Monday, November 29, 2021
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামআমলাতন্ত্রের অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ অবস্থান

আমলাতন্ত্রের অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ অবস্থান

ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রায়ই শোনা যায়, অসৎ আমলারা রাজনীতিবিদদের ভ্রষ্ট ও দুর্নীতিবাজ হতে পথ দেখান। প্রতিবাদস্বরূপ বলা হয়, তা সত্যি নয়। বরং রাজনীতিবিদগণ চাপ দিয়ে আমলাদের তল্পিবাহকে পরিণত করেন। অথচ লোকপ্রশাসনের তত্ত্বগত দিক থেকে বলা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। পণ্ডিতদের মতে, সর্বাবস্থায় আমলাতন্ত্রের অবস্থান হতে হয় অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ।

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং তর্ক-বিতর্কের পরেও আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমলাতন্ত্র ছাড়া অচল। শাসন ও প্রশাসন পরিচালনা করতে আমলাতন্ত্র লাগবেই। তবে, সেটা হতে হবে অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ।

বস্তুতপক্ষে, আমলাতন্ত্র বা ইংরেজি ‘Bureaucracy’ শব্দটি ফরাসি শব্দ ‘ব্যুরাে’ (Bureau) এবং গ্রিক শব্দ ক্রেটিন (Kratein)-এর সমাহার।লেখার টেবিল বা ডেস্ক অর্থে ব্যুরাে এবং শাসন অর্থে ক্লেটিন শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তাই ব্যুৎপত্তিগত অর্থে আমলাতন্ত্র বলতে বােঝায় ‘টেবিলে বসে পরিচালিত সরকার বা শাসন ব্যবস্থাকে’ (Desk-government)I

প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আধুনিক শাসন ব্যবস্থায় সরকারের রাজনৈতিক অংশ বা স্থায়ী অংশ, মূলত অভিজ্ঞ, বেতনভুক কর্মচারীবৃন্দ অর্থাৎ আমলাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা আমলাতন্ত্র নামে পরিচিত। এককথায় বলা যায়, সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সংগঠন বা গােষ্ঠীবিশেষ হল আমলাতন্ত্র।

অধ্যাপক ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর ‘Essays in Sociology’ গ্রন্থে আমলাতন্ত্র সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র হল প্রশাসনের একটি ব্যবস্থা, যার বৈশিষ্ট্য দক্ষতা, অপক্ষপাতিত্ব এবং মানবিকতার অনুপস্থিতি।’ অ্যালমন্ড ও পাওয়েলের অভিমত হলো, ‘আমলাতন্ত্র সরকারের অরাজনৈতিক অংশ, যা স্থায়ী।’

আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কিংবা পক্ষ-নিরপেক্ষ বিতর্কের পটভূমিতে তাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। তাহলে এদের প্রকৃত স্বরূপ এবং সঠিক অবস্থান সম্পর্কে অনুধাবণ করা সহজ হবে।

স্থায়িত্ব: আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তাদের পদের বা চাকরির স্থায়িত্ব। বিভিন্ন শর্ত ও নিয়ম মেনে তারা নিযুক্ত হন এবং নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সেই পদে বহাল থাকতে পারেন, যদি না অসাংবিধানিক কাজকর্মের অভিযােগে বরখাস্ত হন। যাইহােক, এককথায় আমলাতন্ত্র হল স্থায়ী প্রশাসকমণ্ডলী।

নিরপেক্ষতা: আধুনিক শাসনব্যবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলেও তাদের মতাদর্শ ও কর্মসূচি একরকম নয়। আমলাবাহিনী বা সরকারি কর্মচারীদের সবসময় নিরপেক্ষতা অবলম্বন করতে হয়, যাতে দলীয় মতাদর্শ ও কর্মসূচি প্রশাসনকে কোনােভাবে কলুষিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। এর জন্য যে রাজনৈতিক দলই শাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হােক-না-কেন, আমলারা সেই দলীয় সরকারের অন্তর্ভুক্ত থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকেন।

পরিবর্তনশীলতা বা নমনীয়তা: আমলাদের দলনিরপেক্ষভাবে কার্য সম্পাদন করতে হয়, কোনাে বিশেষ নীতির প্রতি তাদের আনুগত্য পােষণ করা উচিত নয়। এর জন্যই তাদেরকে পরিবর্তনশীল বা নমনীয় মানসিকতার অধিকারী হতে হয়। নমনীয় বা পরিবর্তনশীল মানসিকতা নিয়ে কাজ করা আমলাতন্ত্রের একটি উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্য। আমলাদেরকে দল নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হয় আবার বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষমতাসীন দলের কাজকর্মের সঙ্গে নিজেদেরকে সংযুক্ত করতে হয়।

প্রশাসনের নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখা: গণতন্ত্রে সরকারের পরিবর্তন ঘটতেই পারে, এমন হলে তখন সরকারের স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে প্রশাসনের কাজকর্মের গতি, সচলতা ও নিরবচ্ছিন্নতা বজায় থাকে। ফলে প্রতিনিধিত্বমূলক দলীয় সরকারের পরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নতা রক্ষার গুরু দায়িত্ব আমলারা পালন করে থাকেন।

দায়িত্বশীলতা: আমলাদের কাজকর্মের কোনাে দায়বদ্ধতা নেই এমন নয়, তারা তাদের কাজকর্মের জন্য প্রত্যেক বিভাগীয় মন্ত্রণালয়ের কাছে চাকরি বিধির মাধ্যমে দায়বদ্ধ থাকেন। তাই দায়িত্বশীলতাও আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

শৃঙ্খলাবােধ: আমলাতন্ত্রকে কঠোর শৃঙ্খলাবােধ মেনে কাজ করতে হয়। সরকারি নীতিকে বাস্তবায়িত করার জন্য শৃঙ্খলাবোধ অপরিহার্য, প্রয়ােজনে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ পর্যন্ত করা হয়ে থাকে।

লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকেন: আমলাবাহিনী সরকারের হয়ে সকল রকম কাজকর্ম করেন। তবে সরকারি কাজের সুনাম বা দুর্নামের ভাগীদার তারা হন না, সরকারের সাফল্য-অসাফল্যের যাবতীয় সুনাম ও দুর্নাম সরকার বা মন্ত্রীরা ভােগ করেন। সরকারি কর্মচারীগণ বা আমলাগণ সবসময় লােকচক্ষুর অন্তরালে বা অজ্ঞাতনামা থাকেন।

নিয়মানুবর্তিতা: কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ আমলাতন্ত্রের একটি উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্য। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কাজকর্ম ও কাজকর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য নিয়মানুবর্তিতা পালন অপরিহার্য। আমলারা নিজেদেরকে প্রশাসনিক কাজকর্মের মধ্যে আত্মনিয়ােগ করে রাখেন যাতে সর্বসাধারণের সর্বাধিক কল্যাণ সাধন করা সম্ভব হয়।

স্তরবিন্যাস: আমলাতন্ত্রে স্তরবিন্যস্ত কর্মচারীদের মধ্যে পিরামিডের মতাে কাঠামােবিন্যাস পরিলক্ষিত হয়। এইরকম কাঠামােই বর্তমান আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচিত হয়। এই পিরামিড কাঠামাের মধ্যেই সুনির্দিষ্ট থাকে কোন শ্রেণির আমলারা কী কী কাজ শাসন ব্যবস্থায় থেকে সম্পাদন করবে। আমলাদের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থেকেই কার্যকলাপ সম্পূর্ণ করতে হয়।

রুটিনমাফিক কাজকর্ম: সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট বিধি-নীতির দ্বারা আমলাতন্ত্র পরিচালিত হয়। শাসনকার্য পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্রের কাজকর্মকে একটি নির্দিষ্ট রুটিনের মধ্যে বেঁধে দেওয়া হয়। এর জন্যই শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আমলাদের কোনােরকম বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় না।

নিয়ােগ, কার্যকাল, পদোন্নতি: সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা-পদ্ধতি মাধ্যমে সরকারি আমলাবাহিনীর নিয়ােগ ও কার্যকাল নির্ধারিত হয়। কাজের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং সিনিয়রিটির ভিত্তিতে তাদের পদোন্নতি হয়। তদবির বা স্বজনপ্রীতির পরিবর্তে যোগ্যতা, বিশেষ প্রশিক্ষণ, শিক্ষাগত যােগ্যতা, অভিজ্ঞতা প্রভৃতির উপর বেশি জোর দেওয়া হয়ে থাকে।

বিশ্বব্যাপী সকল সরকারেই আমলাতন্ত্রের উপস্থিতি অপরিহার্য হলেও উন্নয়নশীল দেশে আমলাতন্ত্রের অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় এবং নানা বিতর্ক চলে। এতে গণতান্ত্রিক শাসনের শরীরে দুর্নাম লাগে এবং প্রকৃত সুশাসনের ক্ষেত্রে অবক্ষয় সূচিত হয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এতে ক্ষুণ্ণ হয়। ফলে রাজনৈতিক দল বা সরকার এবং আমলাতন্ত্রের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য ও সীমারেখা থাকা অপরিহার্য, যাতে সরকার ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে ভারসাম্য থাকে এবং আইনানুগভাবে আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় ও আমলাতন্ত্রের অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত হয়।

এসব নিয়ম প্রতিপালন করা প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি কর্তব্য। কারণ, শেষ পর্যালোচনায় সাফল্য ও ব্যর্থতার পূর্ণ দায়ভার বর্তায় সরকার পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দলের উপর, আমলাতন্ত্র বা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের উপর নয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments