ইমাম কাজী কায়্যুম: পবিত্র মাহে রামাদানের ফাজায়েল ও গুরুত্ব জেনে সিয়াম পালনের সাথে সাথে এ মাসে ফেতরা ও জাকাতের ব্যাপারে যথেষ্ঠ সতর্কতা অবল্ভন জরুরি।
এবার (২০২১/১৪৪২) উত্তর আমেরিকায় ফেতরা জনপ্রতি $১৫ ডলার করে ধার্য্য করা হয়েছে। যেহেতু নবীযুগের ঠিক ঐ গম বার্লি দিয়ে ফেতরা আদায় এখন সম্ভব নয়, বা আদায় করলেও কেউ নিতে চাইবে না, তাই ফেতরাটা এখন অর্থ দিয়েই আদায় হয়ে থাকে। পরিবারের শিশু ও ছোট বড় সকল সদস্যের পক্ষ থেকে ফেতরা আদায় বাধ্যতামূলক। ফেতরার যথাযত প্রাপককে অন্তত একটি ওয়াক্ত পেট ভরে খাবার খেতে যে মূল্য লাগে, তা দিয়ে দেয়ার নামই ফেতরা।বিনিময়ে বান্দার রোজাগুলোর ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কৃত ভুলত্রুটি মার্জিত হয়ে তা আল্লাহর দরবারে কবূল হয়। “ফেতরা আদায়ের গুরুত্ব এতই অপরিসীম যে, রোজাদারের রোজা আকাশ ও ভূমির মধ্যখানে ততক্ষণ পর্যন্ত ঝুলে থাকবে, যতক্ষণ না ফেতরা আদায় করা না হবে”। ফেতরা আদায়ের জন্য নিসাব আবশ্যক নয়, যা জাকাতের জন্য আবশ্যক। নিসাব কি? নিসাব হলো জাকাত প্রদানের মাপকাটি। ৮৭.৪৫ গ্রাম বা ৭.৫ তোলা ও এর উপরে সোনা বা স্বর্ণালংকার অথবা ৫২.৫ তোলা রৌপ্য কিংবা এর সম পরিমাণ বা বেশি নগদ অর্থ যার নিকটে কিংবা ব্যাংক একাউন্টে পুরো একটি ইসলামী মাস ব্যাপী বিদ্যমান থাকবে, নারী-পুরুষ ও স্বামী-স্ত্রী নির্বিশেষে তাদের প্রত্যেকের উপরই জাকাত ফরজ।
গত ১৭ই এপ্রিল, ২০২১ মোহাম্মদী সেন্টারকে দেয়া নিউইয়র্ক গোল্ড কোম্পানীর তথ্য অনুযায়ী ৭.৫ তোলা বা ৮৭.৪৫ গ্রাম স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্য $4,810 ডলার। ২২ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম $55 মূল্যমানে।
ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হচ্ছে যাকাত। মূলত রামাদান মাসেই সাধারণত মুসলমানগন যাকাত প্রদান করেন এজন্যই যে, এ মাসে প্রতিদানের সাওয়াব অনেক। সত্তর গুন বেশি। কিন্তু যাকাত আসলে কিভাবে ও কতটা দিতে হয়, অর্থাৎ মানুষের স্থাবর সম্পত্তি না অস্থাবর সম্পত্তি, নাকি স্থাবর-অস্থাবর উভয়ের ওপরেই এটা ধার্য?
কেবল এক বছরের বেশি সময় ধরে সঞ্চিত মূল্যবান জিনিসপত্রের ওপর, নাকি ব্যাংকে রাখা টাকা কিংবা সঞ্চয়পত্রের মূল্য নির্ধারণ করে যাকাত নির্ধারণ করতে হবে?
চলুন জেনে নেয়া যাক।
ইসলামের নবী হযরত মোহাম্মদ যখন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু করেন, তখন সে রাষ্ট্রে যাকাত ব্যবস্থা চালু হয়।
মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরীফে যাকাত সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া আছে।
কার ওপর যাকাত  ফরয?
অনেকের মধ্যে ধারণা আছে, নিজের বা পরিবারের অধিকারে থাকা মূল্যবান দ্রব্যাদি যেমন স্বর্ণ-রৌপ্যালঙ্কার, দামী রত্ন বা এ ধরণের জিনিস থাকলেই কেবল যাকাত দিতে হয়? ব্যাপারটি তেমন নয়।
হাতে গচ্ছিত নগদ অর্থ, শেয়ার সার্টিফিকেট, স্বর্ণ-রৌপ্য, মূল্যবান ধাতু ও সোনা-রুপার অলংকার, বাণিজ্যিক সম্পদ ও শিল্পজাত ব্যবসায় প্রতিশ্রুত লভ্যাংশ, উৎপাদিত কৃষিজাত ফসল, পশু সম্পদ—৪০টির ওপরে ছাগল বা ভেড়া, এবং ৩০টির ওপরে গরু-মহিষ ও অন্যান্য গবাদি পশু, খনিজ দ্রব্য, প্রভিডেন্ট ফাণ্ড – এসব কিছুর ওপরই যাকাত দিতে হবে, কিন্তু সেটা নিসাব অনুসারে। নিসাবের মালিক হবার এক বছর পূর্তির পরই যাকাত ফরয হয়। বছরটি চান্দ্র বা হিজরী মাসের হিসেবে হতে হবে। জানা আবশ্যক যে, ইসলাম ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী যেসব সম্পদের ওপর যাকাত দিতে হয় না, এমন কিছু বিষয় নির্দিষ্ট করা আছে।
এর মধ্যে রয়েছে, বসবাসের জন্য নির্মিত ঘর, ঘরের ব্যবহার্য আসবাবপত্র ও অন্যান্য দ্রব্য, চাষাবাদে ব্যবহৃত পশু, কাঁচা সবজি ও ফলের যাকাত নেই। এতদ্ভিন্ন, জমি, মিল-ফ্যাক্টরি, ওয়্যার হাউজ, গুদাম, দোকান, বাড়ী-ঘর, পোশাক, এক বছরের কম বয়েসী গবাদি পশু, চলাচলের যন্ত্র ও গাড়ী, সরকারি মালিকানাধীন নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং অন্যান্য সম্পদের উপর জাকাত আসবে।
কিভাবে যাকাতের পরিমাণ নির্ধারিত হবে? ব্যবসায়িক সম্পত্তি যার অর্থ নির্ধারণ করা যায়, সেটি যদি এক বছরের বেশি সময় ধরে অধিকারে থাকে, তাহলে সেই সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর যাকাত দিতে হবে। এই সম্পদের আড়াই শতাংশ হচ্ছে তার যাকাত। ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, শেয়ার মার্কেটে করা বিনিয়োগ যা এক বছরের বেশি সময় ধরে আমানতকৃত আছে এবং সেখান থেকে মুনাফা আসছে, এবং সঞ্চয়পত্র এই সব ধরণের অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর যাকাত দিতে হবে।
ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী, আট ধরণের মানুষকে যাকাত প্রদান করা যাবে। এদের মধ্যে রয়েছেন ভিক্ষুক, মিসকিন মানে যিনি অভাবগ্রস্ত কিন্তু কারো কাছে সাহায্য চাইতে পারেন না, ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির ঋণমুক্তির জন্য, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, (সাবধান, এই ক্যাটাগরিটির দোহাই দিয়েই মাহে রামাদান আসলে বিভিন্ন নয়ন কাড়া ডিজিটাল মিডিয়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এক শ্রেণীর ভুয়া জাকাত আদায়কারী ব্যবসায়ীগণ বিভিন্ন বাহানা প্রয়োগের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ডে ও নতুন নতুন পন্থা অবলম্ভনের মাধ্যমে জাকাত উসল করেন ঠিকই, কিন্তু এই জাকাতের সিংহ ভাগই তার ব্যয় দেখিয়ে প্রকৃত গ্রহিতাদের না দিয়ে নিজেরাই ভাগ বাটোয়ারা করে লুফে নেন। তাই এই ধূর্তদের থেকে সাবধান! ) এবং মুসাফির।
এর বাইরে দাসমুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায়, কিন্তু দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বহু বছর। ফলে সেটি এখন আর কার্যকর নয়।
ফেতরা-জাকাতের অর্থ ক্রেডিট কার্ডে বা চ্যাকে না দিয়ে প্রাপকদের নিকট কিংবা আপনার বিশ্বস্ত আদায়কারী প্রতিষ্ঠানে নগদ পৌঁছে দেয়াই বাণ্চনীয়।
মোহাম্মদী সেন্টারের জাকাত-ফেতরা ফান্ডেও আপনি সে অর্থ নিশ্চয়তার সহিত প্রদান করতে পারেন।
এ সম্পর্কিত যে কোন অনুসন্ধানের জন্য এই নং এ ফোন করা যেতে পারে। (718)496-9377.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English