Thursday, October 6, 2022
spot_img
Homeসাহিত্যএকজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

মুশফিক হোসাইন জানুয়ারি ৬, ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ১৯৭৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হয়ে কৃতিত্বের সাথে অবসর গ্রহণ করেন।

শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ ছিল। নিসর্গ প্রেম সম্পর্কে তিনি বলেন,  ‘কৈশোরে একদিন কুয়াশামাখা ভোরে চোখ মেলে দেখি কর্ণফুলীর কোলে সূর্যমামা চোখ রাঙিয়ে হাসছে। দৌড়ে যাই নদীর কূলে। জোয়ারের নোনা জলে দুলছে হারগোজা। লতা-পাতা আর কাঁটার ফাঁকে নীলাভ ফুলেরা। রঙিন পক্ষীকুলের বিচিত্র সুর ও স্বর আমাকে তাদের প্রেমে মগ্ন করে। মৌমাছির রহস্যময় জীবন উদ্ঘাটনে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি আর বৃক্ষকুল হয়ে ওঠে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’।

শৈশবের সোনাঝরা দিনগুলোতে প্রকৃতির সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছেন। এখনও অষ্টাদশ বয়সী তরুণের মতো খুঁজে বেড়ান প্রাণ-প্রকৃতির রহস্য। বৃক্ষশিশুর চারা রোপণে নিরলস খেটে যাচ্ছেন। শহরের আনাচে-কানাচে উৎসবহীন পরিবেশে নীরবে রোপন করেছেন অগুণিত বৃক্ষচারা। চট্টগ্রাম কলেজের প্রধান গেইটে সাক্ষী হয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর রোপণ করা রুদ্রপলাশ বৃক্ষ। 

পাখিকুলের আবাস ধ্বংসে তাঁর মনে রক্তক্ষরণ হয়। তাই পাখিদের জন্য মাটির কলসিতে বাসা তৈরি করে বৃক্ষ শাখায় বেধে দেন। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগেই ব্যালকনিতে পানি রাখেন বেড়াতে আসা পাখিদের জন্য।

উপকুল ও সাগর-মোহনার পাখিদের প্রতি বিশেষ দরদ থাকলেও যে কোনো পাখির সুর তাঁকে আকুল করে তোলে। তাই পাখি দেখা ও পাখি চেনার আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন। চট্টগ্রাম শহরে পাখি উদ্ধারকারীর অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এ বয়সেও।

মুশফিক হোসাইনের শরীরে বহমান লোহিতকণিকায় প্রকৃতি-প্রেম রয়েছে। তাঁর মাতা-পিতারও ছিলো প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি এমন নিখাদ দরদ। তাঁর সাথে প্রগাঢ় আলোচনায় জেনেছি শৈশবে প্রকৃতি-প্রেমে মগ্ন হওয়ার বিশদ কাহিনী।

তাঁরই নিরলস ভূমিকায় ও সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় প্রকৃতি ও প্রকৃতিসংরক্ষণ বিষয়ক প্রকাশনা ‘প্রকৃতি’। অভিজ্ঞতাধর্মী ও গবেষণামূলক এ প্রকাশনা ইতোমধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। আমি এ প্রকাশনার সহযোগী সম্পাদক-হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি, বৃক্ষদেহে পেরেকের আঘাত দেখে আবেগ-প্রবণ হয়ে তাঁর অশ্রু-বিসর্জনের দৃশ্য। এ সম্পর্কে তিনি আমাকে বলেছেন, ‘মনুষ্যদেহে যেমন আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়, বৃক্ষদেহেও ঠিক তেমনি আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়। উভয়েরই অনুভূতি শক্তি প্রবল। পার্থক্য শুধু একগোষ্ঠীর বাকশক্তি আছে আর অপর গোষ্ঠীর তা নেই’।

বৈকালিক পদচারণায় পরিচিত-অপরিচিত কারো সাথে আলোচনার সুযোগ হলে তিনি অনবরত বলে যান নিমপাতা, জলপাই, বহেরা, আমলকি আর সজনে-ডাটার কথা। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়, প্রেসক্লাব কিংবা আড্ডারত মুহুর্তে আমি বহুবার এ-দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছি। নতুন প্রজন্মের কথা ভেবে এখন তিনি প্রকৃতিপাঠ মঞ্চের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রকৃতি ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রকৃতি দল নিয়ে সরব রয়েছেন।

‘বেড়াতে গিয়েছি মৃতদের বাড়িতে’ নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থে মানব-মানবীর প্রেম যেমন রয়েছে ঠিক তেমনি প্রকৃতি প্রেমও রয়েছে। প্রকৃতির প্রেম ছাড়া কোনো প্রেমই আদতে প্রেম হয় না। মানবপ্রেমের লুকানো ইতিহাস প্রকৃতিতেই রয়েছে।     

প্রকৃতি-প্রেমে ব্যাকুল হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বসন্তে জরা-ক্ষরা আর অশুভকে দূর করার জন্য বাড়ির চৌকাঠে মালা গেঁথে ঝুলিয়ে রাখা হয় ‘বিউফুল’ আর সাথে থাকে তার বোন নিমপাতাগুচ্ছ। যা আমাকে মুগ্ধ করে আর ভালোবেসেছি জলজ পাখি, ফুল, প্রজাপতি ও জলডোরা সাপ। মায়ার বাধনে বেঁধেছি গাছ, পাখির বাসা, ডিম ও ছানা। এই ভালোবাসার নামই প্রকৃতি’।

বীজ, চারাসংগ্রহ ও বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্মশান, কবরগাহসহ পতিত ভূমিতে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় ৬০ বছর ধরে তিনি নিয়োজিত। এ সম্পর্কে তাঁর ঘনিষ্টজন, সহপাঠী ও চা শিল্প-নির্বাহী আমিনুর রশীদ কাদেরী বলেন, ‘মুশফিক হোসাইনের সমগ্র অন্তরাত্মা জুড়ে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। বীজের অঙ্কুরোদগম দেখে যেমন থমকে দাঁড়ায় তেমনি পাখির বাচ্চার  উড়াউড়ি দেখেও মুগ্ধ হয় আবার কখনো কখানো বয়স্ক বৃক্ষের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে’।

মুশফিক হোসাইন ‘চিটাগাং বী সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ‘প্রকৃতি’র সম্পাদক, ‘প্রকৃতি পাঠমঞ্চ’- এর এডমিন এবং প্রবীণদের নিয়ে ‘প্রবীন নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রাম’ ও মাস্টার্স ৭৬-এর আহ্বায়ক। জনসচেতনতায় পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কলাম ও সচিত্র প্রতিবেদন লেখালেখি করেন। মনন – সৃজন ও বিশ্লেষণের বাংলা মাসিক ‘দখিনা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্বরত আর সাময়িকী ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ও সম্পাদনায় যুক্ত।

প্রকৃতি সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নিসর্গী মুশফিক হোসাইন ‘সিটি ব্যাংক -তরুপল্লব দ্বিজেন শর্মা নিসর্গ পুরস্কার ২০২২’ এ বৃক্ষসখা পুরস্কার অর্জন করায় তাঁকে উষ্ণ অভিনন্দন।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments