Saturday, July 20, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামগুপ্ত হামলা : নব্য সন্ত্রাসবাদ!

গুপ্ত হামলা : নব্য সন্ত্রাসবাদ!

গত প্রায় দুই মাস যাবত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে বেশ কিছু গুপ্ত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে চারজন গুপ্ত হত্যা বা টার্গেটেড কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রামে বা শহরে এমনকি খোদ রাজধানীতেও অনেক নাগরিকের বাসা-বাড়িতে টার্গেটেড হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। এসব বিভীষিকাময় আক্রমণের ঘটনা থামানো না গেলে ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং দেশ নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার কবলে পড়তে পারে যাতে সব নাগরিকের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে এ পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলা : পাবনা, নাটোর, নওগাঁ এবং রাজশাহীতে কমপক্ষে ১৮টি গুপ্ত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় দু’জন বিএনপির এবং দু’জন জামায়াতের নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। গত এক মাসে নাটোরে ১০টি এবং রাজশাহীতে তিনটি গুপ্ত হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহীর তিনটি হামলার ঘটনায় জামায়াতের দু’জন গুপ্ত হত্যা বা টার্গেটেড কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন। ২৯ অক্টোবর রাজশাহী নগরীতে জনপ্রিয় একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক ডাক্তার গোলাম কাজেম আলী এবং একজন পল্লী চিকিৎসক এরশাদ আলীকে হত্যা করা হয়। ডাক্তার গোলাম কাজেম আলী চেম্বার থেকে রোগী দেখে মোটরসাইকেলযোগে বাসায় ফেরার পথে রাত পৌনে ১২টার দিকে একটি মাইক্রোবাস তার গতি রোধ করে। পরে মাইক্রোবাস থেকে মুখোশধারীরা নেমে ডাক্তার কাজেমের বুকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। একই রাতে পল্লী চিকিৎসক এরশাদ আলীকে তার ফার্মেসি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন সকালে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। আর এ ধরনের হামলায় বেঁচে যান শহরের কাটাখালী থানা এলাকার ব্যবসায়ী শাহীন আলম। গত ১৮ নভেম্বর রাত ৯টায় নওগাঁ শহরের রাজাকপুর এলাকায় বাড়ি ফেরার পথে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা কামাল আহমেদকে মুখোশধারীরা কুপিয়ে হত্যা করে। নওগাঁয় এ ধরনের আরো চারটি গুপ্ত আক্রমণে আহত হন স্থানীয় যুবদল ও বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসাইন, জাহিদুর রহমান এবং আবু রায়হান।

গত ১৬ অক্টোবর জামায়াত কর্মী নাসির উদ্দীন এবং ২৬ অক্টোবর ফজলুর রহমান নামক নাটোর সদরের জামায়াত নেতা, হেলমেট পরিহিত মুখোশধারীদের হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এরপর ২১ অক্টোবর রাতে আবু রায়হান নামক বিএনপি নেতাকে ছাতনি এলাকা থেকে অপহরণ করে ছুরিকাঘাত করে রাজশাহীর পুঠিয়া এলাকায় ফেলে রেখে যায়। চট্টগ্রামেও মুখোশধারীদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ২০ দিনে মুখোশধারীরা সীতাকুণ্ডস্থ স্থানীয় যুবদল নেতা মোহাম্মদ আলমগীর এবং বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামসুল আলমের বাড়িঘরে হামলা চালায়। মুখোশধারীরা বিএনপির কেন্দ্রীয় জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল আসলাম চৌধুরীর সিএনজি ফিলিংস্টেশনেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে গত ১৩ নভেম্বর। পুলিশের তথ্যমতে, গত ১৬ অক্টোবর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলা, সিংড়া উপজেলা, সদর উপজেলা এবং লালপুর উপজেলায় মোট ১০টি চোরাগুপ্তা হামলার শিকার তিনজন বিএনপির, ছয়জন জামায়াতে ইসলামীর এবং একজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে যুক্ত।

এই গুপ্ত হামলা বা টার্গেটেড হামলার আরেক শিকার হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কর্মী হাফেজ সাইদুল ইসলাম। নাটোরের সদর উপজেলার মাঝদীঘি নূরানী ও হাফেজিয়া মাদরাসার সুপার হাফেজ সাইদুল ইসলামকে ১৭ নভেম্বর রাতে মাগরিবের নামাজের পর মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থা থেকে ৬-৭ জনের মুখোশধারী দল অপহরণ করে মাইক্রোবাসে নিয়ে যায়। পরে তাকে চোখ এবং হাত বেঁধে হাতুড়ি-রড দিয়ে প্রহার করে এবং ছুরিকাঘাত করে। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা ৫-৬ কিলোমিটার দূরে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় (নিউ এজ : ১৯/১১/২০২৩)। গুপ্ত হত্যার সর্বশেষ সংবাদ মতে আরেক শিকার হয়েছেন বগুড়া জেলার শেরপুরে বিশালপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা আব্দুল মতিন। গত ১৫ নভেম্বর বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত একটি মামলায় তিনি ৬৪ নম্বর আসামি হয়েছেন। এরপর থেকে গ্রেফতার এড়াতে আবদুল মতিন রাতে বাড়ি থাকতেন না। গত ২৩ নভেম্বর মান্দাইল গ্রামের পূর্বপাড়া চরের মধ্যে সরিষা ক্ষেতে তার রক্তাক্ত মৃতদেহ কে বা কারা ফেলে রেখে যায়। তাকে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে লাশ দেখে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান (নয়া দিগন্ত : ২৪/১১/২০২৩)।

উত্তরের চারটি জেলার ১৮টি গুপ্ত হামলার ঘটনায় ১০টির বিষয়ে মামলা হয়েছে এবং দু’জন গ্রেফতার হয়েছে। তবে আহতদের অনেকেই মামলা করতে চান না। মামলা করতে গিয়ে উল্টো পুলিশ কর্তৃক হয়রানির ভয়েই তারা বিচার চাইতে নারাজ। আবার হামলার শিকার কেউ কেউ আক্রমণকারী সন্ত্রাসীর পরিচয় প্রকাশ করলেও কেউ গ্রেফতার হচ্ছে না বা কাউকেই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না! তবে এসব মামলায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মামলারই কোনো অগ্রগতি নেই। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র জামিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘মহানগরে ২৯ অক্টোবরের দু’টি হত্যাকাণ্ডের মামলায় বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই’ (প্রথম আলো : ২১/১১/২০২৩)। আর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের হামলা তিনটির বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ করেনি (ডেইলি স্টার : ২২/১১/২০২৩)।

এসব গুপ্ত হামলা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় : ক. দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সব হামলার ঘটনা ঘটেছে রাতে। খ. হামলাকারীরা হেলমেট অথবা মুখোশ পরিহিত থাকে। গ. তারা নাম্বার প্লেটবিহীন মাইক্রোবাস এবং মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছে। ঘ. তারা দেশী অস্ত্র যেমন রড, হাতুড়ি, ছুরি ইত্যাদি ব্যবহার করছে। ঙ. হামলার শিকার সবাই বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাকর্মী। চ. হামলার শিকার ব্যক্তিদের মামলা করতে ভয় বা অনীহা পরিলক্ষিত হয়েছে এবং ছ. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা নিতে অস্বীকার করেছে; আর যেসব মামলা হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে অগ্রগতি করতেও এক ধরনের শিথিলতা দেখা গেছে।

বিগত দু’টি নির্বাচনের সময়েও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেগুলোর ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। অর্থাৎ বড়জোর ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘হেফাজতে মৃত্যু’ ছাড়া অন্য কোনো গোষ্ঠীর হাতে মৃত্যুর সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘ক্রসফায়ার’ নয়; বরং যেকোনো সময় বিরোধী যেকোনো রাজনৈতিক কর্মী বা নেতার মৃত্যুভয় অনেককেই পেয়ে বসছে। এই আতঙ্ক বেশি তৃণমূল পর্যায়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরেও বেশ কিছু হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। সেগুলোতে অজানা গোষ্ঠী বা গুপ্ত বাহিনীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে ৩০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল যার ২৬ জনই ছিলেন বিএনপি অথবা জামায়াতের নেতাকর্মী। র্যাব, পুলিশ, বিজিবি এবং যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে সেসব হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছিল।

তবে যে বা যারাই এসব ‘গুপ্ত আক্রমণ’ বা ‘টার্গেটেড কিলিং’ ঘটাক না কেন, এটা যে সুস্পষ্ট ‘সন্ত্রাসবাদ’, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘সন্ত্রাসবাদে’র উদ্দেশ্য থাকে, হামলা-হত্যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ভীতসন্ত্রস্ত করা বা টার্গেট গ্রুপকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, হামলাকারী সন্ত্রাসীরা অনেকটা সফল হয়েছে। তৃণমূলের সক্রিয় বিরোধী নেতাকর্মীরা প্রায় দিশেহারা! অধিকাংশই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

যারাই এই সন্ত্রাসী আক্রমণগুলোর বেনিফিসিয়ারি হোক না কেন এটা ভয়ঙ্কর এক আগুন নিয়ে খেলা! আফগানিস্তানে রাশিয়াকে শায়েস্তা করার জন্য মার্কিনিদের সৃষ্ট আল কায়েদা কিন্তু একদিন মার্কিনিদেরই কলিজায় আক্রমণ করেছে! ইরাকের শিয়াদেরকে শায়েস্তা করার জন্য মার্কিনিদের সৃষ্ট ‘আইএস’-এর সাথেও এখনো মার্কিন সৈন্যরা সিরিয়ায় জীবন দিচ্ছে। ইতিহাস বলে, এভাবে ‘স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘রণকৌশল’ হিসেবে উদ্ভব হওয়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো দিন শেষে তাদের সৃষ্টিকর্তাদেরই গ্রাস করতে চায়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় দল, ধর্ম, বর্ণ এবং মত ও পথ নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কাজেই গজিয়ে ওঠা এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রতিটি আক্রমণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে সেই সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী এবং এজেন্সিগুলোর। অন্যথায়, এর বিষবাষ্প সরকারি এবং বিরোধী নির্বিশেষে সবাইকেই গ্রাস করে ফেলতে পারে। তখন তার খেসারত পুরো জাতিকেই দিতে হবে!

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments