক্রের সদস্য সংখ্যা ৪-৫ জন। তারা রিভলবার, পিস্তল ও একনলা বন্দুকসহ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র অবৈধ পথে দেশে নিয়ে আসে। তারা শুধু অস্ত্র ও লাইসেন্স দেয় না। অনেকের সঙ্গে চুক্তি করে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি দেয়। এই চাকরি প্রদানের জন্য জন প্রতি ২-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। অবৈধ অস্ত্র ও ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করতো। এ ছাড়াও চক্রটি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে চড়া দামে জাল লাইসেন্স তৈরি করে অবৈধ অস্ত্র বিক্রি করতো। 

আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তার পলাশ চক্রের মূলহোতা। ২০০৪ সালে স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে। জীবিকার তাগিদে ২০১৩ সালে চাকরির জন্য ঢাকায়  এসে একটি স্বনামধন্য সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি শুরু করে। চাকরিরত অবস্থায় ২০১৫ সালে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ভুয়া লাইসেন্সের অবৈধ বন্দুক কিনে একটি বেসরকারি ব্যাংকে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে। পরে নিজেই অবৈধ পথে অস্ত্রের চালান এনে বিক্রি এবং ৪-৫ জনের একটি টিম তৈরি করে। পলাশের নেতৃত্বে চক্রটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তার নামীয় সিল তৈরি করে জাল লাইসেন্স তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বনামধন্য বেসরকারি সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাধে ওই প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব অবস্থান তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন চাকরিপ্রার্থীদের অধিক বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখাতো এবং আগ্রহী চাকরি প্রার্থীদের কাছে অবৈধ পথে আনা ভুয়া লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ২-৩ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতো। পলাশ গত ৫/৬ বছর ধরে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালানের মাধ্যমে এনে সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ব্যক্তিদেরকে অবৈধ অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করতো। 

গ্রেপ্তার মনোয়ার স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। ২০১৪ সালে চাকরির জন্য ঢাকায় এসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি শুরু করে। চাকরির সুবাদে পলাশের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে এবং পলাশের সহযোগিতায় দুই লাখ টাকার বিনিময়ে একটি ভুয়া লাইসেন্সকৃত অবৈধ একনলা বন্দুক সংগ্রহ করে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অধিক বেতনে চাকরি শুরু করে। পরে পলাশ তাকে বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার জগতে প্রবেশ করায়। পলাশের নির্দেশনায় মনোয়ার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করতো ও ভুয়া লাইসেন্স তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে অস্ত্র বিক্রি করতো। একইভাবে মাদ্রাসায় দাখিল পর্যন্ত পড়াশোনা করা রশিদুল ২০১৯ সালে চাকরির জন্য ঢাকায় আসে। পলাশের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে এবং দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ভুয়া লাইসেন্সকৃত অবৈধ অস্ত্র কিনে বেশি বেতনে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি শুরু করে। সে বিভিন্ন সময়ে আগ্রহী চাকরি প্রার্থীদের পলাশের কাছে প্রেরণ করতো।
গ্রেপ্তার নাইমুল ইসলাম স্থানীয় একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০২০ সালে চাকরির সন্ধানে ঢাকায় আসে। পরে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে পলাশের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পলাশের লোভনীয় বেতনের প্রস্তাবে আকৃষ্ট হয়ে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে ভুয়া লাইসেন্সকৃত অস্ত্র কিনে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে। 

বিভিন্ন সময়ে আগ্রহী চাকরিপ্রার্থীদের পলাশের কাছে পাঠাতো। গ্রেপ্তার নাজিম মোল্লা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে। ২০২২ সালে চাকরির জন্য ঢাকায় এসে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে ভুয়া লাইসেন্সের অবৈধ অস্ত্র কিনে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে। বিভিন্ন আগ্রহী চাকরি প্রার্থীদেরকে সে পলাশের কাছে পাঠাতো। গ্রেপ্তার মারুফ একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০২৩ সালে চাকরির জন্য ঢাকায় আসে। পরে পলাশের মাধ্যমে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ভুয়া লাইসেন্সের অস্ত্র কিনে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে।
মঈন বলেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তারা অবৈধ অস্ত্র ও ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে যেভাবে চাকরি করে আসছিল এটি অনেক বিপদের কারণ হতে পারতো। কারণ তারা যদি গুলি করে কাউকে মেরে ফেলতো তবে তাদেরকে ধরা কঠিন হতো। কারণ অবৈধ হওয়াতে এই অস্ত্র ও গুলির হিসাব পাওয়া যেত না। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এরকম ৩০ জন চাকরি করছে বলে আমাদের অনুসন্ধানে বের হয়েছে। র‌্যাবের অভিযানের খবর পেয়ে তারা পলাতক রয়েছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments