সাগর আসলে কতটুকু গভীর—এই প্রশ্নের সঠিক জবাব কারো কাছে নেই! সমুদ্রবিজ্ঞান মতে, এই পৃথিবী নামক গ্রহে সমুদ্রের সর্বোচ্চ গভীরতায় বিন্দুমাত্রও আলো নেই!

গভীর সমুদ্র অঞ্চলটি হলো সমুদ্রের নিম্নতম স্তর। এটি থার্মোকলিনের নিচে এবং সমুদ্রতলের ওপরে এক হাজার ৮০০ মিটার বা তারও বেশি গভীর। সামান্য পরিমাণ আলোও সমুদ্রের এ অংশে প্রবেশ করে না।

সেই সঙ্গে সেখানে বসবাসরত বেশির ভাগ জীব বেঁচে থাকার জন্য ফোটিক জোন বা আলোক অঞ্চলের জৈব পদার্থের ওপর নির্ভর করে।

এ কারণে বিজ্ঞানীরা একবার ধরে নিয়েছিলেন গভীর সমুদ্রে জীবনের সংখ্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। কিন্তু এর বিপরীতে, পরবর্তী সময়ে প্রতিটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে গভীর সমুদ্রে প্রাণের সংখ্যা প্রচুর! নিশ্চয়ই সব প্রশংসা সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। কোরআন বলছে, ‘অথবা (ওদের কর্মের উপমা) গভীর সমুদ্রতলের অন্ধকার সদৃশ, তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ যাকে আচ্ছন্ন করে, যার ঊর্ধ্বদেশে ঘন মেঘ, অন্ধকারের স্তরের ওপর স্তর। কেউ নিজ হাত বের করলে তা দেখতেই পায় না। আর আল্লাহ যাকে আলো দান করেন না, তার জন্য কোনো আলো নেই।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৪০)

চলুন, পৃথিবীর সাগরের গভীরতা সম্পর্কে কিছুটা জেনে আসা যাক!

আপনি যদি ভূমি থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতার কিছুও সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন, তবু আপনার কাছে আরো কয়েক মাইল অঞ্চল ফাঁকা পড়ে থাকবে। এর মানে হচ্ছে, সমুদ্রের গভীরতা এতটাই! সবচেয়ে গভীর বিন্দুটি সমুদ্রেই অবস্থিত।

পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ জীবনের আবাসস্থল এই সমুদ্র। সব সমুদ্রের মোট পানির পরিমাণ এতই বেশি, যা দিয়ে ৬৮৫ মাইল দৈর্ঘ্য এবং একই মানের প্রস্থ বিশিষ্ট একটি বাথটাব অনায়াসে পূর্ণ করা যাবে!

নীল তিমির কথাই ধরা যাক! এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী। নীল তিমি সাধারণত সাগরের ৩৩০ ফুট গভীরে শিকার ধরে থাকে। এই অঞ্চলটি ‘ওয়েল লিট জোন’ নামে পরিচিত।

৭০০ ফুট নিচে, অর্থাৎ আরো গভীরে টঝঝ ঞত্রঃড়হ নামে প্রথম সাবমেরিন চালনা করা হয়েছিল। জলপথে প্রদক্ষিণের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য ১৯৬০ সালে এ সাবমেরিন চালনা করা হয়।

মুক্ত সাঁতারে সর্বোচ্চ ৮৩১ ফুট পর্যন্ত মানুষ যেতে পেরেছে, যা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চাপ ২৬ গুণ বেশি, যার সহ্যক্ষমতা বেশির ভাগ মানব ফুসফুসেরই নেই!

কিন্তু নীল তিমি এ চাপ সহ্য করতে পারে। এক হাজার ৬৪০ ফুটের মতো গভীরে গিয়ে তারা বিশাল স্কুইড শিকার করে থাকে।

দুই হাজার ৪০০ ফুট গভীরতা থেকে নিচের অঞ্চলকে ‘ডেঞ্জার জোন’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। কেননা এটি পারমাণবিক আক্রমণাত্মক সাবমেরিনের জন্য বিপজ্জনক। অবশ্য যেকোনো গভীরতাই সাবমেরিনের জন্য বিপজ্জনক। কেননা বেশি চাপে সাবমেরিনের বাইরের দেয়াল ভেতরে ঢুকে গিয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

দুই হাজার ৭২২ ফুট গভীরতায় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং বুর্জ খলিফা পৌঁছাতে পারবে।

আরেকটি ছোট্ট কথা হলো, তিন হাজার ২৮০ ফুট গভীরতা এতই বেশি যে সূর্যের আলো সেখানে আর পৌঁছাতে পারে না। এটিই হলো ‘মিড নাইট জোন’। এখানকার অনেক প্রাণীই চোখে দেখতে পায় না। যেমন—সাত হাজার ৫০০ ফুট গভীরতার চোখহীন চিংড়ির কথাই ধরা যাক! এরা নিজেদের তুলনামূলক গরম স্থানে, পানির নিচের আগ্নেয়গিরির কাছে নিয়ে যায়!

এই গভীরতায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের সামান্য কিছু ওপরে থাকে। কিন্তু পানি হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের (সামুদ্রিক আগ্নেয়গিরির বাইরের ছিদ্র) পাশাপাশিই থাকে। এতে পানির তাপমাত্রা ৮০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্তও উঠতে পারে।

৯ হাজার ৮১৬ ফুট পর্যন্ত স্তন্যপায়ীদের চলাচল রেকর্ড করা হয়েছে। যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে এটাই সর্বোচ্চ গভীরে সাঁতরানোর রেকর্ড। আর এই রেকর্ডের দাবিদার হলো কিউভিয়ার বিকড নামের একটি তিমি। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই কিউভিয়ার বিকড তিমিটিও টাইটানিককে খুঁজে পায়নি। আর সেটির কারণ, টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে ১২ হাজার ৫০০ ফুট গভীরতায়, যা বিস্ময়কর! এই স্থানে  ভূপৃষ্ঠের তুলনায় চাপ ৩৭৮ গুণ বেশি।

এই গভীরতায়ও ফ্যাংটুথ, হ্যাগফিশ, ডাম্বো অক্টোপাসের মতো সামুদ্রিক জীবন খুঁজে পাওয়া যায়। ডাম্বো অক্টোপাসটি পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরে বসবাসকারী অক্টোপাস।

২০ হাজার ফুট গভীর অঞ্চলকে বলা হয় ‘হ্যাডাল জোন’। এটি এমন এক অঞ্চল যেটিকে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মতো সাগরের গভীরতম খাদ বলা হয়। যদি আপনি মাউন্ট এভারেস্টকে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মধ্যে প্রবেশ করান, তাহলে এর চূড়া ২৯ হাজার ২৯ ফুট গভীরতায় পৌঁছাবে, যা এখন পর্যন্ত দুটি গভীরতম ক্রু মিশনের সঙ্গে তুলনাযোগ্য নয়।

২০১২ সালে ডিরেক্টর জেমস ক্যামেরন ‘ডিপ সি চ্যালেঞ্জার মিশন’-এর জন্য ৩৫ হাজার ৭৫৬ ফুট গভীরে নামেন। কিন্তু তিনি সমুদ্রবিদ জ্যাক পিকার্ড ও লেফটেন্যান্ট ডন ওয়ালশের ১৯৬০ সালের রেকর্ড ভাঙতে ব্যর্থ হন। পিকার্ড ও ওয়ালশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ৭৯৭ ফুট গভীরে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। তখন থেকেই বিজ্ঞানীরা ‘কাইকো’সহ অর্ধডজনেরও বেশি মানুষবিহীন সাবমেরিন পাঠিয়েছেন। মূলত গভীর তলদেশ সম্পর্কে বিশদভাবে জানার জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘কাইকো’ সাবমেরিনটি ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সমুদ্র তলদেশ থেকে ৩৫০টিরও বেশি প্রজাতি সংগ্রহ করেছে। তবে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন সেখানে এক হাজারেরও বেশি সামুদ্রিক প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো এখনো আমরা আবিষ্কার করতে পারিনি।

পৃথিবীর সমুদ্রগুলোর মাত্র ৫-১০ শতাংশ এখন পর্যন্ত মানুষ আবিষ্কার করতে পেরেছে। আমাদের নিচ দিয়ে যে গভীর, অন্ধকার পৃথিবী প্রবহমান, সেটিই আমরা মাত্র বুঝতে শুরু করেছি। জানার আরো কত কী বাকি!

অ্যাবাউট ইসলাম অবলম্বনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English