Tuesday, July 5, 2022
spot_img
Homeজাতীয়ইসি-সংলাপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ইসি-সংলাপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

আজ রাষ্ট্রপতির সাথে প্রথম বৈঠক জাপার

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে রাষ্ট্রপতির সংলাপ শুরু হচ্ছে আজ সোমবার। প্রথম দিনে যোগ দিচ্ছে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় আসনে বসা জাতীয় পার্টি-জাপা। রাষ্ট্রপতির এই সংলাপকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ স্বাগত জানালেও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি এতে অংশ নিচ্ছে না বলে জানা গেছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানায়নি দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, এই সংলাপ ‘আইওয়াশ’ ছাড়া কিছুই নয়।

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচন কমিশন কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ। ইসি গঠনের সংলাপের চাইতে ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার’ ইস্যুতেই অনড় থাকতে চায় ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে থাকা বিএনপি।

এ দিকে ইসি গঠনে সংলাপ নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন জোটেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন গণমাধ্যমকে বলেছেন, সার্চ কমিটি দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে প্রতিবারই একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি আমরা। এর ফলে ইসি গঠন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। নানান প্রশ্নেরও জন্ম হয়। তিনি আরো বলেন, সংবিধানের ১১৮-এর ১ অনুচ্ছেদে আইনের বিধানসাপেক্ষে ইসি গঠনের কথা বলা আছে। একই সাথে কমিশনার হওয়ার শর্তাবলিও আইন দ্বারা ঠিক করার কথা বলা আছে। অথচ এটি না করে রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইসি গঠন করছেন। এর আগে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপে বসছেন, মতামত নিচ্ছেন অথচ রাষ্ট্রপতির কাজ এটা নয়। রাশেদ খান মেনন প্রশ্ন রেখে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনে নিতে বাধ্য। এখানে আমাদের পরামর্শ নিয়ে তার কী লাভ? তিনি তো আমাদের মতামত বা পরামর্শ মানতে বাধ্য নন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, এর আগেও আমরা ইসি গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপে বসেছি। কিন্তু লাভ হয়নি। কারণ তার হাতে কিছু নেই, তার করণীয়ও কিছু নেই। সংলাপে বসার নামে বঙ্গভবনে গিয়ে কেবল চা-বিস্কুট খাওয়ার কোনো অর্থ আছে বলে মনে হয় না।

তবে, ১৪ দলের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নেয়ার কথা জানিয়েছেন গণমাধ্যমকে। তিনি বলেন, আমরা সংলাপে অংশ নেব। রাষ্ট্রপতি যাতে কমিশন নিয়োগের স্থায়ী কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেন, পাশাপাশি একটি শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য এবং দক্ষ কমিশন গঠনেরও দাবি জানানো হবে।

আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সংবিধানে আইনের মাধ্যমে ইসি গঠনের নির্দেশনা আছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এই আইন প্রণয়নে উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকার। আইন না থাকায় নির্বাচন কমিশনার হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ডও নেই। দেশের রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং কমিশনারদের (ইসি) নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এবারো পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ নিতে সংলাপ আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ। বিকেল ৩টায় বঙ্গভবনে সংলাপ শুরুর প্রথম দিন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে দল জাতীয় পার্টিকে। সংলাপে অংশ নিতে এরই মধ্যে আট সদস্যর কমিটি চূড়ান্ত করেছে জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের নেতৃত্বে আট সদস্যের এই প্রতিনিধিদল আজকের সংলাপে অংশ নিচ্ছে। একদিন বিরতি দিয়ে আগামী বুধবার সংলাপে বসবে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হবে এই সংলাপে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদেরের নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধিদলে পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু এমপি, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি সংলাপে অংশ নিচ্ছেন।

জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু নয়া দিগন্তকে বলেন, ইসি গঠনে আইন করার বিষয়টি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। কালকে (আজ) মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদের মতবিনিময়ের জন্য ডেকেছেন। দেখি তিনি কী বলেন। সেই অনুযায়ী আমরা সেখানে কথা বলব।

ইসি গঠনের জন্য এর আগে ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিএনপির সাথে আলোচনার মধ্য দিয়ে সংলাপ শুরু করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ। এক মাস ধরে ৩১টি দলের সাথে আলোচনা করেন তিনি। এবারো তিনি একই পথে হাঁটছেন। এবারো ৩১টি দলকেই আমন্ত্রণ জানানো হবে। সে ক্ষেত্রে একাধিক দল নিয়ে একই দিনে সংলাপ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসি গঠন সংক্রান্ত আইন না থাকায় সরকার নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সার্চ কমিটি ও কমিশন গঠনের সুযোগ পায় বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। এ কারণে ইসি গঠনের আগে সংবিধানের নির্দেশনা মেনে আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছেন অনেকে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির সংলাপে বসার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো হলেও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি মনে করে, এটি আইওয়াশ মাত্র। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো রাষ্ট্রপতির ডাকা সংলাপে বিএনপি যাবে না। আমি মনে করি দলেরও এই সিদ্ধান্ত।’ তিনি বলেন, ২০১৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্রপতির ডাকা সংলাপে গিয়ে বর্তমান সর্বনিকৃষ্ট নির্বাচন কমিশন পেয়েছে। আর ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংলাপে গিয়ে নিকৃষ্ট নির্বাচন পেয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা ছাড়া এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন করা যাবে না।

বিএনপির নেতারা বলছেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের যে কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে ছিলেন, তাদের বেশির ভাগ এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। দলীয় সরকারকে ক্ষমতায় রেখে ওই সব কর্মকর্তার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ফলাফল কী হবে, তা সহজেই অনুমেয়। দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সংলাপে অংশ নিলে তা দলের নেতাকর্মী ও অন্যান্য বিরোধী দলের কাছেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংলাপ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বিএনপি। তবে, সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের অবস্থান খুব স্পষ্ট, এই সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা যাবো না। নির্বাচন কমিশন গঠনে কোনো সংলাপে বিএনপি যাবে না।’

সংলাপের সাফল্য নিয়ে বিএনপি-জোটের বেশির ভাগ নেতাই নেতিবাচক বলেই সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাদের বেশির ভাগই মনে করছেন এই সংলাপে গিয়ে কোনো লাভ নেই। সরকার তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পছন্দের ব্যক্তিদেরই ইসিতে বসাবেন, যা আগেও হয়েছিল। তবে জোটের কিছু নেতা বলছেন, রাষ্ট্রপতির চিঠি পাওয়ার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। ২০ দলের শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, রাষ্ট্রপতির সংলাপের চিঠি এখনো পাইনি। পেলে আমরা সেখানে যাবো এবং আমাদের বক্তব্য দিয়ে আসব। মানা না-মানা তাদের বিষয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments