Wednesday, June 12, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামআন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল নেই কেন

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল নেই কেন

আমরা যেসব পণ্য ও কাঁচামাল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করি, সেগুলোর স্থানীয় দামের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের দামের একটা প্রভাব থাকে এবং সেটাই স্বাভাবিক। তাই কোনো সময় কোনো পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং শেষ পরিণতিতে ভোক্তাকে তা বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমলে স্থানীয় বাজারে সেই অনুপাতে এর প্রভাব পড়তে দেখা যায় না। বরং জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে এর উলটোটাই দেখলাম আমরা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমছে। বৃহস্পতিবার রাতে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম নেমে আসে ৯৩ দশমিক ৮১ ডলারে, যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সর্বনিম্ন। অথচ শুক্রবার বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অকটেনের ক্ষেত্রে এ দাম বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ, প্রায় ৫২ শতাংশ। ডিজেলের ক্ষেত্রে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির এই হার অযৌক্তিক ও অকল্পনীয়। এর প্রভাব পড়বে আরও অনেক পণ্য ও সেবার মূল্যে। ফলে বেড়ে যাবে জীবনযাত্রার ব্যয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার কারণে আমরা যে পরিমাণ ভোগান্তির শিকার হই, দাম কমার ফলে সেই পরিমাণ স্বস্তি ভোগ করতে পারি না কেন? করোনা অতিমারি ও পরবর্তী সময়ে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে অনেক দেশই নিজ নিজ দেশের পণ্য রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহ কমে যায়, যার পরিণামে দাম বৃদ্ধি পায়। আমরা এর কুফল ভোগ করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু অতিসম্প্রতি দেশগুলো রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে, ফলে দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের ২৩ মে ও ৩১ জুলাইয়ের একটি তুলনামূলক দামচিত্র গত সপ্তাহে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যায়, ২৩ মে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন গমের দাম ছিল ৫০৬ ডলার; ৩১ জুলাই তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫৩ ডলারে। অর্থাৎ দাম কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। কিন্তু স্থানীয় বাজারে আটার দাম কমেছে মাত্র ৭ শতাংশ। দুই মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ৯৭০ ডলার, যা জুলাইয়ের শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ ডলারে। শতকরা হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম কমেছে ৩১ শতাংশ; পাম অয়েলের দাম কমেছে প্রায় ৩৬ শতাংশ (প্রতি টন ১ হাজার ৬৯০ ডলার থেকে কমে ১ হাজার ৭৫ ডলার)। অথচ আমাদের দেশে অভ্যন্তরীণভাবে ভোজ্যতেলের দাম কমেছে মাত্র ১০ শতাংশ। মসুর ডালের দাম ১৯ শতাংশ কমে টনপ্রতি ৭০৩ ডলার থেকে ৫৬৬ ডলারে নেমেছে, কিন্তু আমাদের কিনতে হচ্ছে আগের দামেই। চিনির দাম ৬ শতাংশ কমলেও আমাদের বাজারে কিছুটা বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমা সত্ত্বেও কেন আমরা সে পরিমাণ সুবিধা ভোগ করতে পারছি না, আমদানিকারকরা এর দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন-এক. বিশ্ববাজারে পড়তি দামের পণ্য এখনো দেশে না আসা; দুই. ডলারের দাম স্থানীয়ভাবে বেড়ে যাওয়া। প্রথমটি নিয়ে আমাদেরও কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। এ কথা ঠিক, বিশ্ববাজারে শনিবার দাম কমে গেলে রোববারেই সেই পণ্য স্থানীয় বাজারে আসবে না; পণ্য পরিবহণে কিছুটা সময় লাগবে। তাই দাম অপরিবর্তিত থাকার পেছনে যুক্তি আছে। কিন্তু যখন বিশ্ববাজারে শনিবার কোনো পণ্যের দাম বাড়ে, তখন রোববারেই কেন পণ্যের দাম বেড়ে যায়? তখন পণ্য কি জাহাজের পরিবর্তে ইন্টারনেটের ভেতর দিয়ে আসে? এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ইউরিয়া সারের দাম বৃদ্ধি করা। প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। পরের কথা হলো, যদি পড়তি দামের পণ্য দেশে না-ই এসে থাকে, তাহলে স্বল্প হারে হলেও পণ্যের দাম কমল কেন? লোকসান দিয়ে তো কেউ পণ্য বিক্রি করবে না। তার মানে হলো, বিশ্ববাজারে পড়তি দামের সংবাদ শুনে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার হার কিছুটা কমানো হয়েছে।

বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম যতই বাড়ুক বা কমুক, আমরা ন্যায্যমূল্যের অনেক বেশি দাম পরিশোধ করি। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, আমাদের আমদানি বাজারে প্রতিযোগিতা কম হওয়ায় আমরা প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এর পাশাপাশি বাজার মনিটরিংয়েও দুর্বলতা প্রকট। এ বিষয়ে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে সরু দানার আস্ত মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮১ টাকায়। আস্ত ডাল ভাঙাতে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ে ১২ থেকে ১৩ টাকা। এর মানে হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে সরু দানার মসুর ডালের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৯৪ টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হবে মিল মালিকের মুনাফা, পরিবহণ খরচ, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর মুনাফা। সেই সরু মসুর ডাল ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায়; বিপণন কোম্পানি মোড়ক লাগিয়ে বিক্রি করছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। এতটা পার্থক্য কি প্রত্যাশিত? সেজন্যই বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতার কথা উঠে আসে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল না পাওয়ার দ্বিতীয় কারণ হিসাবে টাকার অবনমন বা ডলারের দামবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এ কথা অনেকাংশে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। গত মে মাসের শেষের দিকে দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকা। এরপর থেকে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। বর্তমানে ব্যাংকে ডলারের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খোলাবাজারে ডলারের দাম উঠেছে ১১০ টাকায়। আমদানিকারকরা বলছেন, তাদেরকে এখন ঋণপত্র বা এলসি খুলতে ডলারপ্রতি ব্যয় করতে হচ্ছে ১০৫ টাকা। তাহলে দেখা যায়, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। বিশ্ববাজার থেকে সয়াবিন তেল আমদানি করতে এখন জাহাজভাড়াসহ টনপ্রতি খরচ পড়ছে ১ হাজার ৪০০ ডলার। মে মাসের ডলারপ্রতি ৮৬ টাকা ধরলে এক লিটার তেলের দাম হতো ১২০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে ডলারপ্রতি ১০৫ টাকা ধরলে লিটারপ্রতি দাম হয় ১৪৭ টাকা। কেবল ডলারের দাম বাড়ার কারণে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ২৭ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। ডলারের এই দাম বৃদ্ধির ফলে আমদানি করা গমে কেজিপ্রতি ৭ টাকা, চিনিতে ৮ টাকা, মসুর ডালে ১০ টাকা এবং গুঁড়া দুধে কেজিপ্রতি ৭১ টাকা বেশি দাম দিতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা আমাদের ডলার মজুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এ কারণে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যহ্রাসের সুফল ভোগ করতে পারছি না।

আমরা জানি, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে, যা উৎপাদন ও সেবার ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য। প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মাঝেমধ্যেই পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে। সরবরাহ ও চাহিদার এই ভারসাম্যহীনতাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, দাম বৃদ্ধির যে ভোগান্তি আমরা পোহাই, দাম কমলে যেন তার সুফলটা ঘরে তুলতে পারি। এর জন্য প্রয়োজন কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যাতে করে দাম কমলে বেশি বেশি মজুত করতে পারি এবং দামবৃদ্ধির আপতকাল মোকবিলা করতে পারি।

বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা সন্তোষজনক নয়। আমরা অনেক অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বাগ্বিতণ্ডায় সময়ক্ষেপণ করি; কিন্তু অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিকে নজর দিতে পারি না। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা মাত্র ১৩ লাখ টন। এ কারণে আমাদের প্রতিনিয়তই জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। সবচেয়ে বেশি মজুত সক্ষমতা রয়েছে ইস্টর্ন রিফাইনারির। প্রতিষ্ঠানটি ৫ লাখ ২ হাজার ২৯০ টন জ্বালানি মজুত করার সক্ষমতা রাখে। এর বাইরে বিপণনকারী সংস্থা পদ্মা অয়েলের চট্টগ্রামের প্রধান ডিপোয় মজুত সক্ষমতা ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৩ টন, মোংলায় ৩৫ হাজার টন, গোদনাইলে ৩০ হাজার ৯৩৪ টন। যমুনা অয়েলের চট্টগ্রামে ৮২ হাজার ২৪০ টন, মোংলায় ২৯ হাজার ৬৩০ টন জ্বালানি তেল মজুত সক্ষমতা রয়েছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মজুত সক্ষমতা চট্টগ্রাম ডিপোতে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৪ টন, মোংলায় ২৭ হাজার ৯৭২ টন। এর বাইরে বিপিসির অধীন স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেডের ধারণসক্ষমতা ৩৩ হাজার ৬২৫ টন।

আমাদের জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করার যে সক্ষমতা, তা দিয়ে ৪৫ দিনের জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ধারণ-সক্ষমতার আন্তর্জাতিক প্রমিত মান হলো ৯০ দিনের। সেই অর্থে আমাদের সক্ষমতা অর্ধেক। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে আমরা তা অধিক হারে আমদানি করে মজুত করতে পারি না। আমাদের এ সক্ষমতা বৃদ্ধি করলে কম দামের সুফল ভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আমদানিকারকদের কারসাজি হোক, ডলারের দামবৃদ্ধি হোক, আর আমাদের মজুত করার অক্ষমতা হোক, পরিণাম ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় হাঁপিয়ে উঠছে জনগণ। আমরা প্রতিনিয়তই শুনছি জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা। একটি দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগের জন্য জিডিপির ৩২ থেকে ৩৪ শতাংশ সঞ্চয়ের প্রয়োজন। আমাদের জিডিপি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয় অনুপাত বাড়ার পরিবর্তে কমে গেছে। খোদ সরকারি তথ্য হলো, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয় ছিল ২৭ শতাংশের কিছু বেশি। গত অর্থবছরে, অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে সেই হার কমে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশের নিচে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে মানুষের সঞ্চয়-সক্ষমতা কমে গেছে। ২০২১ সালের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত বিক্রীত সঞ্চয়পত্রের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। আর ২০২২ সালের একই সময়ে অর্থাৎ জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত বিক্রীত সঞ্চয়পত্রের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮ হাজার ১৫৭ কোটি টাকায়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই দুর্ভোগ থেকে শিগিরই মুক্তির সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছি।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments