Monday, May 16, 2022
spot_img
Homeসাহিত্য‘এটাই আমার অনেক আনন্দের বিষয়’

‘এটাই আমার অনেক আনন্দের বিষয়’

প্রবাস মানে ব্যস্ততা। কমন এ ব্যাপারটি সবার জানা। এই ব্যস্ততার ফাঁকে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। কামরুন নাহার তুলি এর বাইরের কেউ নয়। একজন গুণী নারী বলা যায়। বর্তমানে সময়ে নারীরা দেশ-বিদেশে সফলতার দৃষ্টান্ত বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করে যাচ্ছেন নিজ মেধা, শ্রমের মাধ্যমে। 

একজন নারী স্বামী-সংসার সামলিয়ে প্রবাসে শিশুদের বাংলা শিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ। একই সঙ্গে দেশের জন্য অনন্য গর্ব বলাই যেতে পারে। জলকন্যা খ্যাত ভেনিসের খুব কাছেই ত্রেভিজো সেখানেই স্বামী,দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন তুলি এবং ভালো আছেন। 

২০০৭ সালে একজন গৃহিণী হিসেবে ইতালি পাড়ি জমান কালের পরিবর্তনে সংসারের পাশাপাশি নিজের মেধাকে আরও গতিশীল রাখতে প্রবাসে শিক্ষক পেশা বেছে নেয়। খুব সম্মান আর সফলতার সাথে ত্রেভিজো বাংলা স্কুলে প্রবাসে উঠতি বয়সের ছেলে/মেয়েদের বাংলা শিক্ষা প্রদান করছেন তিনি। ২০১৮ সালে এপ্রিল মাস থেকে স্কুলটি চালু করা হয়। এখনো পর্যন্ত বেশ সুনামের সাথে স্কুলের কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা তার সেজন্য দেশ-বিদেশের সবার দোয়া প্রত্যাশা করেছেন। স্বামী কামরুল হাসান রাসেল স্কুলটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংসারে জীবনে সুখে আছেন তারা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যুগান্তর ইতালি প্রতিনিধি জমির হোসেন—

পরবাস যুগান্তর : কেমন আছেন?
কামরুন নাহার তুলি : আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। 

পরবাস যুগান্তর : শিক্ষকতা পেশায় কিভাবে এলেন?
কামরুন নাহার তুলি : ইতালি ত্রেভিজো শহরে আগে কোনো বাংলা স্কুল ছিলোনা। এখানকার বাচ্চারা ইতালিয়ান ভাষায় পড়ালেখা করে। বাংলা লিখতে ও পড়তে পারতোনা। তারা বাবা মায়ের সাথেও বাসায় ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলতো বেশি। কারন বাংলা সেখানোর কোনো স্কুল ছিলোনা। এতে আমাদের মাথায় চিন্তা এলো যে একটা সময় গিয়ে হয়তো এখানকার বাচ্চাগুলো বাংলা লিখতে ও পড়তে পারবেনা। বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলা শিক্ষা বাচ্চাদের দেয়ার উদ্দেশ্যে ত্রেভিজো বাংলা স্কুল আমরা কয়েকজন মিলে নিজ উদ্যোগে গঠন করে শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শুরু করি। এভাবেই আমার শিক্ষকতায় আসা। 

পরবাস যুগান্তর : শিক্ষক হিসেবে প্রথম দিন কেমন কেটেছে?
কামরুন নাহার তুলি : শিক্ষক হিসেবে আমার প্রথম দিনটিতে অসম্ভব সুন্দর একটা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। এখানকার বাচ্চারা ইতালিয়ান স্কুলে পড়ে বিধায় তারা কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে বাংলায় ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারছিলোনা। বাংলা লিখতে ও পড়তে পারেনা। তখন আসলেই নিজেকে সেই মুহূর্তে গর্বিত মনে হয়েছিলো যে ইতালিতে একটা বাংলা স্কুল গঠন করতে পেরেছি বলেই আজ বাচ্চারা এই স্কুলে এসে আজ বাংলা শিখতে পারছে। তখন তাদের বাংলা শিখাতে পেরেও খুব আনন্দ লাগছিলো। কারণ বাংলা মায়ের ভাষা। এই বাংলা ভাষা বাচ্চাদের শিখাতে পারছি। সত্যিই একটি ভালো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরেছি। 

যুগান্তর পরবাস: আপনার ছাত্রজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। 
কামরুন নাহার তুলি : আমার ছাত্রীজীবন অনেকটাই আনন্দময় কেটেছে। ছাত্রী হিসেবে মেধাবী ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ। এসএসসি মুসলিম মডার্ন একেডেমী থেকে এইচএসসি আদমজী ক্যান্টনম্যান্ট কলেজ থেকে এবং সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স তিতুমীর কলেজ থেকে। বিয়ের পড় স্বামীর পাঠানো ভিসায় ইতালি চলে আসার কারনে পড়ালেখা কম্পলিট করতে পারিনি। ছাত্রীজীবনে আমার অনেক মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার মধ্যে একটি বলছি,আমি যখন এইচ,এস,সি টেষ্ট পরীক্ষা দেই আদমজী ক্যান্টনম্যান্ট কলেজে আর্স থেকে। রেজাল্ট এর আগে প্রধান শিক্ষিক ও ইসলাম এর ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষক আমার আব্বাকে ফোন দিয়ে দেখা করতে বলেন। এটা শুনে আমাতো ভয়ে শেষ। কেনো দেখা করতে বললো? আমিকি তাহলে রেজাল্ট খারাপ করেছি? অনেক ভয়ে ছিলাম না জানি আব্বাকে কি বলবে? পরে দেখা করতে গেলাম বাবা সহো। আমার বাবাকে আমার ইসলাম এর ইতিহাস পরীক্ষার খাতা বেড় করে দেখালেন। বললেন আমার শিক্ষকতা জিবনে এমন ছাত্রী দেখেনি যে কিনা এতো পৃষ্ঠা নিয়েছে এবং এতো ভালো লিখেছে। ও অল্প সময়ে এতো লেখা লিখেছে যা কখনো দেখিনি। আপনার মেয়ে ভবিষ্যৎ এ অনেক ভালো করবেন এমন মেয়ে আপনার ঘরে জন্মেছে। শিক্ষকের কাছ থেকে এমন কথা শুনে আমার বাবা আমাকে নিয়ে অনেক গর্ব করেছে। সেই দিনের কথা আমি কখনো ভুলবো না। 

যুগান্তর পরবাস : আপনাদের সময়ের শিক্ষাব্যবস্থা ও বর্তমান সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কী পার্থক্য লক্ষ্য করেন?
কামরুন নাহার তুলি : আমাদের সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ও বর্তমান সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কিছুটা পার্থক্যতো আছেই। যেমন আমাদের সময়ের অনেক বানান আর এখনকার বানানে মিল নেই। অনেক বানান পরবর্তন হয়েছে। অনেক উচ্চারণ পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের সময়ে এতো সুযোগ সুবিধা আমরা পাইনি কিন্তু এখন ছাত্র ছাত্রীরা চারিদিক থেকে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। 

যুগান্তর পরবাস : আপনি শিক্ষামন্ত্রী হলে বিশেষ যে তিনটি কাজ করতেন?
কামরুন নাহার তুলি : আমি শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেলে যে ৩টি কাজ করতাম তা হলো- প্রথমতো আমি প্রবাসে বেড়ে উঠা বাংলাদেশি বাচ্চাদের জন্য একটা বাংলা স্কুল গঠনের ব্যবস্থা করে দিতাম। । দ্বিতীয়ত সেই স্কুলে তাদের বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা করে দিতাম এবং তৃতীয়ত সেই স্কুলে প্রতি বছর বই বিতরণ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা, শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের ব্যবস্থা করতাম। যেন বিদেশের মাটিতে বড় হয়েও বাচ্চারা বাংলা পড়তে বলতে ও লিখতে পারে। 

যুগান্তর পরবাস: শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কামরুন নাহার তুলি: শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের কিছুটা সময় খেলার সুযোগ দিলে শারীরিক মানসিক বিকাশ ঘটে। তাদের মন প্রফুল্ল থাকে। 

যুগান্তর পরবাস : আপনার বিদ্যানিকেতনটি সম্পর্কে কিছু বলুন। 
কামরুন নাহার তুলি : আমার স্কুলে বাচ্চাদের পড়াতে অনেক ভালো লাগে। নিজের কিছু জ্ঞান তাদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পেরে অনেক আনন্দিত। তাদের কিছু শিখাতে পারছি এর থেকে ভালো কাজ আর কি হতে পারে। স্কুলের বাচ্চারা আমাকে শিক্ষিকা হিসেবে মান্য করে সন্মান করে এটা অনেক বড় পাওয়া। 

যুগান্তর পরবাস: আপনার প্রিয় ছাত্র কারা? কেন প্রিয়?
কামরুন নাহার তুলি : স্কুলের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী আমার প্রিয়। আমার সন্তানের মতোই আমি আদর করি। তারাও আমাকে সন্মান করে স্রদ্ধা করে। যখন ক্লাসে ঢুকে সালাম দেয় খুব ভালো লাগে। আর ছাত্রছাত্রীরা যখন আমি শিক্ষিকা বলে সব কথা মান্য করে এতে করে সবাইকে খুব ভালো লাগে। 

যুগান্তর পরবাস : শিক্ষকতা জীবনের একটি আনন্দের ঘটনা বলুন। 
কামরুন নাহার তুলি : শিক্ষকতা জীবনের অনেক আনন্দের ঘটনা আছে। সব বলে তো শেষ করা যাবে না। তবে একটি বলতে চাই সেটা হচ্ছে- শিক্ষিকা হিসেবে ইতালির মাটিতে বাচ্চাদের বাংলা শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং বিনা পারিশ্রমিকে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার জন্য শিক্ষিক সন্মাননা দুবার পেয়েছি। এটাই আমার অনেক আনন্দের বিষয়। এছাড়া স্কুলে বিশেষ দিনগুলোতে আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠান করি। যেমন অংকন প্রতিযোগিতা ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ শে মার্চ। সবাই মিলে পিকনিকে যাই সব শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীরা কবিতা,গান, গল্প, কৌতুক বলে, আমরা অনেক আনন্দ, মজা করি। খুবই আনন্দে কাটে আমাদের স্কুলের প্রতিটি মুহূর্ত। 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments