Saturday, July 20, 2024
spot_img
Homeজাতীয়এ ব্যর্থতার দায় কার

এ ব্যর্থতার দায় কার

বাংলাদেশ পুলিশকে ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের উপযোগী করে গড়ে তোলায় আগ্রহ ব্যক্ত করেছে সরকার। এ পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর কিছু উদ্যোগ ও গ্রহণ করা হয়েছে। এর জন্য পুলিশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবট, ড্রোন ইত্যাদি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়নে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা একদিকে যেমন আনন্দের অন্যদিকে তা হতাশার। কারণ এত ধীরগতির কর্মপরিকল্পনা অবশ্যই সময়োপযোগী নয়।

এ পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার এবং আইন কাঠামো সংস্কার পরিকল্পনার। বাংলাদেশের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার) পুলিশ সপ্তাহ ২০২২ (চতুর্থ দিনে) এর সম্মেলনে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো- এ সুপারিশগুলোকে নিতান্তই বিভাগীয় বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিগণ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ, সকল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারগণ এতে অংশগ্রহণ করে মাঠ পর্যায়ের সমস্যা, সংকট ও চাহিদাগুলোকে তুলে ধরেন। উন্নত দেশের উপযোগী পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বাসনা এ দেশে কখনোই কার্যকর হবেনা যদি না রাজনৈতিক ভাবে সুশাসন প্ৰতিষ্ঠা ও পুলিশের আধুনিকায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হয়. জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে পুলিশকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু আইনের কিছু ধারা উপধারাকে সংযোজন বা বিয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়ন অর্জিত হবে না ।

প্রথমত দেশের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে পুলিশের আধুনিকায়নে সেবা সেক্টরকে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা ওয়ার্ডে বিট পুলিশিং কার্যালয় স্থাপন, সাইবার অপরাধ দমনে স্বতন্ত্র সাইবার ইউনিট প্রতিষ্ঠা, দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিবেদিত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসার সুবিধার্থে আলাদা মেডিকেল সার্ভিস গঠন, অনলাইন জিডি নেওয়াকে আরও সহজতর ও বিস্তৃত করা, জনগণের আইনি সহায়তাকে আরও সুগম করার লক্ষ্যে সার্কেল অফিসের কার্যক্রমগুলো বেগবান করা, পুলিশ সদস্যদের আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, শক্তিশালী মনিটরিং ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা চালু করা, হাইওয়ে পুলিশকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তোলা এখনই অত্যাবর্ষকীয়। এতে দীর্ঘসূত্রিতা বা সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।

মধ্যযুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত পুলিশিং কার্যক্রম কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত হয়ে আসছে যেমন- মহান সুলতানদের আমলে, মুহতাসিবের পদে অধিষ্ঠিত একজন কর্মকর্তা পুলিশিংয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। ওই ব্যক্তি ছিলেন পুলিশ প্রধান, পাবলিক ওয়ার্কস এবং একই সাথে পাবলিক নৈতিকতার একজন পরিদর্শক। এছাড়াও শহরাঞ্চলগুলোতে কোতোয়ালরা পুলিশের দায়িত্ব পালন করতেন।


শের শাহ সুরি প্রবর্তিত পুলিশিং ব্যবস্থা সম্রাট আকবরের আমলে আরও সংগঠিত হয়েছিল- সম্রাট ফৌজদারী (সম্রাটের প্রধান প্রতিনিধি), মীর আদল এবং কাজী (বিচার বিভাগীয় প্রধান) এবং কোতোয়াল (বিচার বিভাগের প্রধান) প্রবর্তন করে প্রশাসনিক কাঠামোকে সংগঠিত করেছিলেন বড় শহরগুলির প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা)। এ ব্যবস্থা শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ছিল এবং ঢাকায় ও তা প্রয়োগ করা হয়েছিল। অনেক জেলা সদর থানা এখনো কোতোয়ালি থানা বলা হয়। মুঘল আমলে কোতোয়াল একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয়।

সরকারের প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটে (জেলা) একজন ফৌজদার নিয়োগ করা হয়েছিল, যাদের অধীনে কিছু কামান এবং অশ্বারোহী বাহিনী ছিল। মুঘল আমলে একটি সুশৃঙ্খল পুলিশ ব্যবস্থা ছিল, যদিও ব্রিটিশ আমলে সেরকম পেশাদার কোনো পুলিশ বাহিনী ছিল না।

ব্রিটিশ আমল (১৮৫৭-১৯৪৭) শিল্প বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায়ে, আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের কারণে ইংল্যান্ড যখন গুরুতর সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল, তখন একটি কার্যকর সংগঠিত পুলিশ পরিষেবার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব হয়েছিল। স্যার রবার্ট পিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করেছিলেন যা লন্ডনে একটি সংগঠিত সিভিক পুলিশ তৈরি করেছিল। সামাজিক ব্যাধি এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে লন্ডন পুলিশের সাফল্য শুধুমাত্র ইংল্যান্ডের জনগণই নয়, ইউরোপীয় ও আমেরিকার দেশগুলোর দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল: ১৮৩৩ সালে প্রথম মিউনিসিপ্যাল পুলিশ ফোর্স সংগঠিত করার সময় নিউইয়র্ক শহর কিছু পরিবর্তনের সাথে লন্ডন মডেলটি অনুলিপি করেছিল।

১৮৫৮ সালে, ব্রিটিশ সরকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ভারতীয় ভূখণ্ডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ১৮২৯ সালে পিলস অ্যাক্ট এর অধীনে সংগঠিত লন্ডন পুলিশের সাফল্য ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ কনস্ট্যাবিউলারি এর মতো উপমহাদেশে পুলিশ ব্যবস্থা সংস্কার করতে প্ররোচিত করে। এ লক্ষ্যে, ১৮৪০ সালে একজন পুলিশ কমিশনার স্থাপন করা হয় এবং পুলিশ আইন (১৮৬১ সালের আইন) কমিশনের সুপারিশে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তা পাশ হয়। এই আইনের অধীনে ব্রিটিশ ভারতের প্রতিটি প্রদেশে একটি পুলিশ বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল এবং প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে তা রাখা হয়েছিল। একটি প্রদেশের পুলিশ বাহিনীর প্রশাসন পুলিশের ইন্সপেক্টর-জেনারেল হিসাবে স্টাইল করা একজন অফিসারের উপর ন্যস্ত ছিল। একটি জেলায় পুলিশ প্রশাসনকে পুলিশ সুপারের অধীনে রাখা হয়েছিল । আইনটি এখনও উপ-মহাদেশ জুড়ে বলবৎ রয়েছে, এবং বাংলাদেশের পাশাপাশি উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে ও একইভাবে পুলিশের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

পাকিস্তান সময়কাল (১৯৪৭-১৯৭০) ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির পর, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীকে প্রথমে পূর্ব বাংলা পুলিশ এবং পরে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ হিসাবে নামকরণ করা হয়; যাইহোক, এটি ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকে একই লাইনে কাজ করতে থাকে (তথসূত্র: উইকিপিডিয়া)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেয়ার মতো গৌরবময় এক ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় পুলিশি প্রতিরোধ। স্বাধীনতাত্তোর নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে এ বাহিনী তাদের কর্তব্য পালন করে আসছে । পুলিশকে যখন আমরা উন্নত কোনো দেশের উপযোগী করে গড়ে তোলার কথা বলি তখন আমাদের অবশ্যই সে দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক মর্যাদা, মূল্যবোধ, অর্থনীতি ও আইনের শাসনসহ অনেক কিছুই বিবেচনায় নিতে হয়।
 
কানাডাজুড়ে ৬০,০০০ পুলিশ কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে কানাডিয়ান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ)। কানাডাজুড়ে ১৬০টি পুলিশ পরিষেবায় কর্মরত রয়েছেন পুলিশ কর্মীরা, কানাডার ক্ষুদ্রতম শহর ও গ্রাম থেকে শুরু করে বৃহত্তম পৌরসভা এবং প্রাদেশিক পরিষেবাগুলোতে পুলিশেও তাদের সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৷ কানাডিয়ান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় কেন্দ্র হিসাবে ভূমিকা রাখে এ অ্যাসোসিয়েশন। সমষ্টিগত দরকষাকষি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং সদস্যদের অধিকার রক্ষায় তাদের নিজস্ব সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব এবং শর্তাবলী সফলভাবে উন্নত করতে সদস্য ও সমিতিগুলি যৌথভাবে কাজ করে। আইন প্রয়োগ ও ন্যায়বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে, সিপিএ সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রচার করে। পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন গুলি যুব ফৌজদারি বিচারের মতো বিষয়গুলোর আলোচনায় অবদান রাখে; শিশু পর্নোগ্রাফি; প্রতিবন্ধীদের ড্রাইভিং; সাজা, সংশোধন, প্যারোল সংস্কার; জাতীয় যৌন অপরাধী রেজিস্ট্রি; অপরাধমূলক সাধনা; সংগঠিত অপরাধ; এবং পুলিশিংয়ে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, যেমন- ডিএনএ পরীক্ষা এবং কানাডিয়ান পুলিশ ইনফরমেশন সেন্টার পরিচালনা করে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বাংলাদেশ পুলিশ অন্যান্য দেশের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে তাদের দায়িত্ব পালন শুরু করে। দেশে জঙ্গিবাদ দমন ও নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে এবং জাতিসংগ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে ও বেশ সুনাম কুঁড়িয়েছে। একসময়ে ঘুষ-দুর্নীতির কারণে অভিযুক্ত এ বাহিনী এখন দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্বের দাবিদার। দেশে পুলিশিং এর জন্য পর্যাপ্ত এবং ন্যায়সঙ্গত সম্পদ বরাদ্ধ প্রয়োজন। দেশের আইনশৃঙ্খলা জনিত মূল জাতীয় সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া দরকার । পুলিশ কর্মীদের প্রশিক্ষিত ও প্রভাবিত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশিং সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগকে আরো জোরদার করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে আলাদা একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি বাস্তবায়ন সহ পুলিশ বাহিনীকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ সপ্তাহ ২০২২-এর পঞ্চম ও সমাপনী অধিবেশনে (গত বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি) জানিয়েছেন। মন্ত্রী আরো জানান সরকার পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে ৮২ হাজার জনবলের পুলিশ বাড়িয়েছে এরমধ্যে নৌপুলিশ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, পিবিআই, সিটিটিসি ও এটিইউ সহ নতুন কতগুলো ইউনিট যোগ করা হয়েছে। জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে বিশ্বে একটি মডেল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ।

পুলিশকে উন্নত দেশের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে তাদের দক্ষতা, সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণসহ যা যা প্রয়োজন তা প্রদান করতে হবে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানো ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় আন্তঃবাহিনী কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন করতে হবে। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায়ভার বাংলাদেশ পুলিশের নয় বরং এ দায়ভার আমাদের রাজনীতির।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments