Saturday, March 2, 2024
spot_img
Homeজাতীয়অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন

অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন

প্রশাসন-মালিকের অনিয়মে প্রাণ গেল যাত্রীদের

ঝালকাঠিতে আগুনে পুড়ে যাওয়া এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটির পরিচালনায় পদে পদে অনিয়ম ও অবহেলার তথ্য পাওয়া গেছে। লঞ্চের ইঞ্জিনের সিলিন্ডারের টপ চেম্বার খোলা থাকা, অনুমোদন ছাড়া ইঞ্জিন পরিবর্তন, অগ্নিকাণ্ডের সময়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার না করা এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহনের প্রাথমিকভাবে প্রমাণ মিলেছে। এসব কর্মকাণ্ডে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর কয়েকজন কর্মকর্তা ও লঞ্চ পরিচালনায় থাকা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন লেগে যায়। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪১ জনের মৃত্যু ও শতাধিক মানুষ আহত হন। আর শনিবার রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিখোঁজ ছিলেন ৫১ জন।

এদিকে যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সার্ভে সনদে যে চারজন মাস্টার ও ড্রাইভারের নাম উল্লেখ ছিল ঘটনার সময়ে তারা লঞ্চটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন না। ঢাকা নদীবন্দর (সদরঘাট) থেকে লঞ্চটি ছাড়ার সময়ে যে ভয়েজ ডিক্লারেশন (ঘোষণাপত্র) দিয়েছে, সেখানে নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের এনডোর্স (অনুমোদন) নেই-এমন চালক ও ড্রাইভারের নাম রয়েছে। তবুও এ লঞ্চটি ছাড়ার অনুমতি দেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের (বিআইডব্লিউটিএ) ট্রাফিক ইন্সপেক্টর। ঢাকা-বরগুনা রুটে ছয়টি লঞ্চ চলাচলের অনুমতি থাকলেও দুটি করে চলাচলের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সংস্থাটির আরেক কর্মকর্তা। যেটি নিয়মবহির্ভূত। এভাবে রোটেশন পদ্ধতি চালু করায় বৃহস্পতিবার ওই লঞ্চটিতে প্রায় এক হাজার যাত্রী ওঠে। যদিও ঘোষণাপত্রে মাত্র ২৭৫ জন যাত্রী থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে নৌযান চলাচলে পদে পদে অনিয়ম বেরিয়ে আসছে। দীর্ঘদিন এসব অনিয়ম চলায় তা অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। যার কারণেই অভিযান-১০ লঞ্চটি নির্বিঘ্নে চলাচল করেছে। তিনি জানান, যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা মনিটরিংয়ে গাফিলতি এবং ইঞ্জিন রুম থেকে আগুন লাগার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। লঞ্চটি প্রথম যেখানে ভিড়েছে সেখানেই রাখলে হতাহতের সংখ্যা অনেক কম হতো।

তবে এসব ত্রুটি ছাপিয়ে নাশকতার শঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাপ) সংস্থার একাধিক নেতা জানান, অভিযান-১০ লঞ্চটি ঢাকা-বরগুনা রুটে নতুন চলাচল শুরু করেছে। এ রুটে ছয়টি লঞ্চ চলাচলের অনুমোদন রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-ফারহান-৮, অভিযান-১০, রাজহংস-৮, শাহরুখ-২, রাজারহাট বি ও পূবালী-১। এগুলোর মধ্যে চারটি লঞ্চের মালিক একটি কোম্পানি। বাকি দুটি লঞ্চের মালিক দুটি কোম্পানি। ওই রুটে চলাচল নিয়ে এসব কোম্পানির মালিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন বিরোধ রয়েছে। ওই বিরোধ নিষ্পত্তিতে আজ রোববার মালিক সংগঠনের কার্যালয়ে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এর আগেই এ ধরনের ঘটনা সন্দেহের তৈরি হয়েছে।

ইঞ্জিন রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত : তদন্ত কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইঞ্জিন রুম থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন। তদন্ত কমিটির সদস্যরা লঞ্চের ইঞ্জিনের সিলিন্ডার হেডের টপ চেম্বারের ক্যাপ খোলা পেয়েছেন। ক্যাপ খোলা থাকায় ওই চেম্বারে উৎপন্ন হওয়া কয়েকশ ডিগ্রি তাপ সেখান থেকে বেরিয়েছে। এছাড়া আগুন নেভাতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়নি। তদন্ত কমিটি সেগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পেয়েছে। সার্ভে সনদ অনুযায়ী পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না বলেও নিশ্চিত হয়েছে কমিটি। এছাড়া ঘটনার সময়ে লঞ্চটিতে কমবেশি এক হাজার যাত্রী ছিল বলে আহতদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে কমিটি। যদিও সার্ভে সনদে রাতে ৪২০ জন ও দিনে ৭৬০ জন বহনের কথা। সদরঘাটে ভয়েজ ডিক্লারেশনে ২৭৫ জন যাত্রী থাকার কথা জানিয়েছে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নৌপ্রকৌশলী যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের লঞ্চে সাধারণত ছয়টি সিলিন্ডার থাকে। প্রতিটি সিলিন্ডারের মুখ আটকে রাখার নিয়ম। একইভাবে টপ চেম্বারের ক্যাপও আটকে রাখার নিয়ম। কারণ ওই চেম্বার থেকে ইঞ্জিনভেদে দুইশ থেকে তিনশ ডিগ্রি তাপ উৎপন্ন হয়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এত টাকা খরচ করে নির্মাণ করা লঞ্চে কেন পুরোনো ইঞ্জিন থাকবে। কেন সেগুলো অনুমোদন দেওয়া হবে। পুরোনো ইঞ্জিন অনুমোদনকারীদেরও বিচার হওয়া উচিত।

আরও জানা গেছে, নৌপরিবহণ অধিদপ্তরকে না জানিয়ে লঞ্চটি গত অক্টোবরে কেরানীগঞ্জের মাদারীপুর ডকইয়ার্ডে ডকিং করা হয়। ওই সময়ে নৌযানের আগের দুটি চায়না ইঞ্জিন পরিবর্তন করে পুরোনো জাপানের ইঞ্জিন লাগানো হয়। ওই ইঞ্জিন দুটি চট্টগ্রামে বিদেশি জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে কেনা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, শিপইয়ার্ড থেকে লঞ্চ নামানোর পর সার্ভেয়ার দিয়ে আবারও পরীক্ষা করাতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানতে পেরেছেন, লঞ্চে আগুন লাগার পরে তা কিনারে ভেড়ানো হয়। সেখানে অনেক যাত্রী নেমে গেছেন। তখন লঞ্চের স্টাফরা যাত্রীদের না বাঁচিয়ে সটকে পড়েন। এরপর হয়তো স্রোতের তোড়ে লঞ্চটি আরও ৩০-৫০ মিনিট ভেসে অন্য পাড়ে ভিড়ে। ততক্ষণে লঞ্চ অগ্নিনরকে পরিণত হয়। গতকাল পর্যন্ত লঞ্চের মাস্টার ও ড্রাইভারদের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি কমিটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লঞ্চের মালিক মো. হানজালাল শেখ যুগান্তরকে বলেন, আগুনে টপ চেম্বারের ক্যাপ হয়তো ফেটে যেতে পারে। তিনি বলেন, টপ চেম্বার থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে না। তবে সেখানে তাপ উৎপন্ন হয়। তিনি বলেন, ইঞ্জিনের ধোঁয়া যেখান থেকে বের হয়, সেখানে লিকেজ থাকলে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। আমার লঞ্চে সেই সমস্যা ছিল না। এটা নাশকতা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের দুটি ইঞ্জিনে ত্রুটি থাকায় পরে জাপানি ইঞ্জিন লাগানো হয়েছে। সেগুলো ভালো মানের। এটি নির্ধারিত ডকিং না হওয়ায় তা নৌপরিবহণ অধিদপ্তরকে জানানো হয়নি।

নির্ধারিত মাস্টার-ড্রাইভার ছিল না : অনুসন্ধানে জানা গেছে, লঞ্চটির সার্ভে সনদ নেওয়ার সময়ে যেসব মাস্টার ও ড্রাইভারদের নাম উল্লেখ ছিল, দুর্ঘটনার সময়ে তারা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন না। সার্ভেতে প্রথম শ্রেণির ইনচার্জ মাস্টার হিসাবে কামাল হোসেন খান, দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার ইনচার্জ হিসাবে দেলোয়ার হোসেন এবং প্রথম শ্রেণির ইনচার্জ ড্রাইভার মহিউদ্দিন স্বপন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ড্রাইভার রনি আহমেদ সজল রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু লঞ্চটি ছাড়ার সময়ে ভয়েজ ডিক্লারেশনে প্রথম শ্রেণির ইনচার্জ মাস্টার হিসাবে মো. রিয়াজ শিকদার, দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার খলিলুর রহমান, প্রথম শ্রেণির ড্রাইভার মাসুম বিল্লাহ ও দ্বিতীয় শ্রেণির ড্রাইভার আবুল কালাম রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। প্রসঙ্গত, লঞ্চে চালক হিসাবে থাকেন মাস্টাররা এবং ইঞ্জিন পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন ড্রাইভাররা।

আরও জানা গেছে, লঞ্চটির চারজন মাস্টার ও ড্রাইভার পরিবর্তন করা হলেও তা নৌ অধিদপ্তরে মাত্র একজনের এনডোর্স করা হয়। বাকিদের বিষয়ে এনডোর্স করা হয়নি। গত ২৪ আগস্ট দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার খলিলুর রহমানকে এনডোর্স করে মালিকপক্ষ। বাকি চালক ও ড্রাইভারদের এনডোর্সমেন্ট ছাড়া লঞ্চ ছাড়ার কথা নয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিআইডব্লিউটিএর ট্রাফিক ইন্সপেক্টর দিনেশ দাস এনডোর্সমেন্ট ছাড়াই ওই লঞ্চের ভয়েজ ডিক্লারেশন গ্রহণ করেন এবং লঞ্চটি ছাড়ার অনুমতি দেন। এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন লঞ্চের মালিক মো. হানজালাল শেখ। তিনি বলেন, চালকদের সবার আইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর ঘোষণা করেই লঞ্চটি ছাড়া হয়েছে। অন্য লঞ্চ যা করে, আমি এর ব্যত্যয় করিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর দিনেশ দাস যুগান্তরের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য দেওয়া নিষেধ রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম-পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান। জানতে চাইলে মো. জয়নাল আবেদিন যুগান্তরকে বলেন, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর দিনেশ দাস ভয়েজ ডিক্লারেশন গ্রহণ করেছেন। তিনি লঞ্চে গিয়ে চালকদের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েই সেটি গ্রহণ করেছেন। এবং এতে যাত্রী সংখ্যা যা লেখা আছে তাই ছিল। ওই লঞ্চের বিপরীতে চালকদের এনডোর্সমেন্ট বাদে লঞ্চ ছাড়া যায় কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক সময়ে চালক অসুস্থ বা অনুপস্থিত থাকলে অন্য চালক দিয়ে লঞ্চ পরিচালনা করা হয়। পরে ওই চালককে এনডোর্সমেন্ট করা হয়। আইনে এ সুযোগ রয়েছে।

রোটেশন নির্ধারণ করেছেন কর্মকর্তা : অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বরগুনা রুটে ছয়টি লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়। কিন্তু সদরঘাট থেকে সম্প্রতি প্রতিদিন দুটি করে লঞ্চ ছাড়ার নিয়ম বেঁধে দেন বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম-পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন। হাতে লেখা কাগজে কোন তারিখে কোন লঞ্চ চলবে তা লিখে মালিকদের দেন তিনি। সেই অনুযায়ী গত ২২ ডিসেম্বর ফারহান-৮, ২৩ ডিসেম্বর অভিযান-১০, ২৪ ডিসেম্বর রাজহংস-৮ ও ২৫ ডিসেম্বর শাহরুখ-২ লঞ্চ ঢাকা থেকে বরগুনা ছেড়ে যায়। তবে এ রুটের রাজারহাট-বি ও পূবালী-১ লঞ্চের রোটেশনের বিষয়ে তিনি কিছুই উল্লেখ করেননি। একাধিক লঞ্চ মালিক বলেন, এভাবে সরকারি কর্মকর্তারা লঞ্চের রোটেশন করে যাত্রীদের জিম্মি করতে পারেন না।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments