Friday, November 26, 2021
spot_img
Homeজাতীয়এই ভোগান্তির দায় কার?

এই ভোগান্তির দায় কার?

পথে পথে দুর্ভোগ। ভোগান্তি। নাভিশ্বাস জনজীবনে। হঠাৎ করে পরিবহন ধর্মঘটে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের ধর্মঘটে মানুষ রাস্তায় বের হয়ে পড়েন চরম বিপাকে। গতকাল শুক্রবার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পূর্ব-নির্ধারিত নিয়োগ পরীক্ষা থাকায় পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। গণপরিবহন বন্ধের কারণে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিতে পারেনি অনেক চাকরি প্রত্যাশী।
সকাল থেকেই রাজধানীতে দেখা গেছে ব্যতিক্রমী চিত্র।ভোর থেকে বন্ধ গণপরিবহন। ঢাকা থেকে ছাড়েনি দূরপাল্লার বাস। অনেকে বাসস্ট্যান্ডগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে পারেননি। ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেককেই ফিরে যেতে দেখা গেছে। অন্যদিকে ঢাকার প্রবেশ মুখ থেকে বিকল্পভাবে ৫ থেকে ৭ গুণ বাড়তি ভাড়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়েই নির্দিষ্ট গন্তব্যে রওনা হয়েছেন কেউ কেউ। কাউন্টারগুলোর সামনে ও মূল সড়কের দুই পাশে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো যাত্রী উঠানো হয়নি।  আন্তঃজেলার কোনো বাসও ঢাকায় প্রবেশ করেনি। সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ছিল মানুষের জটলা। গণপরিবহন না থাকায় অতিরিক্ত ভাড়ায় অ্যাপ-ভিত্তিক মোটরসাইকেল, অটোরিকশা এবং রিকশায় যেতে হয়েছে অনেককে। বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া নিয়ে যাতায়াত করেছেন। অনেকেই আবার পায়ে  হেঁটে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছেছেন। রাজধানীতে বিআরটিসি বাস চলতে দেখা গেলেও তার সংখ্যা ছিল নগণ্য। বাস বন্ধ থাকায় যানজটের নগরীতে ছিল না কোনো যানজট। ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে ছিল না কোনো তৎপরতা। এদিকে বাস বন্ধ থাকায় রাজধানীর রাজপথ ছিল রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশার দখলে। আর এই সুযোগে এসব পরিবহনের ভাড়া হয়ে গেছে তিন থেকে চারগুণ। ২০ টাকা ভাড়ার বিপরীতে আদায় করেছে ১০০ টাকা।
ডিজেলের দাম বাড়ার পর সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই ধর্মঘট ডেকে গণপরিবহন বন্ধ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। তারা বলেছেন, তেলের দাম কমানোর দাবি না তুলে ভাড়া বৃদ্ধির দাবি অযৌক্তিক।  হঠাৎ বাস বন্ধ করে জনগণকে জিম্মি করতেই এমনটা করা হয়েছে। জিম্মি করেই তাদের দাবি আদায় করতে চায়। তাদের দাবি মেনে যদি সরকার বাস ভাড়া বাড়িয়ে দেয় তাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে।
এদিকে শুক্রবার সরকারি ও বেসরকারি চাকরি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের পরীক্ষাসহ মোট ২৬টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিবহন বন্ধ থাকায় সকালের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি বহু পরীক্ষার্থী। যারা নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছেন তারা রিকশা, মোটরসাইকেল ও সিএনজিতে কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া দিতে হয়েছে। এদিকে বিকালে ৯টি চাকরির পরীক্ষা থাকলেও দেশের বিভিন্ন জেলার চাকরি প্রত্যাশীরা অংশ নিতে পারেননি। এতে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ময়মনসিংহ থেকে আসা পরীক্ষার্থী  খাদিজা আক্তার মনি জানান, শুক্রবার তার দু’টি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল। তবে সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ভোরে ময়মনসিংহ থেকে রওনা দিয়েও বাস না থাকায় তিনি নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় পৌঁছাতে পারেননি। তিনি বলেন, রাস্তায় কোনো যানবাহন নেই। বাড়তি ভাড়া দিয়ে মোটরসাইকেল, সিএনজি ও রিকশা ব্যবহার করে বিকালের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। এমন চরম ভোগান্তির শিকার আগে কখনো হইনি। বহু পরীক্ষার্থী বাস বন্ধ থাকায় আসতে পারেননি। যারা ঢাকার বাহিরে থেকে এসেছেন তাদের সবাইকে মানসিক টেনশনের মধ্য দিয়ে সময় পার করতে হয়েছে। অনেকেই বাড়তি ভাড়ায়ও ঢাকা থেকে ফিরতে পারছেন না।
মিজান নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, আমাকে উত্তরায় যেতে হবে। শান্তিনগরের বাসা থেকে রাস্তায় বের হয়ে দেখি কোনো যানবাহন নেই। সড়কের পাশে আরও মানুষ বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। ৩০ মিনিট অপেক্ষা করেও কোনো বাস পাইনি। বাধ্য হয়ে ৫শ’ টাকা দিয়ে সিএনজিতে যাচ্ছি। তিনি বলেন, হঠাৎ করে বাস বন্ধ হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদেরকে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। অনেকই বাস বন্ধ থাকায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। এতে তাদের জীবন অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
রাজধানীর একটি শপিংমলের বিক্রয়কর্মী হেলাল উদ্দিন বলেন, সরকার হঠাৎ করেই তেলের দাম বাড়িয়েছে। এটা নিয়ে দেশের মানুষ শঙ্কিত। এমনিতেই  নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে হুট করে বাস বাড়া বাড়ানোর দাবিতে বাস মালিক শ্রমিকরা গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়েছেন। হুট-হাট করে এমন সিদ্ধান্ত সারা দেশের মানুষকে বিপদে ফেলছে। গণপরিবহন বন্ধ না করে আলোচনার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। ধর্মঘটের কারণে মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছেন না। অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসালয়ে নেয়া যাচ্ছে না। লাখ লাখ পরীক্ষার্থী নানা অসুবিধার মুখে পড়েছেন। যারা কষ্ট করে আসছেন, ফেরত যাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন।
অনেকেই বলেছেন, বাস বন্ধ রেখে দেশের মানুষকে শাস্তি দিচ্ছেন বাস মালিক-শ্রমিকরা। দেশের মানুষ তেলের দাম কমানোর দাবি জানালেও বাস মালিকরা এটাকে পুঁজি করে পরিবহন খাতে সুবিধা নিতে চাচ্ছেন। তারা তেলের দাম কমাতে বাস বন্ধ কিংবা ধর্মঘট দেয়নি। তারা এটা করেছে বাস ভাড়া বৃদ্ধির জন্য। যা কাম্য নয়। সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে এমনিতেই বিপাকে। বাজারে চলছে অস্থিরতা। তার মধ্যে বাস ভাড়া বৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’- হয়ে উঠবে। জনজীবনে অস্থিরতা বাড়বে।
সাত কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি:  এদিকে ধর্মঘটের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষা। তবে বাস বন্ধ থাকায় নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল, অটোরিকশা এবং রিকশায় কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া দিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছেন তারা। বিআরটিসির কিছু বাস চলতে দেখা গেলেও তা ছিল অপ্রতুল। বিআরটিসির যেসব বাস চলাচল করেছে তাতে মানুষ ঠাসাঠাসি করে যাতায়াত করেছেন। জানা যায়, ঢাকার সাতটি কলেজে গতকাল সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বাণিজ্য ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ২৩ হাজার ৭০০ জন। তবে অনেকেই বাস বন্ধ থাকায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। একটি বড় অংশ ভোগান্তি নিয়েই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন।
মিরপুর বাংলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেয়া লাভলী আক্তার বলেন, গত বৃহস্পতিবার পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দিলেও যাত্রীবাহী বাসের সংগঠনগুলো ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়নি। অঘোষিত অবস্থায় বাস বন্ধ করায় আমাদের অনেক বড় ক্ষতির মুখে ফেলেছে। বাসা থেকে বের হয়ে কোনো বাস পাইনি। রাস্তায় বাস না থাকায় পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে ১১শ’ টাকা ভাড়া দিয়ে মিরপুরে এসে পরীক্ষা দেই। এখন আবার ফিরতে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে। বাস না থাকায় আমার মতো অনেক পরীক্ষার্থীর ভোগান্তি হয়েছে।
গাজীপুরের মরিয়ম বেগম ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে ইডেন কলেজ কেন্দ্রে আসতে হয়েছে অটোরিকশা ভাড়া করে। তিনি বলেন, সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়েও যথাসময়ে পৌঁছাতে পারলাম না। বাস বন্ধ থাকায় সিএনজি ও মোটরবাইকের চাহিদা বেড়ে যায়। এতে বাধ্য হয়েই অটোরিকশা নিয়ে আসতে হয়েছে। আমার এলাকার পরিচিত অনেকেই পরীক্ষা দিতে আসতে পারেনি।
রিকশা ও সিএনজিতে বাড়তি ভাড়ায় ভোগান্তি: বাস বন্ধ থাকার সুযোগে ভোর থেকেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন রিকশা, সিএনজি ও অটোরিকশা চালকরা। মালিবাগ থেকে মিরপুরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন হেমায়েত উদ্দিন নামের এক যাত্রী। দীর্ঘক্ষণ মালিবাগ মোড়ে বসে রিকশা ও সিএনজি চালকদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি করছেন। তবে অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ায় চালকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা বাধে। পরে বাধ্য হয়েই বাড়তি ভাড়ায় সাড়ে ৪শ’ টাকায় মিরপুরে যান। বিল্লাল হোসেন নামের আরেক যাত্রী ২০০ টাকায় মালিবাগ থেকে যমুনা ফিউচার পার্কে গিয়েছেন। তিনি বলেন, বাস বন্ধ থাকায় সবাই সুযোগ নিচ্ছে। ভাড়া বেশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেশি। আমরা কোথায় যাবো। আমাদের তো বেতন বাড়ছে না। বাড়তি ভাড়ায় চলতে গেলে মাস শেষে বাড়ি ভাড়া দিতে অসুবিধায় পড়তে হবে।
এদিকে গত বুধবার মধ্যরাত থেকে ডিজেলের মূল্য লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার সভা করেছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। অতিরিক্ত দামে ডিজেল কিনে পরিবহন চালাতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন মালিকরা। তারা ভাড়া সমন্বয়ের দাবি করেন। ডিজেলের দাম কমানো, নতুন ভাড়া সমন্বয়ের দাবি গতকাল থেকে ধর্মঘটের ডাক দেন ট্রাক ও পণ্যবাহী পরিবহনের মালিকরা। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁও কার্যালয় থেকে অনেকটা আনুষ্ঠানিকভাবেই ধর্মঘটের ডাক দেন বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও ট্যাংক লরি-প্রাইম মুভার মালিক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান। এরমধ্যে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ধর্মঘটের অনুষ্ঠানিক ডাক না দিলেও গতকাল সকাল থেকে বাস বন্ধ রেখেছেন তারা।
যদিও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ দাবি করছে, তারা ধর্মঘটের ডাক দেননি। পরিবহন মালিকরা গাড়ি চলাচল বন্ধ রেখেছেন। তারা বিআরটিএতে ভাড়া বাড়ানোর জন্য চিঠি দিয়েছেন। ভাড়া সমন্বয় করলে মালিকরা বাস চালাবেন।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাকেশ ঘোষ বলেন, গতকাল সকাল থেকে সারা দেশে পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে ধর্মঘটের ঘোষণা দেইনি। কিন্তু মালিকরা গাড়ি চালাবেন না। আঞ্চলিক কমিটিগুলো বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
বাস মালিকরা জানান, ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাসের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। ২০১৯ সালে বাস ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলেও প্রজ্ঞাপন জারি করে তা কার্যকর করা হয়নি। ফলে বাস ভাড়া ৫০ শতাংশ বাড়ানো উচিত।
এদিকে পরীক্ষার্থী ও জনগণের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আগামী রোববার বিআরটিএ’র ভাড়া পুনঃনির্ধারণ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বাস্তবভিত্তিক মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments