Wednesday, April 17, 2024
spot_img
Homeনির্বাচিত কলামআট দশকের অভিশাপ এবং ইসরাইলের অস্তিত্বের সংকট

আট দশকের অভিশাপ এবং ইসরাইলের অস্তিত্বের সংকট

২০২৩ সালের ১৪ মে ইসরাইল তার জন্মের ৭৫ বছর পূর্ণ করে। ইসরাইলি গণমাধ্যম ‘দ্যা জেরুজালেম পোস্ট’ চলতি বছরের পহেলা মে এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে ইসরাইল তার ৮০ বছর পূর্ণ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। ২০২৮ সালে দেশটির প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর পূর্ণ হবে। এরই মধ্যে ইসরাইলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নজিরবিহীন হামলা এবং প্রতিশোধ হিসেবে ইসরাইলের আগ্রাসন ইসরাইলিদের ভাবিয়ে তুলছে। তাদের উদ্বেগের বিষয়ে এই যে, ইসরাইল শেষ পর্যন্ত অভিশপ্ত ৮০ বছর পূর্ণ করতে পারবে কি না। দেশটির সাধারণ কোনো নাগরিক বা বিশেষজ্ঞ নন, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট এমন সংশয় প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, গাজা যুদ্ধ হচ্ছে ইসরাইলের শেষের শুরু। ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেন, সৌল (হিব্রু বাইবেল অনুসারে, সৌল হচ্ছেন ইউনাইটেড কিংডম অব ইসরাইলের প্রথম রাজা), ডেভিড (ইসলামের নবী হযরত দাউদ আ.) ও সলোমান (ইসলামের নবী হযরত সুলাইমান আ.)-এর একত্রিত রাজতন্ত্রও ১০০ বছরের বেশি টিকতে পারেনি। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০ থেকে ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত যখন পম্পেই জেরুজালেম দখল করে, তখন হাসমোনিয়ান রাজবংশ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনভাবে শাসন করছিলো, যার মেয়াদ ছিল ৭৭ বছর। কোনো রাষ্ট্রই বিদেশি শত্রুদের মাধ্যমে নয়, অভ্যন্তরীণ অন্তর্দ্বন্দ্ব দ্বারা ধ্বংস হয়েছিলো, যা আজকের ঘটনার সঙ্গে তুলনীয়। ৭০ থেকে ৮০ বছর, প্লাস বা মাইনাস দুই বা তিন, সর্বজনীনভাবে তিন প্রজন্মের আয়ুষ্কাল হিসেবে বিবেচিত। তাদের ক্রম একটি নিয়মিত ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে বলে মনে করা হয়। প্রথম প্রজন্ম সৃষ্টি করে বা সম্পদ গড়ে তোলে, দ্বিতীয় প্রজন্ম সে ধারা বজায় রাখে এবং তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্ম সেগুলো ধ্বংস করে। আরব ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬) অনুমান করেছেন যে, সভ্যতাগুলো প্রথম রাজ বংশের দ্বারা তৈরি হয়েছে, দ্বিতীয় রাজবংশ এটির রক্ষণাবেক্ষণ করেছে এবং তৃতীয় রাজবংশ এটি ধ্বংস করেছে। টমাস মানের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বই ‘ব্রুডেনবুকস’ (১৯০১) একটি বণিক পরিবারের গল্প বলে, যেটি এক প্রজন্মে সম্পদ এবং খ্যাতি অর্জন করে, দ্বিতীয় সময়ে তার সংরক্ষণ করে, তৃতীয় বা চতুর্থটিতে পতন ঘটে। ইহুদি ইতিহাসের নজিরগুলো হারজগের অনুসন্ধান সমসাময়িক বিশ্বের ইতিহাসে সমান্তরাল অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করে। বিংশ শতাব্দীতে অনেক নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯২২), তুর্কি প্রজাতন্ত্র (১৯২৩), ভারতীয় প্রজাতন্ত্র (১৯৪৭), গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (১৯৪৯) এবং ইসরাইল (১৯৪৮)। পাঁচটি রাষ্ট্রই প্রায় তিন প্রজন্মের পর একটি ঐতিহাসিক মোড় পৌঁছেছে। এর মধ্যে দুইটি সফল হতে পারেনি। ৬৯ বছর পর ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ইউএসএসআর ভেঙে যায়। ৮০ বছর পর ২০০৩ সালে ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং সংগ্রাম চালিয়ে যায়। দুইটি রাষ্ট্র টার্নিং পয়েন্ট অতিক্রম করছে এবং ভালো করছে। ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের ৬৭ বছর পর ভারত ২০১৪ সালে একটি প্রকৃত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হতে শুরু করে। চীন ২০২২ সালে সীমাহীন মেয়াদের জন্য তার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে পুনর্নির্বাচিত করে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পর চীনারা এটি করতে সক্ষম হয়। ইসরাইল তার ৭৫তম বছরে তার গভীরতম রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। এটা কী নিছকই কাকতালীয় যে, বিংশ শতাব্দীতে স্থাপিত পাঁচটি ভিন্ন জাতিরাষ্ট্র সমস্যা বা রূপান্তরের দিকে গিয়েছিল? এই রাষ্ট্রগুলোর জন্মের ৬৯, ৮০, ৬৭, ৭৩, বা ৭৫ বছর পর এসব রূপান্তর ঘটেছে বা শুরু হয়েছে। এটি কী একটি অলিখিত তিন প্রজন্ম নীতিকে মনে করিয়ে দেয়? কারণগুলোর একটি ভিন্ন মিশ্রণ এই ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করে, কিন্তু তিনটি মানদ- সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। শাসন ও নেতৃত্ব, অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ সংহতি। সোভিয়েত তিনটি মানদ-েই ব্যর্থ হয়েছিলো। অযোগ্য নেতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা ছাড়াও একটি মূল কারণ ছিলো অ-রুশভাষী নাগরিকদের দ্রুত জনসংখ্যাগত বৃদ্ধি, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই না হলেও অব্যাহত রাশিয়ান শাসনের প্রতি উদাসীন বা শত্রুতাভাবাপন্ন ছিলো। শেষ পর্যন্ত তারা সোভিয়েত জনসংখ্যার ৪০ বা তার চেয়ে বেশি শতাংশে পৌঁছেছিলো। ফলে দেশটিতে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে ভারত তিনটি মানদ-েই শক্তিশালী হয়েছে এবং অর্থনীত ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী অবস্থান দেশের সংহতি বৃদ্ধি করেছে। চীনে এখন এমন একজন নেতা রয়েছেন, যার ক্ষমতা তার তিন পূর্বসূরীর চেয়ে বহুগুণ বেশি। চীনের বৈশ্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে অর্থনীতি শিগগিরই বিশ্বের বৃহত্তম হবে। ৯৫ শতাংশ হুন সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয় ঐক্য স্থিতিশীল বলে মনে হচ্ছে। তুরস্ক একটি গুরুতর নেতৃত্ব সমস্যার বিপদ প্রদর্শন করে। ২০০৩ সালে যখন ইসলামিকীরণ শুরু হয়েছিলো তখন অনেক তুর্কি সেটিকে প্রথম স্বাগত জানিয়েছিলো। তারা ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কি অভিজাতদের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান এখন সাবেক ওসমানীয় সা¤্রাজ্যের আদলে শক্তিশালী তুরস্ক গঠনে অনেকখানি এগিয়ে গেছেন। ইসরাইলের নেতৃত্ব একনায়কতন্ত্র বা রাজতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে বলে অনেকেরই সংশয়। কারণ, একজনই বারবার ক্ষমতায় আসছেন। অর্থনৈতিক শক্তি নির্ভর করে দেশটির সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন তার উপর। কিন্তু এখন সেই সম্পর্কে চিড় ধরেছে। দেশের মধ্যে জাতীয় সংহতি দিন দিন কমছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট এহুদ বারাকও ২০২২ সালে হিব্রু ভাষার সংবাদপত্র ‘ইয়েদিওথ অহরোনোথকে’ সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, ইসরাইল তার ৮০ বছর পার করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তার মতে, ‘কার্স অব এইটথ ডিকেট’ বা অষ্টম দশকের অভিশাপ ইসরাইলের অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারে। এমনকি ২০২২ সালে জুনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও বিশ্বের একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র ৮০ বছর পূরণ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এদিকে অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীর ও পূর্ব বাইতুল মুকাদ্দাস শহরের শত শত অবৈধ বসতিতে থাকা উগ্র ইসরাইলি অভিবাসীদের উপর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের ৭০ শতাংশই মনে করে যে, ইসরাইলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। রাইল হাইয়োম নামের একটি দৈনিক এ সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে, শতকরা ৩৩ শতাংশ ইসরাইলি যুবক নিরাপত্তা না থাকা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সামাজিক বিভাজনের কারণে অধিকৃত ফিলিস্তিন থেকে চলে যেতে চায়। সমীক্ষা থেকে আরও জানা যায় যে, ৬৬ শতাংশ অভিবাসী ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীকে বিশ্বাসই করেন না। ৪৪ শতাংশ ইসরাইলের ভবিষ্যৎ দেখেন না। ইসরাইলের ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট নামের একটি সংস্থা এবং তেল আবিব ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে একটা জরিপ চালায়। সেই জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ ইসরাইলি ইহুদি বলেছে, তারা মনে করে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্স গাজায় যে বোমা হামলা চালিয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ ইহুদি বলেছে, আইডিএফ যথার্থ পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে এবং ১ দশমিক ৮ শতাংশ ইসরাইলি ইহুদি বিশ্বাস করে, গাজায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গোলা বারুদ ব্যবহার করা হয়েছে।

১৯৪৮ সালের গৃহীত আন্তর্জাতিক জেনোসাইড কনভেনশন বা চুক্তি মতে, কোনো দেশের বা কোনো জাতির বা কোনো বর্ণের বা কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকজনকে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ অথবা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করাকে গণহত্যা হিসিবে গণ্য করা হবে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জার্মানির হাতে সুপরিকল্পিত জাতিহত্যার অংশ হিসেবে ৬০ লাখ ইহুদি প্রাণ হারায়। এই ঘটনা যাতে আর না ঘটে এই উদ্দেশ্য মাথায় রেখে এই আন্তর্জাতিক চুক্তিটি প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু যেই ইহুদিদের পরিত্রাণের জন্য এই আইন করা হয় সেই ইহুদিরা ফিলিস্তিনে ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে অদ্যাবধি প্রায় ৩০০০০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে। আহত হয়েছে প্রায় ৭০,০০০ হাজার মানুষ। নিহত ফিলিস্তিনিদের ৭০ শতাংশই নারী এবং শিশু। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করে। ৮৪ পৃষ্ঠার যে তথ্য-উপাত্ত দক্ষিণ আফ্রিকা তার অভিযোগের স্বপক্ষে আদালতে উপস্থিত করেছে, তা থেকে কোনো সন্দেহ থাকে না গাজায় ইসরাইলের লক্ষ্য শুধু হামাস নয়, ফিলিস্তিন নামক জাতিকে হয় নির্মূল করা, নয়তো এই অঞ্চল থেকে বহিষ্কার করা। একথা প্রমাণ করতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী থেকে সেনা কমান্ডার পর্যন্ত বিস্তর কর্তাব্যক্তি কোনো রাক-ঢাক ছাড়াই বলেছেন, প্রত্যেক গাঁজাবাসীকে নিশ্চিহ্ন বা বহিষ্কার না করা পর্যন্ত তাদের অভিযান থামবে না। একজন মন্ত্রী হাতে তিন আঙুল গুণে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে; পালাও, আত্মসমর্পণ করো, নয় মরো। আরেক মন্ত্রী বলেছেন, গাজায় তারা পানি, খাদ্য ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেবেন। স্বদম্ভে বলেছেন, এদের সবাইকে মিশরের সিনাই মরুভূমিতে ঠেলে পাঠানো হবে। গাজায় নতুন ইহুদি বসতি গড়ে তোলা হবে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু পর্যন্ত বলেছেন, এই মানবপশুদের নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত সামরিক অভিযান বন্ধ হবে না। ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় নীতি নির্ধারকদের বক্তব্য ও গৃহীত সামরিক ব্যবস্থা থেকে স্পষ্ট, গাজায় ইসরাইল কী চায়, কী তার ইন্টেন্ট। এ কোনো আত্মরক্ষা নয় বরং জাতিহত্যা। ইসরাইলের একাধিক পত্রিকা স্বীকার করেছে, আফ্রিকার মামলার ফলে ইসরাইল তার অস্তিত্ব নিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে। এ কথা বলার একাধিক কারণ রয়েছে। জেনোসাইড চুক্তিটির সঙ্গে ইসরাইলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জড়িত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সংঘটিত ‘হালোকাস্ট’ ব্যবহার করে এখনো তারা পশ্চিমা বিশ্বের সহানুভূতি দাবি করে থাকে। ইসরাইল নিজেই এখন সেই জাতিহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। নিজের জন্য যে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব সে দাবি করে থাকে, আইসিজি’র রায় তার বিরুদ্ধে গেলে তেমন দাবির আর কোনো যৌক্তিক মূল্যই থাকবে না।

লেখক: প্রভাষক, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments