Saturday, July 20, 2024
spot_img
Homeকমিউনিটি সংবাদ USAইরাক যুদ্ধে কলকাঠি নাড়ানো ব্যক্তিরা এখন কে কোথায়?

ইরাক যুদ্ধে কলকাঠি নাড়ানো ব্যক্তিরা এখন কে কোথায়?

২০ বছর আগে যখন ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তখন বিশ্বের মানুষ হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সবচেয়ে বেশি নাম শুনেছেন। কিন্তু সেই যুদ্ধের পেছনে ভূমিকা ছিল আরও অনেক ব্যক্তির।

ইরাক যুদ্ধে সাড়ে চার হাজারের বেশি মার্কিন সেনা আর আনুমানিক এক লাখ ২০ হাজার ইরাকি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ২০ বছর পার হলেও এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আসেনি ইরাকে।

ইরাক যুদ্ধের ২০ বছর পূর্তিতে বিবিসি জানার চেষ্টা করেছে, সেই যুদ্ধের পেছনে মূল ভূমিকা রাখা ব্যক্তিরা এখন কোথায় কেমন রয়েছে।

জর্জ ডব্লিউ বুশ

ইরাক যুদ্ধের মাত্র দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নাইন ইলেভেনের মুখোমুখি হতে হয় জর্জ ওয়াকার বুশ বা জর্জ ডব্লিউ বুশকে। সেই সময় মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে মিলে আফগানিস্তানে অভিযান চালিয়ে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন বুশ।

এর প্রায় দেড় বছরের মাথায় তিনি ইরাকে অভিযান শুরু করেন।

তার আগে ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বুশ প্রশাসন নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নীতি ঘোষণা করে, যেখানে বলা হয় যে, জৈবিক, রাসায়নিক বা পারমাণবিক অস্ত্র, গণ বিধ্বংসী অস্ত্রের অধিকারী কোন সন্ত্রাসবাদী বা দুর্বৃত্ত দেশ দ্বারা যুক্তরাষ্ট্র যদি হুমকি মুখোমুখি হয়, তাহলে সেটা ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।

দুই মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ নতুন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে, যেখানে অস্ত্র পরিদর্শকদের ইরাকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়। কিছুদিন পরেই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে, নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা মানছে না ইরাক এবং তাদের ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র আছে।

অবশেষে মার্চের ১৭ তারিখে সাদ্দাম হোসেনকে পরিবার নিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরাক ছাড়ার সময়সীমা বেধে দেন প্রেসিডেন্ট বুশ। ৪৮ ঘণ্টা পরেই শুরু হয় অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম। 

পরবর্তীতে ইরাকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র না পাওয়া এবং ইরাক যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হয়ে ওঠায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন প্রেসিডেন্ট বুশ।

ইরাক যুদ্ধ নিয়ে নানারকম বিতর্ক এবং সমালোচনা থাকার পরেও ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জন কেরিকে হারিয়ে ২০০৪ সালের নির্বাচনে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বুশ।

তার মেয়াদ ২০০৯ সালে শেষ হওয়ার পর টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে ফিরে যান বুশ। সেখানে তিনি জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি তৈরি করেছেন। সেখানে জর্জ ডব্লিউ বুশ পলিসি ইন্সটিটিউট এবং অফিস অফ দি জর্জ ডব্লিউ বুশ ফাউন্ডেশন রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে প্রকাশ্যে খুব একটা আসেননা বুশ।

টনি ব্লেয়ার

ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন স্যার অ্যান্টনি চার্লস লিনটন ব্লেয়ার, যিনি টনি ব্লেয়ার নামেই বেশি পরিচিত।

ইরাক যুদ্ধ নিয়ে পরবর্তীতে স্যার জন শিলকটের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০০২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর হাউজ অব কমন্সে টনি ব্লেয়ার ইরাকের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার যে প্রতিবেদন তুলে ধরেন, সেখানে তাদের সম্ভাব্য হুমকি হিসাবে তুলে ধরা হয়। ভবিষ্যতের কোন একপর্যায়ে সেটা সত্যি হয়ে উঠতে পারে।‘

শিলকট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে ইরাককে নিরস্ত্র করার পদক্ষেপ বিবেচনা না করেই ব্রিটেন ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে।

তবে ওই প্রতিবেদনের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে পরবর্তীতে টনি ব্লেয়ার একটি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, কোন অজুহাত না দিয়েই ইরাক যুদ্ধের পরিণতি তিনি মেনে নিয়েছেন।

কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন, ‘শয়তান’ সাদ্দাম হোসেনের কবল থেকে যেন ইরাকের জনগণ মুক্তি পায় এবং কোনরকম জাতিগত সহিংসতার শিকার না হয়।

যুদ্ধে কিছু ভুলের জন্য তিনি দুঃখ, অনুশোচনা ও ক্ষমা চাইলেও তিনি মনে করেন, সাদ্দাম হোসেনকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।

যুদ্ধের পরেও আরও চার বছর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন টনি ব্লেয়ার। তিনি হলেন যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে এই পদে দায়িত্ব পালনকারী কোন ব্যক্তি।

ইরাক যুদ্ধে সরকারের নীতি নিয়ে নানারকম সমালোচনার পরেও তার নেতৃত্বে ২০০৫ সালের মে মাসের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে লেবার পার্টি।

তবে সেই সময় দলের ভেতর নানারকম সমালোচনা এবং বেশ কয়েকজন জুনিয়র মন্ত্রীর পদত্যাগের পর ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করেন যে, তিনি এক বছরের মধ্যেই পদত্যাগ করবেন।

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলছেন, সেই সময় যারা মিত্র হিসাবে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে রাজনৈতিকভাবে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার দিকে বেশি এগিয়েছেন। তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের এই ভূমিকার জন্য তাদের দলগুলো পরবর্তী নির্বাচনে বড় রকমের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। 

স্কটিশ পার্লামেন্টে ২০০৭ সালের মে মাসে বড় ধরনের পরাজয় এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে স্থানীয় জোটের কাছে ক্ষমতা হারানোর পর প্রধানমন্ত্রী পদ এবং হাউজ অব কমন্সের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন টনি ব্লেয়ার।

এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া আর জাতিসংঘ মিলে গঠিত ‘কোয়েট’ এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন।

তবে টনি ব্লেয়ার আলোচনায় ফিরে আসেন ২০১৭ সালের মার্চ মাসে, যখন তিনি দি টনি ব্লেয়ার ইন্সটিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের ঘোষণা দেন।

রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ২০২১ সালে টনি ব্লেয়ারকে নাইটহুড উপাধি দেন।

ডিক চেনি

বুশ প্রশাসনের জ্বালানি নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণে মূল ভূমিকা রেখেছেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি।

ডিক চেনি গণমাধ্যমের সামনে হাজির হয়ে ২০০৩ সালের ১৬ই মার্চ দাবি করেছিলেন যে, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। পরবর্তীতে অবশ্য তার সেই তথ্য ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়।

আমেরিকান গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ডিক চেনির সাবেক প্রতিষ্ঠান হ্যারিবার্টন ইরাক পুনর্গঠনের একাধিক লোভনীয় কাজ পায় আমেরিকান সরকারে কাছ থেকে।

ডিক চেনি ২০০৯ সালে অফিস ছাড়ার পর মাঝে মাঝে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ওবামা প্রশাসনের নীতি নিয়ে তিনি অনেক সমালোচনা করেছেন।

ডিক চেনি ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

কংগ্রেসে ডিক চেনির সাবেক আসনে পরের বছর তার মেয়ে লিজ নির্বাচিত হলে ডিক চেনি বলেন, প্রয়োজনে যেকোনো পরামর্শ দিয়ে তিনি পাশে থাকবেন।

পরবর্তীতে তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন।

ডোনাল্ড হেনরি র‍্যামসফিল্ড

তিনি ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। ফলে পদের কারণেই আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে তাকে প্রধান ভূমিকা রাখতে হয়েছে।

তার দপ্তর এমন তথ্য উপস্থাপন করেছিল যে, আল-কায়েদার সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

ফ্রান্স ও জার্মানি ইরাক যুদ্ধে বিরোধিতা করায় তাদের ‘ওল্ড ইউরোপ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন র‍্যামসফিল্ড।

২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো মিলিয়ে আটজন জেনারেল মিলে সামরিক পরিকল্পনা ও কৌশলের বিষয়ে অদক্ষ দাবি করে হেনরি র‍্যামসফিল্ডের পদত্যাগের দাবি জানান। নভেম্বরে পদত্যাগ করেন র‍্যামসফিল্ড।

এরপর হেনরি র‍্যামসফিল্ড বেশ কয়েকটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন।

অবসর জীবন কাটানোর সময় ২০২১ সালে তিনি মারা যান।

পল উলফোভিৎস

ইরাকে অভিযান শুরুর আগে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র সংক্রান্ত দাবি তৈরির পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী পল উলফোভিৎস।

তার নেতৃত্বে আট থেকে নয়জন বিশ্লেষকের সমন্বয়ে ‘অফিস অফ স্পেশাল প্ল্যানস’ নামে একটি বিশেষ সেল তৈরি করা হয়, যাদের কাজ ছিল সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে আল কায়েদার যোগাযোগের সূত্র খুঁজে বের করা।

কয়েকমাস ধরে গবেষণার পর এই সেলটি বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে ইরাকে সম্ভাব্য বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার তথ্য নিয়ে হাজির হয়।

পরবর্তীতে ২০০৫ সালে পল উলফোভিৎসকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হিসাবে মনোনীত করেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। ২০০৭ সালে কেলেঙ্কারির জের ধরে তাকে পদত্যাগ করতে হয়।

বর্তমানে তিনি আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের ভিজিটিং স্কলার হিসাবে কাজ করছেন।

আহমেদ শালাবি

আহমেদ আবদেল হাবি শালাবি ইরাকি একজন রাজনৈতিক, যনি সে দেশের ইরাকি ন্যাশনাল কংগ্রেস দল প্রতিষ্ঠা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করার পর ইরাকের ক্ষমতাসীন কাউন্সিল অব ইরাকের প্রেসিডেন্ট হিসাবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় থাকার সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন শালাবি। সেই সময় বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।

যে সূত্রের বরাত দিয়ে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের দাবি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য, সেটি শালাবির দলের একজনের কাছ থেকে পাওয়া বলে ধারণা করা হয়। সেই সূত্র দাবি করেছিল, যে তিনি এমন একটি রাসায়নিক ল্যাবে কাজ করতেন, যেখানে অস্ত্র বানানো হতে পারে।

মার্কিন বাহিনী ২০০৩ সালে ইরাকের দখল নেয়ার পর তাদের সাথেই আহমেদ শালাবি ইরাকে প্রবেশ করেন। এরপর ইরাকের অন্তবর্তীকালীন সরকারে প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন শালাবি। যদিও পরবর্তীতে পেন্টাগনের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়।

পরবর্তীতে তিনি ইরাকের সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০১৫ সালে মারা যান।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments