Monday, November 28, 2022
spot_img
Homeআন্তর্জাতিককলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎকে একহাত নিলেন মানবাধিকারকর্মী

কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎকে একহাত নিলেন মানবাধিকারকর্মী

সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎকে তার দেওয়া একটি বেসরকারি চ্যানেলের সাক্ষাৎকার ইস্যুকে টেনে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক শুভাশিস ঘোষ একহাত নিলেন। ভারতবর্ষের বিচার ব্যবস্থার নানা দূর্বলতা উল্লেখ করে তার দেওয়া সাক্ষাৎকারের মিথ্যা বানোয়াট সততার পিঞ্জর একেবারে ভেঙ্গে দিয়েছেন বর্ষিয়ান সাংবাদিক শুভাশিস ঘোষ। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাতেও বর্তমানে অনিয়ম, দলবাজী ও ক্ষমতার নজীর দেখা যাচ্ছে ভুরিভুরি। নি¤েœ কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গাঙগুলী বরাবর মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক শুভাশিস ঘোষের চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

মাননীয়
শ্রী অভিজিৎ গাঙ্গুলী সমীপেষু
বিচারপতি,কলকাতা হাইকোর্ট
মহাশয়

অধম একজন অতি সাধারণ নাগরিক। যদিও আগামী দিনে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত নাগরিক আইনের আওতায় অধমের নামটি ডি তালিকা ভুক্ত হবে কিনা জানা নেই। তাই যতদিন না সেই ভারতীয় নাগরিক শর্তটি হারাচ্ছি ততদিন নিজেকে একজন যোগ্য এবং সৎ নাগরিক হিসাবে প্রতিপন্ন করি যেমনটা আপনি করেছেন। এখন আপনি এই রাজ্যের লাখকোটি মানুষের চোখে অরণ্যদূত, মসীহা, রবিনহুড। আপনাকে নিয়ে এখন ঘরে ঘরে আলোচনা কত কথা। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের দুর্নীতি দমনে আপনার প্রকাশিত পর্যবেক্ষণ এই মুহূর্তে আপনাকে বিচার ব্যবস্থার আইকোন হিসাবে তুলে ধরেছে। মনে হচ্ছে কলকাতা হাইকোর্টে একমাত্র সৎ আদর্শবান বিচারপতি একমাত্র আপনি। বাকি সবাই নপুংসক। আপনাকে দেখে দেশের বিচার ব্যবস্থার কি করুন দশা সেটা আরও একবার অবলোকন করলাম। এই দেশে বিচার ব্যবস্থায় সংশোধন ও সংস্কারের কথা বহুদিন ধরেই উঠেছে। এই নিয়ে বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠন রাস্তায় নেমে আন্দোলনও করেছে। যদিও সেই আন্দোলনের ফলে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার কতটা পরিবর্তন হয়েছে তা একমাত্র তারাই বলতে পারবেন যাদের প্রতিদিন কোর্টে যেতে হয়। মাননীয় আপনাকে সম্মান জানিয়েই বলছি, আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার জায়গাটি হল মানুষের নির্যাতনের সবচেয়ে বড় জায়গা। এখানে টাকা না ঢাললে বিচার পাওয়া যায় না। আবার বেশি দিতে পারলে রায়টাও নিজের কুলে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। নাহলে একেকজন উকিল মামলা ধরলে একলাখ দু লাখ কেউ তিন লাখ পর্যন্ত নিয়ে থাকেন, কেন? শুনে খুশী হবেন, অনেকে প্যাকেজ সিস্টেমেও কাজ করে থাকেন। আর এই সবই হয় বিনা নথিতে। আজ পর্যন্ত শুনিনি কোন আইনজীবি রসিদ কেটে তার ফিস নিয়েছেন। একজন মানবাধিকার কর্মী হিসাবে দেখেছি বিপদে পড়া অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষত আইন না জানা মানুষের পক্ষে আদালতে গিয়ে কতটা নাস্তানাবুদ হতে হয়। যেখানে টাকা দিয়ে ভুক্তভোগীর আইনজীবিকে কিনে নেওয়া থেকে জাজকে ম্যানেজ সবটাই চলতে পারে। যদিও এসবের কোন নথি এই মুহূর্তে হাতে নেই বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া।
এবার আসি আসল কথায় আপনি সম্প্রতি এমন একটি চ্যানেলে বসে আপনার সাক্ষাতকার দিয়েছেন যারা ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কিছু নয়। বরং ভাল হতো এবং অনেক শ্রেয় হতো এটা যদি আপনি সোস্যাল মিডিয়ায় সরাসরি নিজের বক্তব্যগুলো পোষ্ট করতেন। আপনি নিজেকে সততার প্রতীরূপ বলে প্রতিপন্ন করতে গিয়ে একটা বে-সরকারী সংবাদ মাধ্যমের টিআরপি বাড়িয়েছেন এবং এর ফলে তাদের আয়ের উৎস আরও বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলা যায়। আপনি কি এটা নীতিগতভাবে ঠিক করেছেন? একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন।
মাননীয় মহামান্য আপনি যতই নিজেকে সততার আকাশচুম্বী হিসেবে দেখান না কেন, আসলে আপনি কিন্তু একজন মানুষ। তাই যে চ্যানেলে বসে আপনার ইন্টারভিউ দিয়েছেন সেই চ্যানেল কর্তারা আপনাকে কত টাকায় এই কাজটি করতে রাজি করিয়েছে সেই প্রশ্নটি কিন্তু উঠবে। আপনি টেট দুর্নীতির একজন বিচারক। আপনার ক্ষমতা কতটা সেটা আপনি ভালই জানেন। যেখানে হাইকোর্টের একজন জ্যাস্টিস হিসাবে আপনি তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন এবং তদন্তের গতি অগ্রগতি সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। অভিযুক্তদের বিচার পর্বটা কিন্তু নিম্ন আদালতেই হবে। যেমনটা হয়েছিল ধর্ষনকান্ডে অভিযুক্ত সাজা প্রাপ্ত ধনঞ্জয় ফাঁসির মামলা। সেদিন গোটা পৃথিবী দেখেছিল রাষ্ট্র ও প্রতাপ দুটো জিনিস থাকলে কিভাবে একজন গরীবকে ফাঁসিয়ে তাকে খুন করা যায়। আপনি নিশ্চয় জানেন এই মুহূর্তে আমাদের দেশের প্রায় ষোলোজন লেখক শিল্পী সাহিত্যিক বিজ্ঞানী জেলে বন্দি। যাদের রাষ্ট্র মাওবাদী বলে দাগিয়ে দিয়ে জেলে ভরে দিয়েছে আজ পর্যন্ত যে মামলার শুনানী হয় না। যে বিচার ব্যবস্থার একজন ধারক ও বাহক হয়ে আপনি বেসরকারি মুনাফাখোর ব্যক্তি পুঁজির মালিকানাধীন একটা চ্যানেলে বসে যখন সততার বড়াই করছিলেন তখন মনে পড়ে যাচ্ছিল জ্যাস্টিস লোয়ারের কথা। যে সত্য উদ্ঘাটন করতে চেয়ে রহস্য জনকভাবে খুন হয়ে গেলেন। ভয় নেই আপনি এমন একটা রাজ্যে বিচারপতির চাকরি করছেন যে রাজ্যের মানুষ ভদ্র সভ্য ও সংস্কৃতিবান। এখানে এমন একটা সরকার আছে যারা এই সাক্ষাতকার শোনার পরেও এখনো বলেনি বিচারপতি অভিজিৎ তুই বাংলা ছেড়ে পালা। সেদিন কিন্তু বামেরা এই রাজ্যের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বলেছিল “লালা তুই বাংলা ছেড়ে পালা” অবশ্যই এরজন্য এই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারটাকে আপনার ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। আপনি মাননীয় একজন ল’ইয়ারের নাম করে বলেছেন তার কাছ থেকে আপনি আইনটা ভালভাবে শিখেছেন। সম্ভবত তিনি আইনের পাঠশালা দিতে গিয়ে ভদ্রতা সভ্যতা এটা শেখাতে আপনাকে ভুলে গেছিলেন যেখানে বিচার শুরু এবং শেষ না হওয়া পর্যন্ত একজন মানুষকে চোর চোর বলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করা যায় না। এরজন্য প্রয়োজনে কঠোর নির্দেশ পুলিশকে বা তদন্তকারী সংস্থাকে দিতেই পারতেন। সেটা না করে আপনি অভিযুক্তকে কলার ধরে নিয়ে আসার নির্দেশ দিচ্ছেন আপনি একজন গরুপাচারে অভিযুক্ত’র মেয়েকে হঠাৎ কোর্টে ডেকে পাঠালানে আবার সেই নির্দেশ যে কান্ডজ্ঞানহীন হয়েছে এটা বুঝেই সেই নির্দেশ বাতিল করলেন। এতে একজন মানুষের কতটা মানবাধিকার লঙ্ঘিত হল সেটা বোধহয় আপনার মত জ্ঞানী মানুষকে বলার প্রয়োজন নেই। যেখানে জ্যাস্টিস ডিকে বাসুর মানবাধিকার সম্পর্কিত একাধিক গাইডলাইন আছে যা আপনার কথায় ভায়োলেশন করে।
আপনি অনেক কথা বলেছেন, যার প্রতিটি কথা বিচার ব্যবস্থার কংকঙ্কাল সার চেহারাটাকেই তুলে ধরছিল। একটা ছোট্ট অভিজ্ঞতা শেয়ার করি, আমার জীবনে এমন ঘটনা দেখেছি শুধুমাত্র টাকা আর রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে একজন নিরীহ ব্যাক্তিকে শ্লীলতাহানী রেপ কেসে ফাঁসিয়ে জেলে ভরে দেওয়া হয়। বিচারক তাকে জেলে ভরে দিলেন শুধু পুলিশের কথায়, আর সেদিন কিছু প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম তাকে ঢালাও করে প্রচার করে দিল। যেখানে সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো মানুষটি মাসাধিককাল জেল খেটে বেরিয়ে এতটাই ডিপ্রেসানে চলে যায় যে তার অকালে মৃত্যুও দেখতে হয়। আপনি এমন একটা বিচার ব্যবস্থার অঙ্গ যার রন্ধে রন্ধে দূর্নীতি পাপাচার। জানি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করাটা অন্যায় কিন্তু তৎ সত্বেও করছি কারণ সেই সাহসটা আপনি যুগিয়ে দিলেন। সত্যি আপনি এই রাজ্যের বিচারক না হলে আমাদের মুখের ভাষা এত তীব্র হত না। যেখানে নির্ধিদ্বায় বলছি বিচারকদের একাংশ ঘুষখোড়, যারা তাদের নির্দিষ্ট কিছু পেটোয়া ল’ইয়ারের কাছ থেকে ঘুষ নেন এবং টাকার বিনিময় রায় দেয়। আপনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেলে ভরার হুমকি দিচ্ছেন যে মানুষটাকে তার সংসদীয় এলাকার মানুষ সাড়ে তিনলাখ ভোটে জিতিয়েছে। আপনি তো ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের উর্ধে। আপনার জানা আছে নিশ্চয় কাউকে জেলে ভরলে তার জন্য বিচার চেয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়া যায়। সেখানে এমন এমন আইনজীবিরা আছেন যাদের সামনে বিচারপতিদের প্যান্ট পর্যন্ত খুলে যায়। আচ্ছা আপনি অভিষেককে জেলে ভরার হুমকি দিলেন কই হাইকোর্টের বার কাউন্সিলের সভাপতি তথা বলিষ্ঠ ল’ইয়ার অরুনাভ ঘোষকে তো জেলে ভরার হুমকি দিলেন না, যিনি একাধিকবার সোস্যাল মিডিয়ায় আপনার নাম ধরে গালমন্দ করেছেন। শুধু তাই নয় প্রকাশ্যে আপনাকে ল্যাংটা করার পর্যন্ত হুমকি দিয়েছেন। অরুনাভবাবু তো এজলাসে দাঁড়িয়ে আপনাকে আইন জানেন না বলে কটাক্ষ করেছেন। কই তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কথা ভাবলেন না কেন? বর্তমানে সিপিএম কংগ্রেস এক জায়গায় আছে বলে? কিছু মনে করবেন না সততার নির্দশন যদি এরকম হয় তাহলে সেটা যে বমি ওঠার সামিল তা বলাই বাহুল্য। আপনি অনেক আইন জানেন শিখেছেন। আপনি তাদের কয়েকজনের নামও নিয়েছেন কিন্তু আমার মনে হয় অভিমূন্যের চক্রবূহ্য ভেদের মত আপনাকে বেরিয়ে যাওয়াটা শেখায়নি যেটা হল একজন বিচারপতির প্রশ্নাতীত নিরপেক্ষতা। আপনি বলেছেন ভবিষ্যতে রাজনীতি করার ইচ্ছা আছে। যে কারণে এখন থেকে তার ফিল্ড তৈরি করছেন। শুধু দলটার নাম বলতে দ্বিধা করেছেন। আমি বলে দিচ্ছি ভারতীয় জনতা পার্টি। ভুলেও লালে যাবেন না তাহলে অরণ্যদুত থেকে হার্মাদ হয়ে যাবেন। নমস্কার নেবেন, পাড়লে আমাকে জেলে ভরে দিতে পারেন।
শুভাশিস ঘোষ, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments