বার লাইসেন্স নেই, নেই মদ বিক্রির অনুমোদনও। তবু রাজধানীর গুলশানে ‘হর্স অ্যান্ড হর্স’ নামের অভিজাত রেস্টুরেন্টে রাতভর চলছে আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশি মদের দেদার কেনাবেচা। স্বাস্থ্যবিধি মানা তো দূরের কথা, করোনার মধ্যে এখানে সবই চলছে আগের নিয়মে। একেবারে পাশ্চাত্যের আদলে বসছে তরুণ-তরুণীদের জমজমাট আড্ডা। মদ বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে, খোলামেলা।

কিন্তু দেখার যেন কেউ নেই। অভিযোগ আছে, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে যাদের ব্যবস্থা নেয়ার কথা তারা নিশ্চুপ। সব কিছু জেনেও রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সম্প্রতি যুগান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে রেস্টুরেন্টটির নানা অনিয়মের আদ্যোপান্ত।

সূত্র বলছে, এ রেস্টুরেন্টে মদ বিক্রির কোনো অনুমোদন নেই। চোরাই বাজার থেকে বিদেশি মদের বোতল এনে বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে। আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশি বিয়ারও বিক্রি হচ্ছে দেদার। বিক্রি হওয়া মদ-বিয়ারের বেশিরভাগ আসে ডিউটি ফ্রি ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যার হাউস থেকে। ওয়্যার হাউসের নির্ধারিত চোরাকারবারিরা রেস্টুরেন্টটিতে মদ-বিয়ার সরবরাহ করে। এছাড়া বিদেশ থেকে লাগেজ পার্টির মাধ্যমে চোরাইপথে আসা মদও বিক্রি হচ্ছে এখানে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, হর্স অ্যান্ড হর্স রেস্টুরেন্টে বার লাইসেন্স নেই। বেআইনিভাবে মদ বিক্রি ছাড়াও তারা অন্তত ১০ ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। প্রথমত, তারা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাই মদ বিক্রি করছে। দ্বিতীয়ত, বার পরিচালনার অনুমতি না নিয়ে মদ-বিয়ার কেনাবেচা করছে। তাছাড়া বার বন্ধের সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মদ বিক্রির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। উপরন্তু, তারা কোনো ধরনের নিয়মের তোয়াক্কা না করে মধ্য রাত পর্যন্ত মদ-বিয়ার বিক্রি করছে। যা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিভিন্ন ধারায় দণ্ডনীয় অপরাধ। এতসব অনিয়মের পরও কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না জানতে চাইলে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রতিবেদককে বলেন, ‘একটু অপেক্ষা করেন। যে কোনো মুহূর্তে আমরা অভিযান চালাব।’

সরেজমিন : রেস্টুরেন্টটির বাস্তব অবস্থা দেখতে ২১ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা হর্স অ্যান্ড হর্স রেস্টুরেন্টে হাজির হন। রাত তখন ১০টা। ভেতরে ঢুকতেই বাঁধন নামের এক ওয়েটার এগিয়ে এলেন। হরেক রকম ব্র্যান্ডের মদের নাম লেখা মেনু দেখিয়ে বললেন কোনটা নেবেন স্যার। কিন্তু মদের মূল্য দেখে হতবাক না হয়ে উপায় নেই। কারণ এক পেগ ব্লু লেবেল মদের দাম লেখা আছে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। পুরো বোতলের দাম ১ লাখ টাকা। এমন আরও নানা ধরনের বাহারি মদের ককটেল বিক্রি হচ্ছে এখানে।

দেখা যায়, রাত যত গভীর হচ্ছে ততই জমে ওঠে রেস্টুরেন্ট। রাত ১০টার পর একে একে বিলাসবহুল সব গাড়ি এসে থামছে। পাশ্চাত্য পোশাকের ঢংয়ে তরুণ-তরুণী গাড়ি থেকে নেমে সোজা ঢুকে যাচ্ছেন রেস্টুরেন্টে। আসছেন উঠতি মডেল থেকে শুরু করে শোবিজ জগতের তারকারাও। জানা গেল, মূলত ধনাঢ্য পিতা-মাতার বখে যাওয়া সন্তানরা এখানকার নিয়মিত খদ্দের। জমজমাট কেনাবেচা চলে ভোর ৫টা পর্যন্ত। সূত্র জানায়, হর্স অ্যান্ড হর্স রেস্টুরেন্টের মালিক মেহেরীন মনসুর নামের জনৈক নারী। বিদেশে পলাতক বিতর্কিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ভাইপোর স্ত্রী হিসেবে তার পরিচয় পাওয়া যায়। আমেরিকা প্রবাসী মেহেরীন মনসুর নিজেও রাজসিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। বর্তমানে তিনি ঢাকাতেই অবস্থান করছেন। নিয়মিত দেখভাল করেন হর্স অ্যান্ড হর্স রেস্টুরেন্টের মদ ব্যবসা। শাফিউল্লাহ আল মুনির নামের জনৈক ব্যবসায়ী কাম রাজনীতিকের নাম ভাঙিয়ে এ রেস্টুরেন্টে মদের ব্যবসা করা হচ্ছে। অবৈধ মদ-বিয়ার ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার রাকিব দাবি করেন, তাদের বৈধ বার লাইসেন্স আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

English