Wednesday, May 22, 2024
spot_img
Homeধর্মআল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাস

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাস

মিসর। সৌন্দর্য ও সৌকর্যের লীলাভূমি। নবী ইউসুফ ও মুসা (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত তীর্থভূমি। একসময়ের ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি ও দ্বিনি ঐতিহ্যের সূতিকাগার।

বহু সাহাবি ও মনীষীর পদধূলিতে ধন্য এই শহর আজও অধুনা বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইলমের প্রাণকেন্দ্র।

মিসরে ইসলামের আগমন : মিসরে সর্বপ্রথম ইসলামের ঝাণ্ডা উড্ডীন করেছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)। পরবর্তী সময়ে তাঁর হাত ধরেই মিসরের আকাশে উদিত হয় ইসলামের নতুন সূর্য। তিনি মিসরের ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূলভিত্তি রচনা করেন। তাঁর উদ্যোগেই সেখানে মসজিদ ও দ্বিনি প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন হয়। ‘জামিউ আমর ইবনুল আস’ মিসরের প্রথম মসজিদ। মিসরের প্রসিদ্ধ ফুসতাত নগরীও তাঁর হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়। সেটাই ছিল তত্কালীন মিসরের রাজধানী। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন আরব গোত্র ও সম্প্রদায় মিসরে বসতি স্থাপন করে। ফলে ক্রমে সেখানে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রসার ঘটতে থাকে। প্রখ্যাত মুজতাহিদ লাইস ইবনে সাদ, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম বুতি (রহ.) মিসরের মাটিতেই তাঁদের ইলমের বিকাশ ঘটান।

আল-আজহার প্রতিষ্ঠা : মিসরের জামে আজহারকে গণ্য করা হয় ইসলামী জ্ঞানের সুপ্রাচীন বিদ্যাপীঠ ও ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির সূতিকাগার হিসেবে। ইসলামী ঐতিহ্য-সংস্কৃতি রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির আছে যুগান্তকারী ভূমিকা। ৯৭০ বা ৯৭২ ইংরেজি সাল মোতাবেক আরবি ৩৬১ হিজরি সনের ৭ই রমজান শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে তত্কালীন ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজ লিদ্বিনিল্লাহর নির্দেশে তাঁর সেনাপতি জওহর সিকিল্লি ফাতেমির তত্ত্বাবধানে মিসরের রাজধানী কায়রোতে ইসলামী শিক্ষার আলো ছড়াতে আল-আজহার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে এটি মসজিদরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেও ৯৭৫ সালে শায়খ সাইয়েদ আল ফারিদির প্রধান শায়খ নিয়োগের মাধ্যমে এটি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে  রূপান্তরিত হয়। সেই সময় শিয়া সম্প্রদায়ের ‘ইসমাইলিয়া’ মতবাদ প্রচারে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহূত হলেও ৫৮৯ হিজরিতে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি মিসর বিজয় করার পর আল-আজহারকে শিয়া প্রভাবমুক্ত করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আল-আজহার আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মতাদর্শের অনুসারী।

আধুনিকায়ন : ঐতিহ্যবাহী এই দ্বিনি প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ১৯৬১ সালে আল-আজহারকে জাতীয়করণ করেন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেন। ফলে দেশ-বিদেশের বহু শিক্ষার্থীর আল-আজহারে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী, ১৫ হাজার শিক্ষক ও ১৩ হাজারের অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে এই প্রতিষ্ঠানে। তা ছাড়া ১০৫টির অধিক রাষ্ট্রের প্রায় ৪০ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী দ্বিনি ইলম ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখছে এখানে। আন্তর্জাতিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা আছে আল-আজহারে।

শিক্ষা কারিকুলাম : ঐতিহ্যবাহী দ্বিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সূচনালগ্নে তিনটি ধর্মীয় অনুষদ তথা ধর্মতত্ত্ব, শরিয়া ও আরবি ভাষা অনুষদ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের আল-আজহারকে জাতীয়করণের মাধ্যমে অনেক সেক্যুলার বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন— ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, ফার্মেসি, মেডিসিন, প্রকৌশল, কৃষিসহ মৌলিক ২৩টি অনুষদ ও শতাধিক বিভাগ।   ২৩টি অনুষদের মধ্যে ছয়টি অনুষদ ও ২১টি বিভাগ ধর্ম সম্পর্কিত, বাকিগুলো জেনারেল বিভাগ।

ধর্মীয় ছয়টি অনুষদ হলো : ১. শরিয়া ও আইন অনুষদ, ২. ধর্মতত্ত্ব অনুষদ, ৩. আরবি ভাষা অনুষদ, ৪. ইসলামী শিক্ষা ও আরবি অনুষদ, ৫. ইসলামী দাওয়া অনুষদ, ৬. ইসলামী বিজ্ঞান অনুষদ।

বিশিষ্টজনদের মূল্যায়ন : প্রখ্যাত আরবি সাহিত্যিক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ লিখেছেন, ‘যুগ যুগ ধরে জামে আজহার যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামী বিশ্বের ইলমি প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। একই সঙ্গে সাধারণ জনগোষ্ঠী ও মুসলিম শাষকবর্গের শিক্ষা-দীক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক আধ্যাত্মিক প্রাণকেন্দ্র। ’

কুলিজ কালচারাল সেন্টার তাদের অভিমতে লিখেছেন এভাবে, ‘আল-আজহার এমন একটি প্রসিদ্ধ বিদ্যাপীঠ, যাতে প্রতিবছর বিভিন্ন ইসলামী রাষ্ট্র থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলমপিপাসু পাড়ি জমায়। গোটা বিশ্বে আল-আজহারকে সুপ্রাচীন ও বিখ্যাত ইলমি মারকাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহসহ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমকালীন বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে পাঠদান করা হয়। ’

উল্লেখযোগ্য শায়খ যাঁরা : ‘শায়খুল আজহার’ আল-আজহারের সর্বোচ্চ পদ। যিনি এই পদে নির্বাচিত হবেন তিনি সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হবেন। ১০৯০ হিজরিতে শাইখুল আজহারের পদটি চালু হয়। সাধারণত এই পদে যাঁরা আসেন তাঁরা চার মাজহাবের কোনো এক মাজহাবের অনুসারী হয়ে থাকেন।

শায়খ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মালেকি, শায়খ ইবরাহিম বিন মুহাম্মদ শাফেয়ি, শায়খ আব্দুর রহমান বিন ওমর হানাফি, শায়খ মুহাম্মদ আব্বাসি হানাফি, শায়খ মোহাম্মদ বিন সালেম হানাফি প্রমুখ। বর্তমান শায়খুল আজহার আহমেদ আততায়েবও একজন মালিকি মাজহাবের অনুসারী।

কৃতী শিক্ষার্থী যাঁরা : সুপ্রাচীন এই বিদ্যাপীঠ থেকে যুগে যুগে কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহসহ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর বিশেষ যোগ্যতা অর্জন করে হাজার হাজার পণ্ডিত ব্যক্তি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁদের অন্যতম হলেন প্রসিদ্ধ হাদিসবিশারদ আল্লামা ইমাম ইবনে হাজার (মৃত্যু ৮৫২), ইমাম সাখাবি (মৃত্যু ৬৪৩), ইমাম সুয়ুতি (মৃত্যু ৯১১), জাহেদ কাউসারির (মৃত্যু ১৩৭১) মতো যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকিহ।

তথ্যঋণ : আল-আজহারু ফি আলফি আমিন, আল-আজহারু জামিয়ান ও জামিয়াহ, মানাহিজুল আজহারিয়্যা

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments