ইমন ইসলাম

করোনা মহামারি সাধারণ মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে স্থবিরতা। মানুষের জীবনে যে চঞ্চলতা, ক্ষিপ্রতা, উৎসাহ, আনন্দ ছিল-এর গতি কমিয়ে দিয়েছে। মানুষে মানুষে যে সহানুভূতিশীল মনোভাব, যে আত্মার সম্পর্ক ছিল-সেই সম্পর্কের মাঝে তুলেছে দেওয়াল। মানুষের জীবনে এনেছে বিশাল পরিবর্তন। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করেছে করোনাভাইরাস। দৈনন্দিন প্রয়োজনে এবং জীবিকানির্বাহের তাগিদে মানুষকে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। অথচ করোনা মহামারি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করেছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা সুস্থ-স্বাভাবিক সমাজ গঠনে সহায়ক নয়।

দেশের সিংহভাগ মানুষ নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। নিম্ন আয়ের মানুষ বিভিন্ন ছোটখাটো কর্মের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করে থাকে। করোনা মহামারির কারণে মানুষের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে অসংখ্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। অনেক সাধারণ কর্মজীবী মানুষ কাজ হারিয়ে পথে বসতে বাধ্য হয়েছেন। বেকার হয়ে পড়েছেন অনেকে। তাদের পরিবারে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। আর্থিক অনটনে দারিদ্র্য বাড়ছে।

করোনা মহামারির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে জম্ম নিয়েছে অশিক্ষা, অনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ নানা অসামাজিক কার্যকলাপ। দীর্ঘদিন দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় উচ্চশিক্ষায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা। তাদের কেউ টিউশন করে, কেউবা পার্টটাইম কাজ করে পড়াশোনার খরচ জোগাড় করে এবং অনেকে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে থাকায় শিক্ষার্থীরা যেমন আর্থিক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, তেমনি তাদের পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সরকার শিক্ষার্থীদের অনলাইনভিত্তিক পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিলেও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা ল্যাপটপ ও ব্যয়বহুল ইন্টারনেটের কারণে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। আবার স্কুল-কলেজের শিশু শিক্ষার্থীরা অত্যধিক অনলাইন ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেকে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে। এতে সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে।

সামাজিক ক্ষেত্রে করোনার প্রভাব ব্যাপক। হাত মেলানো, কোলাকুলি করা ইত্যাদি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু মানুষ এখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে কোলাকুলি করা, হাত মেলানো থেকে বিরত থাকছে। বস্তুত এক অদৃশ্য শক্তির কাছে হার মানতে বসেছে আমাদের সমাজ ও বাস্তবতা। সবকিছু মিলে মহামারি করোনা আমাদের জীবনযাত্রাকে করেছে আরও জটিল। তবুও আমরা আশাবাদী, করোনা যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করব এবং নতুন একটি সমাজজীবন গঠন করব। করোনামুক্ত সমাজে আবার নতুন করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সূচনা হবে, এটাই আমাদের কামনা।

ইমন ইসলাম : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English