Tuesday, May 17, 2022
spot_img
Homeধর্মইসলামে রুচিবোধ ও সৌন্দর্যচর্চা

ইসলামে রুচিবোধ ও সৌন্দর্যচর্চা

ইসলামে রুচিবোধ ও সৌন্দর্যচর্চার গুরুত্ব অত্যধিক। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জীবন, সুরুচির অনুপম অনুশীলন ইসলামকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনব্যবস্থার আসনে সমাসীন করেছে।

মানুষের আচার আচরণ, জীবন ধারণের বৈচিত্র্য, খাবার-দাবারসহ সব কিছুতেই রয়েছে সৌন্দর্য ও রুচিবোধের সমন্বয়। ইসলাম ব্যক্তির বাহ্যিক ও আত্মিক জীবনে সৌন্দর্য অর্জন, সুরুচির অনুশীলন, সর্ববস্থায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর অটল থাকার ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন। (সূরা আল বাকারাহ : আয়াত : ২২২)।

তিনি আরও বলেন, ‘হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হইবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করিবে এবং তোমাদের মাথা মসেহ্ করিবে এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত করিবে; যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হইবে। তোমরা যদি পীড়িত হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ শৌচস্থান হইতে আসে, অথবা তোমরা স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গত হও এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করিবে এবং উহা দ্বারা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ্ করিবে। আল্লাহ্ তোমাদের কষ্ট দিতে চান না; বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করিতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করিতে চান; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।’ (সূরা আল মায়েদা : আয়াত : ০৬)।

ইসলাম ব্যক্তির বাহ্যিক পোশাক পরিচ্ছদে সৌন্দর্য প্রকাশ ও রুচির সমন্বয়কে দারুণভাবে উৎসাহ প্রদান করেছে। আল্লাহপাক বলেন, ‘তোমার পোশাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ।’ (সূরা আল মুদ্দাসসির : আয়াত: ৪)।

তিনি আরও বলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করেছি, তোমাদের দেহের যে অংশ প্রকাশ করা দোষণীয় তা ঢাকার জন্য এবং তা সৌন্দর্যেরও উপকরণ। বস্তুত তাকওয়ার যে পোশাক সেটাই সর্বোত্তম। এসব আল্লাহর নির্দেশনাবলির অন্যতম, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা আল আরাফ : আয়াত : ২৬)। হাদিস শরিফে এসেছে : ‘আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৯১)।

ইসলামি শরিয়তে নারী-পুরুষের পোশাক পরিচ্ছদের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান রয়েছে, সে মোতাবেক নারী-পুরুষের পোশাক ও পরিচ্ছদের মাধ্যমে রুচিবোধ ও সৌন্দর্য প্রকাশ করা। উল্লেখ্য, পোশাকের মাধ্যমে আভিজাত্য প্রকাশের নামে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসার কিংবা অপচয় করা কিংবা অহংকার প্রদর্শন করা, এসব কিছুকে ইসলাম হারাম তথা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য করেছে।

এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘বিলাসিতা পরিহার করো। আল্লাহর নেক বান্দারা বিলাসী জীবনযাপন করে না।’ (মুসনাদে আহমাদ : হাদিস : ২২১০৫)।

ব্যক্তি জীবন সম্পর্কিত এমন কিছু হাদিস রয়েছে যেগুলোতে সত্যিকার অর্থে ব্যক্তিক সৌন্দর্য ও রুচিবোধ স্পষ্ট হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন : ‘স্বভাবজাত বিষয় পাঁচটি। খাতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, গোঁফ খাটো করা, নখ কাটা, বগলের পশম উপড়িয়ে ফেলা।’ (সহিহ বুখারি : হাদিস : ৫৮৯১)।

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন : ১০টি বিষয় স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। গোঁফ খাটো করা, দাড়ি লম্বা করা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, অঙ্গের গিরাগুলো ঘষে মেজে ধৌত করা, বগলের পশম উপড়িয়ে ফেলা, নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করা, মলমূত্র ত্যাগের পর পানি ব্যবহার করা তথা ইসতিনজা করা। যাকারিয়া বলেন, মাস’আব বলেছেন : আমি দশ নম্বরটি ভুলে গেছি। সম্ভবত তা হলো কুলি করা। (সহিহ মুসলিম : হাদিস : ২৬১)।

এ হাদিস দুটির পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, যে দশটি বিষয় উল্লেখ রয়েছে তা ব্যক্তির জন্য সৌন্দর্য ও রুচিবোধের অন্যতম নিয়ামক। প্রত্যেক ব্যক্তি যদি নিয়মিত এ দশটি আমল যথাযথভাবে পালন করে তাহলে ওই ব্যক্তির পোশাকের অভ্যন্তরীণ জীবন কত যে সুন্দর ও রুচিকর তা সহজেই বোধগম্য। ইসলাম সত্যিকার অর্থে তার সব অনুসারীকে এ দশটি ফেতরাতের ওপর আমলের নির্দেশনা দিয়েছে।

মানুষের চালচলনে, কথাবার্তায় সৌন্দর্য ও রুচিবোধ ফুটে ওঠে। একেবারে দ্রুতবেগে হাঁটা, কিংবা কুঁজো বুড়োর মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা, অথবা হেলে দুলে হাঁটা এগুলো সুরুচি নয় বরং দৃষ্টিকটু। অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত জামাকাপড় নাড়াচাড়া করা, এদিক-ওদিক তাকানো, অপ্রয়োজনে বকবক করা, যত্রতত্র নিজেকে পণ্ডিত জাহির করা, বাচালতা প্রকাশ করা, যত্রতত্র আঞ্চলিক ভাষার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা, ধূমপান কিংবা পান-জর্দা চিবিয়ে পানের পিক যত্রতত্র ফেলা, যত্রতত্র থুথু কফ ফেলা, কথায় কথায় রাগ করা, কাউকে ভর্ৎসনা করা, কারও সঙ্গে মারমুখী আচরণ করা কিংবা অশ্লীল গালমন্দ করা, এসব একবারেই দৃষ্টিকটু শ্রুতিকটু অসুন্দর ও অরুচিকর। ইসলাম এসব বিষয়ে তার সব অনুসারীকে সতর্ক করে নির্দেশনা দিয়েছে।

নবি (সা.) বলেন, ‘যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ, সে-ই প্রকৃত মুসলিম। আর যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে, সে-ই প্রকৃত হিজরতকারী। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)। নবি করিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়, মেহমানের সম্মান করে এবং কথা বলার সময় উত্তম কথা বলে অথবা চুপ করে থাকে। (সহিহ বোখারি : হাদিস : ৬০১৮)।

পরিশেষে, মহান আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে ভালো আচার-আচরণ পালন, সুন্দর আখলাক, উত্তম রুচিবোধ ও সৌন্দর্যচর্চার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ববোধ সম্পন্ন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদ্রাসা, সোনাপুর, সদর, নোয়াখালী

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments