Friday, April 19, 2024
spot_img
Homeবিচিত্রক্যান্সারকে হারিয়েই দিলেন সেই আহনাফ

ক্যান্সারকে হারিয়েই দিলেন সেই আহনাফ

দীর্ঘ আট বছরের লড়াইয়ের পর অবশেষে ক্যান্সার থেকে মুক্তি মিলেছে নূর-এ সাফী আহনাফের। আজ থেকে ক্লিনিক্যালি ও অফিশিয়ালি ক্যান্সার থেকে মুক্ত তিনি। তবে ক্যান্সার-ফ্রি হলেও ওরাল কেমো চালিয়েই যেতে হবে বলে জানিয়েছেন আহনাফ।

তিনি লিখেছেন, ‘নেত্রকোনার বিরিশিরিতে বসে জীবনের অন্যতম আনন্দের খবরটা কিছুক্ষণ আগে পেলাম।

দীর্ঘ আট বছরেরও বেশি লড়াইয়ের পর আজ থেকে আমি ক্লিনিক্যালি ও অফিশিয়ালি ক্যান্সার-ফ্রি। এই দিনটার স্বপ্নও দেখি নাই কখনো। লেখার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি আজ। আপনারা সবাই পাশে ছিলেন বলেই দীর্ঘ এই লড়াই লড়ে যেতে পেরেছি। ক্যান্সার আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার ছিল। ক্যান্সার আমায় পার্থিব এই জীবনের বাইরে অপূর্ব এক সুন্দর জগতের সন্ধান দিয়েছে। এই জগতেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। ’

‘লিউকমিয়া অ্যান্ড লিম্ফোমা সোসাইটি অব বাংলাদেশ’ নিয়ে আহনাফ ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর পাশে।

আহনাফের জীবনযুদ্ধ নিয়ে কালের কণ্ঠের অবসরে পাতায় প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর।  জীবন তোমায় ভালোবাসি শিরোনামের সেই প্রতিবেদন তখন অসংখ্য মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। এরপর আরো কয়েকবার তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছিল অবসরে পাতায়।

২০১৩ সাল। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন আহনাফ। কিছুদিন পরেই ছিল ঈদুল আজহা। গ্রামের বাড়ি জামালপুরে যাবেন বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই শরীরে অস্বস্তি দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তিনি কিছু টেস্ট দিয়েছিলেন। পরদিন টেস্টের রিপোর্টগুলো নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। ভেবেছিলেন টেস্টের রিপোর্টগুলো ডাক্তারকে দেখিয়েই সোজা জামালপুরের গাড়ি ধরবেন। কিন্তু রিপোর্ট দেখেই ডাক্তার বললেন, ‘কালই হসপিটালে ভর্তি হয়ে যাও। ’ পরে জানলেন ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে! যত দিন বাঁচবেন, লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। প্রায় সপ্তাহ তিনেক পর ভারতে গিয়েছিলেন। কলকাতার টাটা মেডিক্যাল সেন্টারে। ডাক্তার বললেন, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করার আগে ওরাল কেমোথেরাপি চলবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহপাঠীদের সাথে আহনাফ

সেই থেকে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন আহনাফ। এ অবস্থায়ই এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যালে চান্স পেয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। কিছুদিন আগে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। জসীমউদ্দীন হলের ছাত্র ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হলে আন্ত ক্লাব বিতর্ক প্রতিযোগিতায় একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। ইকোনমিকস ক্যারিয়ার অ্যালায়েন্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

আহনাফ বললেন, ‘ক্যান্সার আমার জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। আমার মনে হয় আমি সৌভাগ্যবান। এখন মনে হয়, ওপরে ওঠার জন্য কাদা ছোড়াছুড়ি, কিছু না পাওয়ার হতাশা এগুলোর আসলে কোনো মানে নেই। জীবনটা এত সুন্দর, এত বড় একটা জীবন আমরা সেটাকে খুব ছোট করে দেখি। এই উপলব্ধিটাই আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া। এটা আমাকে ক্যান্সারই দিয়েছে। ’

নিজে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়েছিলেন বলে এই রোগে আক্রান্ত মানুষদের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এই মানুষগুলোর পাশে থাকার জন্য গড়েছেন লিউকেমিয়া অ্যান্ড লিম্ফোমা সোসাইটি অব বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে এটির যাত্রা শুরু। ক্যান্সার রোগীদের হাসিখুশি রাখাই ছিল উদ্দেশ্য। বললেন, ‘ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা সবার। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর যখন ইন্ডিয়া গেলাম, দেখলাম প্রচুর বাংলাদেশি। প্রত্যেকের সঙ্গে আড্ডা বা গল্পে একটা জিনিস ফুটে উঠল, তারা সবাই একা! এমনও অনেকে আছে, যাদের পরিবারেরও কেউ সহায়তা করে না। তাই ভাবলাম, এদের কিভাবে একত্র করা যায়, একটা প্ল্যাটফর্মে আনা যায়। সবাই মিলে কিভাবে হাসিখুশি থাকা যায়। সে থেকেই ওই সোসাইটি। ’

মানুষের কাছে দোয়া চেয়ে আহনাফ বলেছেন, ‘ক্যান্সারযোদ্ধাদের পাশে নিয়েই যেন বাকি জীবন পার করতে পারি। আপনাদের যে অফুরন্ত ভালোবাসা ক্ষুদ্র এই জীবনে পেয়েছি তার প্রতিদান দেওয়ার সামর্থ্য আমার নাই। দোয়া করবেন। ’

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments