Thursday, October 6, 2022
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামকেমন হবে নতুন বছরের রাজনীতি

কেমন হবে নতুন বছরের রাজনীতি

মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সর্বক্ষেত্রে, বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সরকারি দলের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ২০২২ সালে সরকারের আচরণ হবে অন্যরকম। এ বছর বিরোধী দলগুলো মরিয়া হয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায়ে সক্রিয় হবে। কারণ, দলগুলো জানে, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী-এমপিদের ক্ষমতায় রেখে, জাতীয় সংসদ না ভেঙে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা আর ওই নির্বাচনে স্বেচ্ছায় পরাজয় বরণ করে নেওয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। ক্ষমতা না ছেড়ে এমন নির্বাচন করায় আমলারাও সরকারকে সহায়তা করবেন।

কারণ, সরকারের হাতেই তাদের পদোন্নতি-বদলিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকে। এ জন্য আমলারা নিজেদের স্বার্থেই সরকারের বিরাগভাজন হবেন না। এমতাবস্থায় নিজস্ব মনপছন্দ লোকজন দিয়ে ইসি গঠন করলে সে কমিশন যে সরকারের অঘোষিত ডিকটেশন অনুযায়ী কাজ করবে, তা অনুধাবন করা যায়। অনুসন্ধান কমিটি গঠনের নামে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কতিপয় দলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের যেসব শ্রুতিশোভন কথা বলছেন, তা তার ভদ্রতার পরিচায়ক। বাস্তবে তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে গিয়ে যুগপৎ সার্চ কমিটি বা নির্বাচন কমিশন গঠন করা সম্ভব হবে না।

এমন পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে বিরোধী দলগুলোর সামনে একটি মাত্র পথ খোলা থাকবে। আর এ পথটি হলো, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায় করা। আন্দোলন না করে যে এমন দাবি আদায় করা যাবে না, সে সম্পর্কে বিরোধী দলগুলো ওয়াকিবহাল। এ জন্য দলগুলো সরকারের ওপর তাদের এমন দাবি মেনে নিতে যুগপৎ স্বদেশি ও বিদেশি চাপ বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আর এ উদ্যোগ জোরালো করতে ২০২২ সালকে বিরোধী শিবির থেকে উপযুক্ত সময় বিবেচনা করা হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিবের ‘মাঠেই ফয়সালা হবে’ শীর্ষক সাম্প্রতিক বক্তব্যে রাজপথের আন্দোলনের আভাস সুস্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি সমমনা দলগুলোকে নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন জমাতে পারে কিনা। তবে সরকার চেষ্টা করবে যাতে বিএনপি এমন আন্দোলন করতে না পারে। সেক্ষেত্রে আবারও পুরোনো ‘ধরপাকড়’ ও ‘মামলা’ অস্ত্রের সঙ্গে নতুন ‘করোনা’ বা ‘ওমিক্রন’ অস্ত্র ব্যবহৃত হয় কিনা, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবার বিষয়। এমন লক্ষণ থেকে স্পষ্ট হয়, ২০২২ সালে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার বিরোধীদলীয় দাবির পক্ষে ইতোমধ্যে বহির্বিশ্বের চাপ সৃষ্টিতে বিরোধী দলগুলো কিছুটা এগোতে পেরেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে গণতান্ত্রয়নের জন্য একটি অবস্থান গ্রহণ করেছেন বলে বিভিন্নভাবে জানান দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক আলোচনায় বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ না জানানো তারই প্রমাণ। জাতিসংঘসহ অন্য কয়েকটি বড় দেশও বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান চায়। এমতাবস্থায় সরকারকে চাপে ফেলে একটি সাংবিধানিক সংশোধনী করিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিধান করার জন্য ২০২২ সালকে সব বিরোধী দলই সঠিক সময় বলে গণ্য করছে।

অন্যদিকে আ স ম আব্দুর রব ও কিছু ছোট দল রাজনৈতিক সংকট সমাধানে ২ বছরের জন্য একটি জাতীয় সরকার গঠনের দাবি উত্থাপন করেছেন। তবে সরকার কোনো দাবিই মেনে নিতে চাইছে না। কাজেই যে কোনো বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে সরকারি উদ্যোগ সমাজে সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াবে। বাড়বে ধরপাকড় এবং হয়তো নতুন করে উজ্জীবিত করা হবে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রুজুকৃত ঝিমিয়ে পড়া মামলাগুলো। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, ২০২২ সালে রাজনীতির মাঠে যা কিছুই ঘটুক না কেন, তা হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে। তবে সরকার চাইলে এ নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনার অবসান ঘটাতে পারে। কারণ, সরকারের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সরকার একটি সাংবিধানিক সংশোধনী করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে সব আন্দোলন প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিতে পারে। তবে গত দুটি সংসদ নির্বাচনের ঘটনা আমলে নিয়ে বলা যায়, সরকারের তেমন কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। সরকার গতানুগতিক ভঙ্গিমায় প্রশাসন, পোশাকধারী বাহিনী এবং ইসির সহায়তা নিয়ে অন্য কোনো নতুন ফন্দি-ফিকিরে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চাইবে। সে চেষ্টায় গত দুটি নির্বাচনের মতো এবারও সরকার সফল হতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। এ ক্ষেত্রে কতিপয় পরাশক্তিধর দেশ সরকারের এসব উদ্দেশ্য হাসিলে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কাজেই রাজনৈতিক অঙ্কে মেধাবী প্রশাসকরা যে সব সময় একইভাবে সরকারের সব নির্দেশনা মানবেন, এ কথা বলা যায় না।

এসব দেখেশুনে এবং ২০২২ সালের পরিস্থিতি অনুধাবন করে শিক্ষিত যুবসমাজের স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছে। তারা ভাবছেন, চলমান সেশনজট এ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতায় পড়ে আরও বাড়তে পারে। একে তো করোনার কবলে পড়ে তারা লেখাপড়া ও ক্লাস-পরীক্ষা সময়মতো দিতে পারেননি। ফলে কর্মজীবনে প্রবেশের সোনার হরিণ তাদের কাছে অধরাই রয়ে গেছে। তা ছাড়া চাকরির বাজারের দুরবস্থার কথা তাদের অজানা নয়। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার চাকরির অপেক্ষায় দিন গুনছেন। অনেকে স্বপ্নহীন হয়ে বিপথগামী হচ্ছেন। এ হতাশা ও নিরাশার মধ্যে না থেকে এদের অনেকেই দেশের বাইরে চলে যেতে চাইছেন। বেশি যোগ্যদের অনেকে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ যোগ্যতায় বৃত্তি নিয়ে এবং সক্ষমদের অনেকে বেতন দিয়ে পড়তে যাচ্ছেন। আর যেসব দেশে বেতন ছাড়া লেখাপড়া করা যায়, অধিকাংশ অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা সেসব দেশে পড়তে যেতে চাইছেন। এ কারণে এখন অনেক শিক্ষার্থী জার্মানি, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি প্রভৃতি দেশে পড়তে যাচ্ছেন। বিদেশে শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা থাকায় সেখানে পড়ার সুযোগ পেলে আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশ ছাড়ছেন; এ বিদেশ যাওয়ার গতি দেশের রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গন পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের শিক্ষাঙ্গনে যদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়; সেইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস, পরীক্ষা, রেজাল্ট প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষিত যুবশক্তির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে।

এমন ‘ব্রেইন ড্রেইন’ রোধ করতে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। না হলে দেশ ক্রমান্বয়ে মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। কারণ, যারা দেশের শিক্ষাঙ্গনের বিশৃঙ্খলায় বিরক্ত হয়ে বিদেশে লেখাপড়া করতে যাচ্ছেন, তারা সেখানে প্রায় সবাই ভালো ফলাফল করবেন। এদের অনেকেই সেখানে থেকে যাবেন। এর ফলে দেশ হারাবে মেধাবী যুবশক্তি। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারাঙ্গন, শিক্ষাঙ্গন হারাবে মেধাবী লোকবল। শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এ সংকট দূর করা যেত। কিন্তু রাজনীতির কারণে তা করা সম্ভব হচ্ছে না। আসলে রাজনীতি হলো একটি দেশের মস্তিষ্ক বা স্নায়ুকেন্দ্র। রাজনীতি অসুস্থ হলে সবকিছুতে তার প্রভাব পড়ে। নাগরিক সমাজ ভেবেছিলেন, করোনার কারণে শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়েছে, করোনা হ্রাস পেলে শিক্ষকরা বাড়তি শ্রম দিয়ে সে ক্ষতি পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু কই? শিক্ষক সমাজের পারফরম্যান্সে কি সে আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে?

শিক্ষাসহ সব সমস্যা সমাধানের জন্য দেশ পরিচালনায় একটি শক্তিশালী সরকার থাকা দরকার। ওই সরকারকে অবশ্যই একটি গ্রহণযোগ্য ও অবিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে হবে। এমন একটি দেশপ্রেমিক সরকার যদি আন্তরিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠিত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের মনপছন্দ লোকজন দিয়ে। ফলে এমন ইসি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। দলীয়করণকৃত প্রশাসন তো সরকারের আজ্ঞাবহ হবেই। কারণ, এসব প্রশাসকদের পদোন্নতি ও বদলি যে সরকারের হাতে, সে সরকার না ভেঙে নির্বাচন হবে। কাজেই সরকারি দল ক্ষমতায় থেকে যেভাবে দলীয় সরকারাধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে, তাতে এ নির্বাচনে কেবল ক্ষমতাসীন দলই বিজয়লাভ করবে। ফলে সমস্যার সমাধান হবে না।

এ দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়ার উপায় এখন সরকারের হাতে। কারণ, তাদের জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। সরকার চাইলে একটি সাংবিধানিক আইন পাশ করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারে। সাংবিধানিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই তারা নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্যও একটি আইন পাশ করতে পারে। এ কাজ দুটি করলে নির্বাচনের ওপর নাগরিক সমাজ আস্থা ফিরে পাবে। আর গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত দেশপ্রেমিক সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নয়ন ঘটিয়ে ব্রেইন ড্রেইন কমাতে পারবে। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার ফন্দি-ফিকির ত্যাগ করে কবে সরকার দলপ্রেমের পরিবর্তে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এমন উদ্যোগ নেবে, তা সরকারকেই নির্ধারণ করতে হবে। আর এ ব্যাপারে সরকার কোনো উদ্যোগ না নিলে ২০২২ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বাড়বে।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments