Saturday, December 3, 2022
spot_img
Homeধর্মইসলামের দৃষ্টিতে আত্মপ্রচার

ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মপ্রচার

পৃথিবীর সর্বত্র আত্মপ্রচারের হিড়িক চলছে। সবাই নিজেকে প্রচারের নিত্যনতুন পন্থা অবলম্বন করছি। এমনকি দ্বিন ও ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকেরাও আজ এই প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যেন সবাই ‘প্রচারেই প্রসার’—এই নীতিমালার পরীক্ষা করছে। অথচ আমাদের পূর্বসূরিদের রীতিনীতি ছিল এর বিপরীত। তাঁরা নিজেকে প্রচার ও প্রসিদ্ধি থেকে লুকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। জনপ্রসিদ্ধি ও আলোচনা কারো সফলতা ও পূর্ণাঙ্গতার মানদণ্ড নয়। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবসন্তানরা তথা লক্ষাধিক নবী-রাসুলের মধ্য থেকে আমরা মাত্র ২৬-২৭ জন নবীর নাম জানি, যাঁদের কথা কোরআনে কারিমে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু যাঁদের আমরা চিনি না, তাঁরা কি ছোট হয়ে গেছেন? কারো আলোচনা না থাকা তার ছোট হওয়ার প্রমাণ নয় এবং কারো আলোচনা থাকা তার বড়ত্বের একমাত্র দলিল নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি তোমার আগে অনেক রাসুল পাঠিয়েছি। তাদের মধ্যে কারো কারো কাহিনি আমি তোমাকে বর্ণনা করেছি আর অনেকের কাহিনি বর্ণনা করিনি।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৭৮)

প্রচারবিমুখ ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রিয়

হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, অনেক এলোকেশ, ছিন্নবস্ত্র ও উপেক্ষিত ব্যক্তি সে যদি আল্লাহর ওপর কোনো কসম করে বসে, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা পূরণ করেন। (মুসলিম, হাদিস : ২৬২২)

মুআজ (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সামান্যতম লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে কৃত কাজও শিরিকের অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন ওই সব নেককার প্রচারবিমুখ লোককে, যারা কোথাও অনুপস্থিত থাকলে কেউ তাদের স্মরণ করে না এবং কোথাও উপস্থিত হলেও কেউ তাদের চেনে না। তারা ঝামেলা ও ফিতনা থেকে নিজেকে এড়িয়ে চলে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৮৯, মিরকাত : ৮/৩৩৩৯)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই জান্নাতের বাদশাহদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছে, দুনিয়াতে যাদের প্রতি কেউ ভ্রুক্ষেপ করে না, যখন তারা প্রভাবশালীদের কাছে যাওয়ার অনুমতি চায়, তখন অনুমতি হয় না, তারা কোনো মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণীয় হয় না, তারা কথা বললে কেউ শোনে না, অথচ কিয়ামতের দিন যদি তাদের নুর ভাগ করে দেওয়া হয়, সব মানুষের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। (আত্তাওয়াযু, ইবনে আবিদ দুনয়া, হাদিস : ১৯)

জনপ্রসিদ্ধি অর্জন করা বিপজ্জনক

হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো ব্যক্তির অকল্যাণের জন্য এটুকু যথেষ্ট যে তবে আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন (তার কথা ভিন্ন)। তার দ্বিন-দুনিয়ার উন্নতির প্রতি মানুষ আঙুল উঠিয়ে দেখায়। (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৬৫৭৯)

সুলাইম (রহ.) বলেন, একদা আমরা উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর পেছনে পেছনে হাঁটছিলাম, তা দেখে হজরত ওমর (রা.) বেত উঁচিয়ে বলেন, এভাবে চলবে না। কেননা এটি (কারো পেছনে পেছনে চলা) অনুসরণকারীর জন্য লাঞ্ছনা আর অনুসরণীয়ের জন্য ফিতনার কারণ। (আত্তাওয়াযু, হাদিস : ৫১)

আবান ইবনে উসমান (রহ.) বলেন, যদি তুমি চাও তোমার দ্বিন নিরাপদে থাকুক, তাহলে তুমি তোমার পরিচিতিকে সীমিত করো। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৬/৩৪২)

পূর্বসূরিদের দৃষ্টিতে আত্মপ্রচার

ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) বলতেন, যে ব্যক্তি সুখ্যাতি চায়, সে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সততা রক্ষা করেনি। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৬/৩৪২)

ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) বলেন, যদি তুমি এতে সক্ষম হও যে তোমাকে কেউ না চিনুক, তাহলে তা-ই করো। তোমার প্রশংসা না করা হলে তোমার কোনো ক্ষতি নেই আর এতেও তোমার কোনো ক্ষতি নেই যে তুমি মানুষের কাছে নিন্দনীয় হলেও আল্লাহর কাছে প্রশংসনীয় হবে। (আযযুহদুল কাবির, বায়হাকি, হাদিস : ১৪৮) তিনি আরো বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা অনেক বান্দাকে নিয়ামত স্মরণ করাবেন যে ‘আমি কি তোমাকে এই এই নিয়ামত দিইনি? এর মধ্যে এটাও বলবেন, আমি কি দুনিয়াতে তোমাকে অখ্যাত রাখিনি?’ এখানে অখ্যাত রাখাকে একটি নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশর ইবনে হারেস (রহ.) এই দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! যদি তুমি আখিরাতে আমাকে লাঞ্ছিত করার জন্য দুনিয়ায় প্রসিদ্ধি দিয়ে থাকো, তাহলে তুমি আমার থেকে তা ছিনিয়ে নাও। (আযযুহদুল কাবির, হাদিস : ১৪৭)। ইবনে মুহাইরিজ (রহ.) দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার থেকে অখ্যাতি চাই!

খলিল ইবনে আহমাদ (রহ.) দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদাবান বানান, আমার নিজের কাছে সর্বনিম্ন বানান আর মানুষদের কাছে মধ্যবর্তী অবস্থানে রাখুন। (ইবনে কাসির : ৬/৩৪২)

দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও বুজুর্গ কাসেম নানুতবি (রহ.) বলতেন, যদি দুই হরফ এলেম শিক্ষার দায় আমার ওপর না থাকত, তাহলে দুনিয়া ‘কাসেম’ নামীয় কাউকে চিনত না। (আরওয়াহে সালাসা, পৃষ্ঠা : ১৭৫)

অনিচ্ছায় জনপ্রিয়তা অর্জন অপছন্দনীয় নয়

উপরোক্ত আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, নিজেকে নিজে প্রচার করা এবং জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য মেহনত করা অপছন্দনীয়। তবে যদি কোনো ব্যক্তি স্বীয় কৃতকর্মের কারণে তার অনিচ্ছায় জনপ্রিয়তা ও সুখ্যাতি অর্জন করে, তাহলে তা অপছন্দনীয় নয়, বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অপ্রত্যাশিত নিয়ামত হিসেবে শুকর আদায় করবে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন কোনো বান্দাকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, তখন জিবরাইল (আ.)-কে ডেকে বলেন, আমি অমুককে ভালোবাসি, অতএব তুমিও তাকে ভালোবাসো। জিবরাইল (আ.) আসমানবাসীর মধ্যে তা ঘোষণা করেন। অতঃপর জমিনবাসীর অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা অবতীর্ণ হয়। এটাই আল্লাহর বাণীতে ফুটে উঠেছে, ‘যারা ঈমান আনয়ন করেছে এবং উত্তম কার্য সম্পাদন করেছে, শিগগিরই দয়াময় আল্লাহ (লোকদের অন্তরে তাদের প্রতি) ভালোবাসার উদ্রেক করবেন [সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ৯৬]। (তিরমিজি, হাদিস : ৩১৬১, মুসলিম, হাদিস : ২৬৩৭)

আল্লাহ তাআলা আমাদের আত্মপ্রচার থেকে নিরাপদ রাখুন। আমিন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments