Tuesday, May 21, 2024
spot_img
Homeধর্মকুকুর ও বিড়াল সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

কুকুর ও বিড়াল সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

কুকুর-বিড়াল মহান আল্লাহর মাখলুক। কোরআনের ভাষ্য মতে, পৃথিবীতে বিচরণশীল অন্যান্য প্রাণীর মতো তারাও আলাদা আলাদা জাতি। তাই মহান আল্লাহর মাখলুক হিসেবে তাদেরও কিছু অধিকার রয়েছে। তাদের অহেতুক কষ্ট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা যেহেতু মানুষের কাছাকাছি বাস করে, তাদের বিষয়ে ইসলামে কিছু নির্দেশনা দেওয়া আছে, যেগুলো মানা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হলো—

কুকুর-বিড়াল লালন-পালন : কুকুর অত্যন্ত বুদ্ধিমান একটি প্রাণী, বাড়ি-ঘর, গরু-ছাগল ইত্যাদি পাহারা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর বেশ দক্ষ। আসামি ও অবৈধ অস্ত্র খোঁজার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে। তাই শুধু পাহারা ও নিরাপত্তার কাজে কুকুর পালনের সুযোগ আছে, তা ঘরের বাইরেই রাখবে। তবে ইসলামে অহেতুক কুকুর পালনে নিরুৎসাহ করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পশু রক্ষাকারী কিংবা শিকারি কুকুর ছাড়া অন্য কুকুর পালে, তার আমল থেকে প্রতিদিন দুই কিরাত পরিমাণ সওয়াব কমে যায়। (বুখারি, হাদিস : ৫৪৮২)

উল্লেখ্য, এক কিরাত সওয়াব একটি ওহুদ পাহাড় সমপরিমাণ সওয়াবকে বলা হয়। কুকুর সঙ্গে থাকলে ফেরেশতারাও কাছে আসে না বলে হাদিসে পাওয়া যায়। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৫৫)

একবার ঘরে কুকুর অবস্থানের কারণে নবীজি (সা.)-এর ওহি আসা বন্ধ হয়েছিল। (মুসলিম, হাদিস : ৫৪০৬)

এমনকি নবীজি (সা.) কোনো পাত্র থেকে কুকুর পান করে ফেললে সে পাত্র পরিষ্কার করার জন্য সাতবার ধোয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, কুকুর কোনো পাত্রে মুখ দিলে তা সাতবার ধুতে হবে, প্রথম অথবা শেষবার মাটি দ্বারা ঘষতে হবে। বিড়াল যদি তাতে মুখ দেয় তবে একবার ধোয়াই যথেষ্ট। (তিরমিজি, হাদিস : ৯১)

তবে বিড়াল যেহেতু নাপাক নয়, তাই তা পালনে নিষেধাজ্ঞা নেই। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, বিড়াল নামাজ বিনষ্ট করে না। কারণ তা ঘরের জিনিসপত্রের অন্তর্ভুক্ত। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬৯)

কুকুর-বিড়াল ক্রয়-বিক্রয় : সাধারণত কুকুর-বিড়ালের ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। হাদিসে কুকুর-বিড়ালের ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। (মুসলিম, হাদিস : ৩৯০৭)

তবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের বিষয়টা ভিন্ন। কেননা হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, শিকারি কুকুর ছাড়া অন্যান্য কুকুরের বিক্রয়মূল্য নিতে নিষেধ করা হয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস : ১২৮১)

কুকুর-বিড়াল খাওয়া : কুকুর সরাসরি নাপাক ও হিংস্র প্রাণী হওয়ায় তার গোশত খাওয়া হারাম। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, সব ধরনের হিংস্র জন্তুই খাওয়া হারাম। (মুসলিম, হাদিস : ৪৮৮৬)

বিড়াল পালনের ক্ষেত্রে ইসলামে শিথিলতা থাকলেও সেটিও খাওয়া নিষিদ্ধ। জাবির (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিড়ালের গোশত খেতে এবং এর বিক্রয়মূল্য নিতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিজি, হাদিস : ১২৮০)

না জেনে কুকুর-বিড়ালের গোশত খেয়ে ফেললে : না জেনে কুকুর-বিড়ালসহ যেকোনো হারাম কিছু খেয়ে ফেললে পরে আল্লাহর কাছে খাঁটি দিলে তাওবা করতে হবে। আর ভবিষ্যতের জন্য এ ধরনের খাবার থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করবে। (তিরমিজি, হাদিস : ১৮৬২, মিরকাত : ৬/২৩৮৬)

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দ্বারা শিকার করা প্রাণী খাওয়া : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, তারা তোমাকে প্রশ্ন করে, তাদের জন্য কী বৈধ করা হয়েছে? বলে দাও, ‘তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে সব ভালো বস্তু এবং শিকারি পশু-পাখি, যাদেরকে তোমরা শিকার প্রশিক্ষণ দিয়েছ; সেগুলোকে তোমরা শেখাও, যা আল্লাহ তোমাদেরকে শিখিয়েছেন। সুতরাং তোমরা তা থেকে খাও, যা তোমাদের জন্য ধরে এনেছে এবং তাতে তোমরা আল্লাহর নাম স্মরণ করো আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৪)

তাফসিরের কিতাবে আছে, এখানে প্রশিক্ষিত শিকারি জন্তুর শিকার করা পশু-পাখি দুটি শর্ত সাপেক্ষে খাওয়া হালাল বা জায়েজ।

(ক) শিকারে প্রেরণ করার পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে।

(খ) শিকারি পশু শিকার করা জিনিস (পশু বা পাখি) মালিকের জন্য রেখে দেবে এবং তার অপেক্ষা করবে; নিজে তা ভক্ষণ করবে না। যদিও সে শিকারকৃত পশু বা পাখিকে মেরে ফেলেছে, তবু তা খাওয়া হালাল এই শর্তে যে, সে যেন শিকারের ব্যাপারে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয় এবং তাকে প্রেরণ করার সময় তার সঙ্গে অন্য কোনো পশু শরিক না থাকে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আদি ইবনে হাতিম (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা এমন সম্প্রদায়, যারা কুকুরের দ্বারা শিকার করে থাকি। তিনি বলেন, তুমি যদি তোমার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরগুলোকে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে পাঠিয়ে থাকো তাহলে ওরা যেগুলো তোমাদের জন্য ধরে রাখে, তা খাও; যদিও শিকারকে কুকুর হত্যা করে ফেলে। তবে যদি কুকুর শিকারের কিছুটা খেয়ে ফেলে (তাহলে খাবে না)। কেননা তখন আমার আশঙ্কা হয় যে, সে শিকার নিজেরই উদ্দেশ্যে ধরেছে। আর যদি তার সঙ্গে অন্য কুকুর মিলে যায়, তাহলে খাবে না। (বুখারি, হাদিস : ৫৪৮৩)

কুকুর-বিড়ালের প্রতি দয়া : কুকুর নাপাক প্রাণী হলেও দূরত্ব বজায় রেখে তার প্রতি দয়া করা নিষিদ্ধ নয়। ক্ষুধার্ত কুকুরকে খাওয়ানো নিন্দনীয় নয়। হাদিসে এসেছে, কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক ব্যভিচারী নারী ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছে। (বুখারি, হাদিস : ৩৩২১)

আবার বিড়ালকে আটকে রেখে খাবার না দিয়ে শাস্তি দেওয়ার কারণে এক নারীকে আজাব দেওয়া হয়েছে। (বুখারি, হাদিস : ৩৪৮২)

তবে অসহায় মানুষের চেয়ে কুকুর-বিড়ালের প্রতি অতিরিক্ত দয়া দেখানো অপ্রত্যাশিত।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments