Saturday, January 29, 2022
spot_img
Homeধর্মইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার

ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার

মানুষ আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। উত্তম আকৃতি দিয়ে মানুষকে আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন। কিছু মানুষকে আল্লাহতায়ালা জন্মগতভাবে সৃষ্টিগত কিছু ত্রুটি দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন অথবা কেউ জন্মের পর কোনো দুর্ঘটনায় তার অঙ্গহানি বা শারীরিক কোনো সমস্যায় পতিত হন। যাকে আমরা প্রতিবন্ধী বলে অবহিত করি। বাস্তবে এদের এমন সৃষ্টির পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য ও মহান রহস্য একমাত্র তিনিই জানেন। তবে কিছু কারণ অনুমান করা যেতে পারে যেমন : বান্দা যেন মহান আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারে যে, তিনি সব বিষয়ে ক্ষমতাবান। তিনি যেমন স্বাভাবিক সুন্দর সৃষ্টি করতে সক্ষম, তেমন তিনি এর ব্যতিক্রমও করতে সক্ষম।

আল্লাহ যাকে এ আপদ থেকে নিরাপদে রেখেছেন সে যেন নিজের প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুকম্পাকে স্মরণ করে। অতঃপর তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কারণ আল্লাহ চাইলে তার ক্ষেত্রেও সে রকম করতে পারতেন। এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যেন আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে আখেরাতের মহাসফলতা অর্জন করতে পারেন।

মানুষ হিসাবে আল্লাহর কাছে নারী-পুরুষ, দুর্বল-সবল প্রতিবন্ধী-সুস্থ সবাই সমান। একে অপরের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কেবল আল্লাহ ভীতিকেই আল্লাহতায়ালা শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কুরআনে তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক পরহেজগার এবং আল্লাহভীরু।’ (সূরা হুজুরাত-১৩)। একজন প্রতিবন্ধী মুত্তাকি মুমিন শতসহস্র সুস্থ-সবল কাফের খোদাদ্রোহীর চেয়ে উত্তম। প্রতিবন্ধীরা মানবসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা আমাদেরই পরিবারের সদস্য। সমাজ ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও ন্যায্য পাওনা সম্পর্কে ইসলাম গুরুত্ব প্রদান করেছে। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ, স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। ইসলাম প্রতিবন্ধীদের অধিকার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইসলাম প্রতিবন্ধীদের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে মানুষকে কর্তব্য সচেতন হওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব প্রদান করেছে। কারণ প্রতিবন্ধীরা শারীরিক, মানসিক কিংবা আর্থসামাজিক অক্ষমতা বা অসুবিধার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম হয় না।

প্রতিবন্ধী যেমনই হোক সে আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহর বান্দা। ইসলামের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা, সাহায্য-সহযোগিতা এবং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। বিপদাপদে প্রতিবন্ধীর পাশে দাঁড়ানো মানবতার দাবি এবং ইমানি দায়িত্ব। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবন্ধী, অসহায়দের সঙ্গে অসদাচরণ বা তাদের সঙ্গে উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বা ঠাট্টা-মশকারা করা হারাম। এতে আল্লাহর সৃষ্টিকে অপমান করা হয়।

প্রতিবন্ধীর প্রতি দয়া-মায়া, সেবা-যত্ন সুযোগ-সুবিধা ও সাহায্য-সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ করা মুসলমানদের ওপর একান্ত কর্তব্য। মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলো তাদেরও ন্যায্য প্রাপ্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের (বিত্তবানদের) সম্পদে বঞ্চিত ও অভাবীদের অধিকার রয়েছে। (সূরা জারিয়াহ-১৯)।

তাফসিরে তবারিতে বলা হয়েছে, এক যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হয় এবং গনিমতের সম্পদ লাভ করে। তখন ওই আয়াত অবতীর্ণ হয়। রাসূল (সা.) গনিমতের সম্পদের একটি অংশ অসহায়, দরিদ্র, প্রতিবন্ধীদের নামে বিলিয়ে দিতে বলেন। (তাফসিরে তবারি ২৬/১৫৮)।

অন্যত্র নবি (সা.) বলেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্থকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজখবর নাও এবং বন্দিদের মুক্ত করে দাও। (সহিহ বুখারি-৫০)।

নবি কারিম (সা.) প্রতিবন্ধীদের সর্বদাই অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) কে নবি কারিম (সা.) অপার স্নেহে ধন্য করেছেন। যখনই তাকে দেখতেন, বলতেন, স্বাগত জানাই তাকে যার সম্পর্কে আমার প্রতিপালক আমাকে ভর্ৎসনা করেছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি কারিম (সা.) এ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সাহাবিকে দুবার মদিনার অস্থায়ী শাসক নিযুক্ত করেন। (মুসনাদে আহমাদ; হা. নং ১৩০০০)। যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক দুর্লভ ঘটনা। নবিজি মদিনার বাইরে কোথাও গেলে তাকে তার স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। এ জন্য প্রতিবন্ধীকে ভালোবাসা, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা নবি (সা.)-এর অনুপম সুন্নাত বটে।

শারীরিক অক্ষম ও প্রতিবন্ধীরা রাষ্ট্র, সমাজ ও ধনীদের থেকে সাহায্য সহযোগিতা, ভালোবাসা ও রহমত পাবে। হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেছেন : ‘আল্লাহ দয়ালুদের ওপর দয়া ও অনুগ্রহ করেন। যারা জমিনে বসবাস করছে তাদের প্রতি তোমরা দয়া করো, তাহলে যিনি আকাশে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। যে লোক দয়ার সম্পর্ক বজায় রাখে, আল্লাহও তার সঙ্গে নিজ সম্পর্ক বজায় রাখেন। যে লোক দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহও তার সঙ্গে দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইসলামের ছায়াতলে প্রতিবন্ধীরা সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক দিগবিজয়ী এবং বিখ্যাত ব্যক্তি আছেন যারা তাদের পুণ্যময় কীর্তির কারণে পৃথিবীতে চিরদিনের জন্য ভাস্কর হয়ে আছেন। যারা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ছিলেন।

প্রতিবন্ধীদের ইসলামের বিধান পালনের শিথিলতা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজ দেন না।’ (সূরা বাকারা-২৮৬)। অন্যত্র বলেন, ‘দুর্বল, রুগ্ণ, ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ লোকদের জন্য কোনো অপরাধ নেই। (সূরা তাওবা-৯১)।

আল্লামা কুরতুবি (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ আলজামে লি আহকামিল কুরআনে ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, আয়াতটি (শরয়ী বিধান) পালনে অক্ষম ব্যক্তি থেকে (বিধান) রহিত করার মূলনীতি। সুতরাং যে ব্যক্তি যে বিধান পালনে অক্ষম হয়ে যাবে, সে বিধান তার থেকে রহিত হয়ে যাবে। (তাফসিরে কুরতুবি ৪/৫৪৮)।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধের পরিবর্তন হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দেশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর নানাবিধ কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিবন্ধীবিষয়ক বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণের অঙ্গীকার প্রদান করছে। এটা খুবই ভালো খবর।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, শুধু আইনি সুরক্ষা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমাজে সহজগম্যতা বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতি আমাদের সমাজে বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা। ইসলাম তাদের যেভাবে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে তা সবার মনে রাখা দরকার। আল্লাহর কাছে তাকওয়া ছাড়া শারীরিক অবকাঠামোর কোনো মূল্য নেই। প্রতিবন্ধীরাও মানুষ। আর আল্লাহ পুরো মানব জাতিকে সম্মানিত করেছেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments