Sunday, June 23, 2024
spot_img
Homeধর্মকেমন আছে ভলগাপারের মুসলমানরা

কেমন আছে ভলগাপারের মুসলমানরা

রাশিয়ায় ইসলাম প্রচারের ১১০০ বছর

বর্তমান রুশ ফেডারেশনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ‘তাতারস্তান’-এর পূর্ব নাম বুলগার বা ভলগা বুলগেরিয়া। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে ভলগা ও কামা নদীর অববাহিকা বুলগার জাতি-রাষ্ট্রের উত্থান। উন্মেষকালে ইহুদি কাজার শাসকদের সঙ্গে অবিরাম সংঘাতসহ দীর্ঘ সংকট ও সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যায় রাষ্ট্রটি। অবশেষে ৯২২ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা মুকতাদিরের সমর্থনে তা রাজনৈতিক স্থিতি লাভ করে এবং এ সময় দেশটির জনসাধারণও ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়।

বুলগাররা মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত। তবে তারা নিজেদের বুলগার বলতেই পছন্দ করে। মুসলিম বুলগার রাষ্ট্রের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে সোভিয়েত রাশিয়া ভলগা বুলগেরিয়ার নাম পরিবর্তন করে তাতারস্তান রাখে।

ইসলামের আগমন : ভলগাপারে ইসলামের আগমন ঘটে হিজরি তৃতীয় শতক মোতাবেক খ্রিস্টীয় নবম শতকে। তবে এর আগেই অত্র অঞ্চলের শাসক কাজারদের সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর সংঘাত হয়। ৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে (১২০ হি.) উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক এবং ৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে (১৮৩ হি.) খলিফা হারুনুর রশিদ কোনো কোনো যুদ্ধে কাজাদের পরাজিত করেন। এ সময়েই কাজার, ভলগা বুলগেরিয়াসহ ভলগা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটে।

ভলগাপারে ইসলামের উত্থান : ৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে (৩৫০ হি.) রুশ বাহিনী কাজারদের ওপর আক্রমণ করে। এর চার বছর পর একজন কাজার শাসক ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষও ইসলাম গ্রহণ করে। অবশ্য ১০১৬ খ্রিস্টাব্দে (৪০৭ হি.) রুশ শাসক প্রথম মিস্তিসলাভ অবশিষ্ট ইহুদি কাজারদের ওপর আক্রমণ করেন। তাকে সহায়তা করে রোম সম্রাট বাইজাইন্টাইন। এ সময় ইহুদি কাজাররা গণহত্যা ও দেশান্তরের শিকার হয়। জীবন রক্ষার জন্য বহু কাজার খ্রিস্ট ধর্মও গ্রহণ করে।

অবশ্য অত্র অঞ্চলের বুলগাররা কাজারদের আগেই ইসলাম গ্রহণ করে। ৯২২ খ্রিস্টাব্দে (৩০৯ হি.) ভলগা বুলগেরিয়ার শাসক আলমাস, যিনি ৮৯৫ থেকে ৯২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসক করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে জাফর ইবনে আবদুল্লাহ নামধারণ করেন; তিনি বাগদাদে আব্বাসীয় খলিফা মুকতাদির বিল্লাহর কাছে তাঁর প্রতিনিধি পাঠিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতা কামনা করেন। খলিফা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেন এবং প্রখ্যাত ফকিহ (আইনজ্ঞ) আহমদ ইবনে ফাদলানকে প্রধান করে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। ইবনে ফাদলান ও তাঁর প্রতিনিধিদলের হাতে শাসক পরিবার ও দেশটির সাধারণ জনগণ ইসলাম গ্রহণ করেন। ৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে (৩২০ খ্রি.) খলিফা মুকতাদির বিল্লাহর সঙ্গে বুলগার শাসক পরিবারের সদস্যরা পবিত্র হজব্রত পালন করেন। ১১৩৫ খ্রিস্টাব্দে (৫৩০ হি.) ঐতিহাসিক আবু হামিদ আন্দালুসি ভলগা বুলগেরিয়া সফর করেন। তখন বুলগাররা রোম সম্রাটের সঙ্গে তাদের যুদ্ধরত ছিল।

ভলগা বুলগেরিয়ার উন্নয়নে মুসলিম সহায়তা : ঐতিহাসিকরা বলেন, ভলগা বুলগেরিয়া শাসক আলমাস (জাফর) খলিফা মুকতাদিরের কাছে মূলত তিনটি বিষয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন। তা হলো বিচার ও প্রশাসন, চিকিৎসা ও ওষুধ, ধর্মীয় দীক্ষা দান। খলিফা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন, তাতে উল্লিখিত তিনটি বিষয় ছাড়াও সমর, কৃষি, অর্থনীতি, নির্মাণ ও শিল্পকলায় পারদর্শীদের প্রেরণ করেন। যারা বুলগারের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখেন। ঐতিহাসিক লেখেন, আব্বাসীয় খলিফার সহায়তায় ভলগা বুলগার রাষ্ট্র, যা পূর্ব থেকেই তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কৃষি ও অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ ছিল তার সব কিছুতে স্বয়ং সম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর হয়।

মুসলিমদের রাজনৈতিক পতন : ভলগাপারে ইসলামের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টধর্মেরও প্রসার ঘটে। ফলে আদি পৌত্তলিক উপজাতি, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ভেতর অত্র অঞ্চলের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণে যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। রুশ, রোমানসহ অন্যান্য বৃহৎ শক্তির আক্রমণের মুখে ১৩ শতকের পর বুলগার ও কাজান মুসলিমরা ক্রমেই শক্তিহীন হয়ে পড়ে। ক্রমাগত রুশ আগ্রাসনের মুখে ভলগা বুলগেরিয়ার দ্রুত পতন হলেও আরো প্রায় দুই শতাব্দীকাল টিকে থাকে কাজাররা। ১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে রুশ সাম্রাজ্যের কাছে স্বাধীনতা হারায় তারা।

কেমন আছে মুসলিমরা : সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর ভলগাপারের মুসলিমরা স্বাধীনতার জন্য নতুন সংগ্রাম শুরু করে। সোভিয়েত সরকার মুসলিমদের আন্দোলন দমনের নানামুখী নির্যাতনমূলক চেষ্টায় লিপ্ত হয়। এ সময় বহু মুসলিম হত্যা ও দেশান্তরের শিকার হয় এবং অমুসলিমদের অত্র অঞ্চলে স্থানান্তরিত করা হয়। মুসলমানের অবিরাম সংগ্রামের মুখে শেষ পর্যন্ত তারা স্বায়ত্তশাসন প্রদানে সম্মত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে ১৯৯৪ সালে তাতারস্তানের মুসলিমরা স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয়। কিন্তু তাতার নেতারা ১৯৯৪ সালে সম্পাদিত এক চুক্তির অধীনে রুশ ফেডারেশনে যোগ করেন। বর্তমান তাতারস্তানের আয়তন ৬৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার। রাজধানী শহর কাজান। জনসংখ্যার ৫৩.৮ শতাংশ মুসলিম। ভলগাপারের মুসলিমরা বর্তমানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ না করলেও স্বাধীনভাবে ধর্মপালনের সুযোগ পায় তারা।

তথ্যঋণ : সাউরেস ডটকম, ডাইয়োজেনেস (জার্নাল), প্রবন্ধ : জাওয়ানিবুল হায়াতিল ইকতিসাদি লি-বিলাদিল বুলগার মিন খিলালি রিহলাতি ইবনে ফাদলান।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments