Thursday, February 22, 2024
spot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই-বর্জ্যে চলে বোরাক এনার্জিয়ার ই-বাইক

ই-বর্জ্যে চলে বোরাক এনার্জিয়ার ই-বাইক

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ইয়ুথ কো-ল্যাব আয়োজিত চতুর্থ বাংলাদেশ স্প্রিংবোর্ড গ্র্যান্ড পিচ পর্বে প্রথম রানার-আপ হয়েছে ‘বোরাক এনার্জিয়া’। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি    ই-বাইক চলে ই-বর্জ্য থেকে উৎপাদিত শক্তিতে। খোঁজখবর নিয়েছেন রিয়াদ আরিফিন

ই-বর্জ্য থেকে ব্যাটারি

দীর্ঘদিন ব্যবহারে মোবাইল, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ইলেকট্রিক যন্ত্রের ব্যাটারি অকেজো হয়ে যায়। ফেলে দেওয়া হয় সেসব ব্যাটারি।

তাই বলে কি সেসব ব্যাটারির পুরোটাই নষ্ট হয়ে যায়? যায় না। সেসব ব্যাটারির ভালো অংশ (সেল) রিসাইকল (পুনর্ব্যবহার) পদ্ধতিতে ব্যবহার করছে ‘বোরাক এনার্জিয়া’। এসব ব্যাটারির বর্জ্য ব্যবহার করে বোরাক এনার্জিয়া’র দুই প্রতিষ্ঠাতা তানভীর ইসলাম ও আলিম আল রিয়াজ উৎপাদন করেছেন লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি। তাঁদের তৈরি এই ব্যাটারি অটোরিকশা, মোটরবাইক, সেডান কারের মতো যানবাহনে ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত থ্রি হুইলার অটোরিকশাগুলোতে সাধারণত লেড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এর পেছনে অন্যতম কারণ লেড ব্যাটারির দাম, যা কি না লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির দামের প্রায় অর্ধেক। কিন্তু বোরাক এনার্জিয়ার উৎপাদিত লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করা গেলে খরচ পড়বে লেড ব্যাটারির মতোই।

একটি অটোরিকশায় যেখানে ৪০-৫০ কেজি ওজনের তিনটি থেকে পাঁচটি লেড ব্যাটারি প্রয়োজন হয়, এর পরিবর্তে দুই থেকে তিনটি ২৫-৩০ কেজি ওজনের লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে সমপরিমাণ কাজ করা যাবে। এতে পরিবেশের ক্ষতি কমে আসবে। আরো একটি সুবিধা হলো, প্রচলিত লেড ব্যাটারি চার্জ করতে যেখানে ৮-১০ ঘণ্টার মতো সময় লাগে, সেখানে মাত্র ৪ ঘণ্টায় চার্জ করা যাবে বোরাক এনার্জিয়ার লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি।

এ ছাড়া মোটরসাইকেল বা গাড়ির ইঞ্জিন চালু করতেও ব্যবহার করা যাবে তাদের ব্যাটারি।

দোস্তি মিনি স্কুটার

‘দোস্তি মিনি স্কুটার’ নামে একটি স্কুটারও তৈরি করেছে বোরাক এনার্জিয়া। দুই আসনবিশিষ্ট এই ইলেকট্রিক সাইকেলটি একবার চার্জে ৩০-৩৫ কিলোমিটার চলবে, সর্বোচ্চ গতিবেগ ৩৬ কিলোমিটার/ঘণ্টা। উদ্ভাবকদের দাবি, এতে ব্যবহৃত দুটি ব্যাটারি একবার চার্জ করতে খরচ হবে ৬ টাকা। আনুমানিক ১৫০-২০০ টাকা চার্জিং খরচে স্কুটারটি চলবে এক হাজার কিলোমিটার। যেকোনো ধরনের রাস্তা, এমনকি উঁচু টিলাতেও উঠতে পারবে স্কুটারটি।

বাইকটি সর্বোচ্চ ১৬০ কেজি ওজন বহন করতে পারে। তাই দুজন যাত্রী কিংবা একজন যাত্রীসহ ৮০-১২০ কেজি মাল বহন উপযোগী।

পুরো বাইকটি একবার ফুল চার্জ হতে সময় নেবে ৪ ঘণ্টা। বিদ্যুতের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ করার সুবিধাও রাখা হয়েছে এটিতে। স্কুটারটির দাম ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা। বিক্রয়োত্তর সেবা হিসেবে পাওয়া যাবে ব্যাটারির ওয়ারেন্টি এক বছর, অন্যান্য যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে ছয় মাস ও দুই বছরের সার্ভিস ওয়ারেন্টি।

সাধারণ সাইকেলকে করা হয় বৈদ্যুতিক

সাধারণ প্রচলিত বাইসাইকেলকে বৈদ্যুতিক সাইকেলে রূপান্তরের সুবিধা দিচ্ছে বোরাক এনার্জিয়া। ব্যাটারি, সার্কিট ও কন্ট্রোলার যুক্ত করে বৈদ্যুতিক সাইকেলে রূপান্তর করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য থাকছে ২৫ হাজার ও ১১ হাজার টাকার দুটি ভিন্ন রূপান্তর কিট। ২৫ হাজার টাকার সাইকেলটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। এটি এক চার্জে ৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত চালানো যাবে। আর ১১ হাজার টাকার সাইকেলটির সর্বোচ্চ গতি ২৮ কিলোমিটার/ঘণ্টা এবং এক চার্জে চালানো যাবে ২৫ কিলোমিটার।

ভিন্ন ধরনের ভোক্তাদের কথা মাথায় রেখে এই সাইকেলগুলো ডিজাইন করা হয়েছে। যাঁরা বাসা থেকে অফিসে যাতায়াত কিংবা কম দূরত্বে যাতায়াত করেন তাঁদের জন্য ১১ হাজার টাকার প্যাকেজ পর্যাপ্ত। আর ২৫ হাজার টাকার প্যাকেজে একবার চার্জে যেহেতু ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত চালানো যাবে, তাই এটি ব্যবহার করে ফুড ডেলিভারি, কুরিয়ার ডেলিভারির মতো কাজগুলোও করা যাবে।

সাধারণ সাইকেলকে বৈদ্যুত্যিক সাইকেলে রূপান্তরের পর তা ইলেকট্রিক মোড ও স্বাভাবিক—এই দুইভাবেই ব্যবহার করা যাবে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত লেড ব্যাটারির অত্যন্ত ক্ষতিকর দিকগুলো উল্লেখ করে কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স বিভাগের সাবেক গবেষক এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এনার্জি অ্যান্ড ইনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ সেন্টার’-এ কর্মরত আশরাফ হোসেন রাসেল বলেন, ‘ই-বর্জ্য ব্যবহার করে স্বল্পমূল্যে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন করা গেলে তা পরিবেশের জন্য ভালো হবে। কেননা লেড ব্যাটারির রাসায়নিক দ্রব্যাদি পানির সঙ্গে মেশে এবং সেগুলো মাছের হাড়ের মধ্যে জমা হয়। আর এই মাছ খেলে ক্যান্সারসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়বে মানুষ। ’

বোরাক এনার্জিয়া একদিকে যেমন ই-বর্জ্য রিসাইকল করছে, আবার কম দামে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন করে লেড ব্যাটারির ব্যবহার কমাতেও সাহায্য করছে। তবে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে বিস্ফোরণঝুঁকি বেশি উল্লেখ করে তিনি এই ব্যাপারে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরামর্শ দেন উদোক্তাদের।

বোরাক এনার্জিয়ার ই-বর্জ্য রিসাইকলের উদ্যোগকে প্রশংসা করেছেন বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মো. মমিনুর রহমান। তবে তাঁর মতে, ই-বর্জ্য থেকে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন করলে সেটির মান ভার্জিন (নতুন) ব্যাটারির চেয়ে তুলনামূলক কম হবে। তবে দাম বিবেচনায় বৈশ্বিকভাবেই রিসাইকল ব্যাটারির ব্যবহার করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বৈশ্বিক প্র্যাকটিস হলো, ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাটারিটি যে রিসাইকল, সেটি জানিয়ে বাজারজাত করা। তাহলে ব্যাপারটিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।

নিরাপত্তা ইস্যুতে বোরাক এনার্জিয়া জানায়, তারা লি-আয়ন ব্যাটারি থেকে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে থাকে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বোরাক এনার্জিয়ার ওয়ার্কশপ উত্তরা সেক্টর ১২-তে। এখানেই চলছে ব্যাটারি ও স্কুটার তৈরির কাজ। তাদের দলে এখন কাজ করছে ৮-১০ জন কর্মী। দেশে পর্যাপ্ত ই-বর্জ্য থাকা সত্ত্বেও যথোপযুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থাপনার অভাবে তাদের পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে তারা এরই মধ্যে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠান চালুর পরিকল্পনা করছে। তবে তাদের এ কাজ বড় পরিসরে শুরু করার জন্য সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে পরিত্যক্ত ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশের অন্য অংশগুলোরও পরিবেশবান্ধব রিসাইকল ও পরিবেশবান্ধব ধ্বংস সাধন (ডাম্পিং) নিয়েও কাজ করবে বোরাক এনার্জিয়া।

গ্রিনহাউস ইফেক্টের দরুন ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রা হ্রাসে ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনের মতো দেশগুলোতে ব্যাপক হারে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছে গত কয়েক বছরে। বাংলাদেশ সরকারও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপারে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কাজ চালাচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায় ও বিআরটিএ এসংক্রান্ত আইনের খসড়াও প্রণয়ন করেছে। ফলে দেশি-বিদেশি ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে ভালো মানের লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বোরাক এনার্জিয়ার তৈরি ব্যাটারি একদিকে যেমন এই চাহিদা মেটাবে, অন্যদিকে পরিত্যক্ত ব্যাটারি রিসাইকল করে পরিবেশদূষণ রোধেও সহায়ক হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।


একনজরে বোরাক এনার্জিয়া

♦    এই ব্যাটারি ব্যবহার করা যাবে অটোরিকশা, মোটরবাইক, সেডান কারের মতো যানবাহনে।

♦    ৪০-৫০ কেজি ওজনের ৩-৫টি লেড ব্যাটারির কাজ করা যাবে বোরাক এনার্জিয়ার ২৫-৩০ কেজি ওজনের ২-৩টি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি দিয়েই।

♦    মাত্র ৪ ঘণ্টায় এসব ব্যাটারি চার্জ করা যাবে।

♦    ‘দোস্তি মিনি স্কুটার’ ১৫০-২০০ টাকায় চলবে এক হাজার কিলোমিটার।

♦    বাইকটি সর্বোচ্চ ১৬০ কেজি ওজন বহন করতে পারে।

♦    সাধারণ বাইসাইকেলকে বৈদ্যুতিক সাইকেলে রূপান্তর করে থাকে বোরাক এনার্জিয়া।

♦    ২৫ হাজার এবং ১১ হাজার টাকায় মিলবে দুই ধরনের বৈদ্যুতিক সাইকেল।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments