Tuesday, July 16, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামএটা কি চিরকালীন ব্যবস্থা?

এটা কি চিরকালীন ব্যবস্থা?

এ বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক ধরনের ‘গায়ের জোরে’ সম্পন্ন করতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকার; তবে সারা দুনিয়ার মানুষ তা জানতে পেরেছে এবং বেশির ভাগ রাষ্ট্রই আওয়ামী লীগ সরকারের এই একটানা চার টার্ম (ষোলো বছর পেরোতে চলেছে) স্বৈরাচারী-শক্তির মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠানকে ভালো-চোখে দেখেনি, দেখছে না।

এবার নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা গণতন্ত্রী দলগুলো সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে, দল-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিচালনায় প্রকৃত অংশগ্রহণমূল নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সে আন্দোলন প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ ও তার সরকার চরম কর্তৃত্ববাদী রূপে আবির্ভূত হয়ে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল কঠোর-হাতে দমন করতে লাগল, তারা অসংখ্য বিএনপি নেতাকর্মীকে মিথ্যা-মামলা দিয়ে কারাবন্দি করে রাখে। আর কারাগারগুলোকে নরক-পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, যাতে সব কারাবন্দি চোখে অন্ধকার আর নরক দেখে। পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ এসব পেটোয়া বাহিনীগুলো বিএনপি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাতীয়তাবাদী যুবদল, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর পরিণামে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশের সামান্যতম চিহ্নও বিলীন হয়ে যায়। আর কারাগারগুলোতে ধারণ-ক্ষমতার বাইরে এসব রাজনৈতিক কারাবন্দির চাপে নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ সরকার অত্যন্ত নিষ্ঠুর হয়ে, নিদারুণ অমানবিক স্বভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতি নির্মম আচরণ করেছে, যা ছিল বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ভেতরে সবচেয়ে নজিরবিহীন ঘটনা। প্রতিটি কারাগারে রাজবন্দিদের ওপরে এমন অত্যাচার আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সমগ্র বিশ্বের সচেতন মানুষ কারাবন্দিদের ওপর এসব নির্দয় আচরণ সম্পর্কে জানতে পেরেছে, প্রচণ্ড নিন্দা করেছে। কিন্তু আমাদের সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কারও কোনো নিন্দা-ঘৃণা প্রকাশের ঘটনা পাত্তাই দেয়নি। তাদের ভাবখানা এমন-‘বিএনপির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের নেতাকর্মীদের গলা টিপে ধরাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র উপায়, তাই-কে কী বলল তাতে আওয়ামী লীগ বা তার সরকারের কিছুই যায় আসে না।’ উলটো আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে গলা-ফাটিয়ে চিৎকার করে তা সত্য বলে চালাতে চাচ্ছে-দেশবাসীকে ধোঁকা দিচ্ছে। দেশের বর্তমান ক্ষমতাধর গোষ্ঠী বিএনপির সংগঠক ও কর্মীসহ বিরোধী-দলের সবাইকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছে, দুনিয়ার মানুষের সামনে প্রমাণ করতে চেয়েছে-বিএনপি একটি অগণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসবাদী, হিংস্র-মানুষের রাজনৈতিক দল। সরকারের মন্ত্রীরা, আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতারা (এমনকি পেটোয়া বাহিনীর নেতারাও) এমন মিথ্যাচার করেছেন, যা বিশ্বের সভ্য-সমাজের মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করাই কঠিন। এসবের ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসাবে তার সুনামহানির শিকার হয়েছে।

৭ জানুয়ারির তথাকথিত জাতীয় নির্বাচনে ভোট পড়েনি পাঁচ শতাংশ, কিন্তু জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে ১০/১২ গুণ বেশি দেখিয়ে চালিয়ে দিল দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিভিন্ন পক্ষ হয়ে নির্বাচন করে সব-প্রার্থী ‘আমি আর ডামি’ (‘আমরা আর মামুরা’) স্টাইলে নির্বাচনটা সেরে ফেলল; আর তারপর আওয়ামী লীগ নেতারা সারা দুনিয়ার কাছে মিথ্যা কথা বলল-নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, জনগণ অংশগ্রহণ করেছেন উৎসবের মেজাজে। ক্ষমতাবান দলটির সুপরিকল্পিত এ প্রক্রিয়া সফল হলে তারা সবাই জিতবেন, সেটা তো জানাই ছিল, ভোটারবিহীন জাল-জালিয়াতির নির্বাচনে তারা ছাড়া আর জিতবে কে? অতএব, তারা জিতলেন এবং কিছু পুরোনো মন্ত্রীকে বাদ দিয়ে কিছু নতুন মুখ বসিয়ে তথাকথিত মন্ত্রিসভা গঠিত হলো (বলা চলে, পুর্নগঠিত হলো)। ফলে নতুন মন্ত্রিসভা দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সুরাহা করে বাজার-দর কোটি কোটি দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সহনীয় পর্যায়ের অবস্থায় রাখার নিশ্চয়তা বিধানের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করছে না। মন্ত্রিসভা সদস্যদের মাঝে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী রয়েছেন অনেকে, এমপিদের মধ্যে ধনবান-ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রচুর-এসব ব্যক্তির নিজের ও পরিবার-সদস্যদের সম্পদ বেজায়-রকম বাড়ানোর লালসা সবারই চোখে দৃশ্যমান। তারা কোটি কোটি হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নাগরিকদের অপরিসীম দুঃখ-দুর্দশা বোঝার, উপলব্ধির সময়ই পান না। বরং তারা আছেন নিজের নিজের, নিজ নিজ পরিবার-পরিজনের অর্থ-সম্পদ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় জেতার যুদ্ধে। আওয়ামী লীগ নেতা-সংগঠক ও কর্মীদের এসব অনাচার দেখে অর্থ-লালসায় উন্মাদ হয়ে আমলারাও নিজ আখের গোছাতে ব্যস্ত।

এসব ঘটনার পরিণাম হচ্ছে-মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার লড়াইয়ের সব অর্জন গেছে বিসর্জনে। সুশাসন কোথায়? কেউ কি সুশাসন এখন চান? সে তো এখন ‘মরি অসম্ভবের পায়ে মাথা কূটে’।

তাহলে আওয়ামী লীগ দল ও তার সরকার যে বড় বড় বুলি ছাড়ে উন্নয়নের, মানুষের কল্যাণের কর্মকাণ্ডে সাফল্যের আত্মম্ভরিতায় দিশাহারা হয়ে নিজ নিজ বগল বাজাতে বাজাতে উন্মাদ, সেসবের কী হবে! অবশ্যই মানছি দেশের সবগুলো বিরোধী রাজনৈতিক দলের পরিচালনা প্রক্রিয়ায়, স্বৈরতন্ত্রবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মত্যাগে বেশকিছু ভুল রয়ে যাচ্ছে। সেটা থেকে গণজাগরণে, গণঅভ্যুত্থানে উত্তরণ ঘটাতে হবে-এ রাষ্ট্রের আসল উন্নয়ন কাজের সাফল্য অর্জনে। স্মরণ রাখা দরকার, আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে অঙ্গীকার করে এসেছি-এদেশে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করবে না, এদেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, সরকার ও প্রশাসন পরিচালনা চলবে শতভাগ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, সুশাসন কায়েম হবে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে। কিন্তু সরকারি দল ও খোদ সরকার সেসব অঙ্গীকার ভুলে গেছে। তারা বেজায় রকম চাপাবাজি করে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করে যাচ্ছে দিন-রাত-‘আওয়ামী লীগ ও তার সরকার রাষ্ট্র ও দেশবাসীর উন্নয়নে জানবাজি লড়াই চালাচ্ছেন আর গণতন্ত্রও কায়েম হয়ে গেছে, দেশের মানুষ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে।’

কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। উন্নয়নের সুফল দেশবাসীর আশি শতাংশ মানুষই ভোগ করতে পারে না। তারা দুর্ভোগে ভুগতে ভুগতে সর্বস্বহারা প্রায়। তবে তারা ভালো আছেন, যারা রাষ্ট্রের অর্থনীতি লুণ্ঠন করতে পেরেছেন-ক্ষমতার ভেতরে, আশপাশে থেকে যারা মধু-মাখন-ঘি খাচ্ছেন বা নিদেনপক্ষে রাষ্ট্র-সম্পদ লুটের তৎপরতায় উচ্ছিষ্ট-ভোজনের সুযোগ পেয়েছেন। আরেকটা ব্যাপার না বললেই নয়। আওয়ামী লীগ গত ষোলো বছরের (একের পর এক-চার টার্ম) শাসনকালে এ দেশের নব্বই ভাগ মানুষের বাঁচার স্বার্থে যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বাজারমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, তাতে এতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পারল না, কিংবা সরকারের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কালোবাজারি, চোরাচালানি ও মুনাফাখোরদের সঙ্গে অবৈধ মুনাফা ভাগাভাগিতে মেতেছেন, তার পরিণাম কী? হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্ত দেশবাসীর নাভিশ্বাস উঠে গেছে, সবাই বাজারের এ আগুন-মূল্যে অপুষ্টির ভয়ানক শিকার-তা নিয়ে কি তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে? না, আঠারো কোটি জনসংখ্যার মাত্র দুই কোটিকে সচ্ছল রেখে, লুটের টাকার সুবিধাভোগ করে বাকি ষোলো কোটিকে তো রাস্তার ফকিরের জীবনযাপনের মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন। এসবের কোনো বিচার হবে না? অবশ্যই হবে একদিন।

খায়রুল কবির খোকন : বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments